তেহরানে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রূপরেখা চুক্তিতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বেসরকারি তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই তহবিলের অর্ধেকের বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। চুক্তি সম্পর্কে সরাসরি অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি বলেছে, উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়াটা এ তহবিল গড়ার উদ্দেশ্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, ওয়াশিংটন ও তেহরান আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে আকস্মিক আগ্রাসন চালানোর পর যুদ্ধ শুরু হয়। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁরা যুদ্ধ অবসানের জন্য একটি চুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছেন। সমঝোতার আওতায় ইরানের বন্দরের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে।

সূত্রটি আরও বলেছে, নতুন এ তহবিল কোনো পুনর্গঠন বা ক্ষতিপূরণ কর্মসূচির আওতায় গঠিত হচ্ছে না। এটি পুরোপুরিভাবে একটি বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল। এতে সরকারের কোনো অনুদান থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন কোম্পানি এ তহবিলে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যেষ্ঠ এক ইরানি সূত্র বলেছে, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, তারা এমন কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না।

ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এক নারী ইরানের পতাকা হাতে ধরে আছেন। ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে এক নারী ইরানের পতাকা হাতে ধরে আছেন। ২৯ এপ্রিল ২০২৬।ছবি: রয়টার্স

এরপরই ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ নামে নতুন একটি তহবিল গঠনের ধারণা সামনে আসে।

ইরানি সূত্রটি বলেছে, এ ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক দেশগুলো বিভিন্নভাবে অবদান রাখবে। এর মধ্যে আছে ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়া, ঋণসুবিধার ব্যবস্থা করা অথবা যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্গঠনে সরাসরি অর্থায়ন করা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে আছে মোবারাকেহ স্টিল কোম্পানির ইস্পাত কারখানা, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দরসহ আরও কিছু অবকাঠামো।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও গত চার দশকে ইরানে বিদেশ থেকে সরাসরি বিনিয়োগ খুব কম এসেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটি কার্যত বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের দিক থেকে ইরানের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। আর তেলের মজুতের দিক থেকে দেশটির অবস্থান চতুর্থ।

ইরানে ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনসংখ্যা আছে। এ ছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ সম্পদ, পর্যটন, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে দেশটির উল্লেখজনক সম্ভাবনাও আছে।

বিনিয়োগ তহবিলটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে চলমান সমান্তরাল আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সূত্রটি এটিকে দুটি পৃথক আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেগুলোর উদ্দেশ্য ও সময়সূচি ভিন্ন।

সূত্র বলেছে, চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ তহবিল গঠন করা এবং কার্যকর হবে না।

সূত্রটি আরও বলেছে, ‘চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই এটি গঠন করা হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে তহবিলের প্রশাসকেরা ইরানি পক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করে প্রকল্পসংক্রান্ত পরিকল্পনা ও এর পরিধি নির্ধারণ করবেন।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিনিয়োগ তহবিল–সংক্রান্ত চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছে। এ ব্যাপারে এ দুই মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র গত সোমবার সিবিএসকে জেডি ভ্যান্সের দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যদি ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির শর্ত মানে, তাহলে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে গঠিত ৩০ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। চুক্তির শর্তের মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা এবং কঠোর পরিদর্শন ও বাস্তবায়নব্যবস্থায় সম্মত হওয়া।

সূত্রটি আরও বলেছে, এ তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে বা কারা এটি পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ, এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্ধারণ করা বাকি আছে।

সূত্র বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানি এ তহবিলে বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ–সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সূত্র।

৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; বরং একটি রূপরেখা। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকেরা একাধিক বিষয় নিয়ে কাজ করবেন। এর মধ্যে আছে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়।

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের লনে গত সপ্তাহের শেষে আয়োজিত ‘আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ (ইউএফসি) মিক্সড মার্শাল আর্ট অনুষ্ঠানে এক পরিকল্পিত হামলা নস্যাতের দাবি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। গতকাল মঙ্গলবার এ দাবি করে তারা।

আদালতের নথিতে জানা গেছে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

আদালতের নথিতে এফবিআই অভিযোগ করেছে, হামলাকারীরা বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ব্যবহার করে হোয়াইট হাউসের উত্তর পাশে আঘাত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সেখানে উপস্থিত অতিথিদের একটি নির্দিষ্ট বের হওয়ার রাস্তার (এক্সিট) দিকে ঠেলে দেওয়া। এরপর সেই রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য মানুষের ওপর স্নাইপারদের (উন্নত রাইফেলধারী বন্দুকধারী) দিয়ে গুলি চালানো।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ৮০তম জন্মদিনে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা, অনুদানকারী এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ৮০তম জন্মদিনে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা, অনুদানকারী ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত এ পাঁচ ব্যক্তি সরকারবিরোধী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনসংক্রান্ত তদন্তের ফাইলগুলো যেভাবে সামলানো হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ থেকেও তাঁরা এ হামলায় আংশিকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন এমন আইনপ্রণেতাদের নিশানা বানানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, যাঁরা ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনী প্রচারণার অনুদান পেয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এফবিআই পরিচালক ক্যাশ প্যাটেল বলেন, ‘১০ জুন এফবিআই ও আমাদের সহযোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওয়াশিংটন ডিসির “ইউএফসি আমেরিকা ২৫০” অনুষ্ঠানে একটি সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে জানতে পারে। এই ঘটনার সঙ্গে ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নের বাইরের কিছু ব্যক্তি জড়িত ছিলেন।’

হেফাজতে নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ।

হেফাজতে নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র ও অস্ত্রসংক্রান্ত অপরাধ।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা এখনো আদালতে নিজেদের দোষী বা নির্দোষ হওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের আইনজীবীদের কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ফক্স নিউজ ডিজিটাল জানিয়েছে, এ গোষ্ঠীতে ২৩ জনের মতো জড়িত থাকতে পারেন।

কর্তৃপক্ষ এ ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারে যখন ওহাইও অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় পুলিশকে এক মা ফোন করেন।

১৯ বছর বয়সী সন্দেহভাজন টাইসেন প্রপারের মা পুলিশকে জানান, তাঁর ছেলে বেশ কিছু অস্ত্র কিনেছে এবং অনলাইনে সন্দেহভাজন কিছু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

এফবিআই-এর একটি হলফনামা অনুযায়ী, টাইসেন প্রপার পরে এফবিআই এজেন্টদের কাছে স্বীকার করেছেন যে ইউএফসি অনুষ্ঠানে একটি সমন্বিত হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানতেন।

এদিকে ফ্রান্সের এভিয়ানে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এ পরিকল্পিত হামলার বিষয়ে কিছু শোনেননি।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, কর্তৃপক্ষ এ ধরনের সহিংসতার পেছনের আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন নেটওয়ার্কগুলো খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘মোটা অঙ্কের অর্থায়ন এবং বড় ধরনের সমন্বয় ছাড়া ২৩ জন ওয়াশিংটন ডিসির মতো জায়গায় এত বড় একটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না।’

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘এটি শুধু কয়েকজন উগ্র মানুষের পাগলামি নয়, এটি ছিল একটি সুসমন্বিত ও পরিকল্পিত সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্র।’

রয়টার্স

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত যুদ্ধ তেহরানের ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করবে এবং ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনের আগে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

নেতানিয়াহু নিজেকে এমন এক মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাই পাল্টে দেবে।

কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটি ঘটেনি। বরং এর পরিবর্তে ইসরায়েলে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন ট্রাম্পের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পথে রয়েছেন। কারণ, ট্রাম্প নিজেকে এই যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন, অথচ দুই নেতারই লক্ষ্য পূরণ হয়নি এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও ওই শান্তিচুক্তির কারণে আটকে গেছে।

এ মুহূর্তে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যাতে তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে ক্ষুব্ধ করতে না হয়। ট্রাম্প সমালোচকদের প্রতি সংবেদনশীল এবং দ্রুত তাঁদের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়ার জন্য পরিচিত।

ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে না চাইলেও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলিদের হতাশা স্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক এ চুক্তি ‘ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। খোলামেলা মূল্যায়নে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর প্রধান পর্যন্ত—ইসরায়েলের নেতৃত্বে এমন কেউ নেই, যিনি এটিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা আছে।

ওয়াশিংটন বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকাকালে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগগুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত উদ্বেগ সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁদের ধারণা এই চুক্তির অধীন নির্ধারিত আলোচনার সময়সীমা সম্ভবত আরও বাড়ানো হবে। ফলে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। অথচ তাদের উদ্বেগগুলোর সমাধান তখনো হবে না।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান সীমিত করতে ইসরায়েলের অনীহা নিয়ে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে বারবার মতবিরোধ হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হওয়া (যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে) ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি।

এ মাসের শুরুতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির চেষ্টা চালানোর সময় বৈরুতে হামলা না করার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প এক ক্ষুব্ধ ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ‘পুরোপুরি পাগল’ বলেছিলেন। সেদিন নেতানিয়াহু হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছিলেন। তবে এক সপ্তাহ পর তিনি বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে হামলা চালান। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকেই তিরস্কার করেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। আমরা অনেক সময়ই একমত হই, আবার এমন সময়ও আসে, যখন মতভেদ হয়। আমার দায়িত্ব ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ নিশ্চিত করা।বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের চুক্তি ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টা আগে, গত রোববার ইসরায়েল আবারও লেবাননের রাজধানীতে হামলা চালিয়েছিল। এর আগে লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করা হয়। ট্রাম্প এসব হামলাকে ‘ছোটখাটো ও অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

পরে গতকাল সোমবার রাতে জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, তাঁর ও ট্রাম্পের মধ্যে কখনো কখনো মতপার্থক্য হয়।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। আমরা অনেক সময়ই একমত হই, আবার এমন সময়ও আসে, যখন মতভেদ হয়। আমার দায়িত্ব ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ নিশ্চিত করা।’

আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এবারের ভোটে নেতানিয়াহুর পরাজয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। একই সময় তিনি ইসরায়েলি জনমতের চাপের মুখে রয়েছেন। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অঙ্গীকার নিয়ে ইসরায়েলিদের আস্থা ক্রমেই কমছে।

‘ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মানতে বাধ্য নই’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি, তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবে না এবং হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে ‘পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের স্বাধীনতা’ ধরে রাখবে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান চেয়েছিল, আমরা যেন সেখান থেকে সরে যাই, কিন্তু আমরা নিজেদের অবস্থানে দৃঢ়ভাবে রয়েছি।’

এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন আবার শুরু হবে, তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনো ঠিক হয়নি। চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যে ৬০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেই সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করা হবে। এ সময়ে একটি স্থায়ী চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টাও করা হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় এর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প উভয়েই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরান–সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন আটকানোর কথা বলেছিলেন। চুক্তি নিয়ে সামনের আলোচনায় এ বিষয়গুলো অ্যাজেন্ডা হিসেবে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।

তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলের ধারণা, ৬০ দিনের এ অন্তর্বর্তী চুক্তির সময় খুব সম্ভবত ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হবে।

এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে এবং এ অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে।

আরও দুজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন প্রথম জানান, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, ইসরায়েল এ খবরে পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছিল। তাঁরা স্বীকার করেন, ইসরায়েল আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলতে খুব একটা সফল হয়নি।

ইসরায়েলের এসব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন। কারণ, তাঁদের প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি নেই।

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি জনগণের সামনে নিজেকে রিপাবলিকান ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে বিশেষভাবে দক্ষ একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েল ওয়াশিংটন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর ও আব্রাহাম চুক্তিকে সমর্থন করা। এ চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অন্যদিকে ট্রাম্প ওবামা প্রশাসনের সময় করা ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তি’ বাতিল করেন, যেটিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে খুবই শিথিল বা দুর্বল বলে অভিযোগ করে আসছিল।

২০১৯ সালের নির্বাচনের সময় নেতানিয়াহু তেল আবিব ও জেরুজালেমে বিশাল প্রচারণা বিলবোর্ড স্থাপন করেন। সেখানে তাঁকে ও ট্রাম্পকে হাসিমুখে হাত মেলাতে দেখা যায়।

কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর সেই দাবিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি একসময় বলতেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে অন্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। কিন্তু এবার তিনি ইসরায়েলি জনগণের কাছে এই চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন না বলে মনে করেন বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোনাথন রিনহোল্ড।

রিনহোল্ড বলেন, ‘এখন তিনি (নেতানিয়াহু) সর্বোচ্চ যে আশা করতে পারেন তা হলো, তাঁরা চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে এবং ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হবে। এমনটা হলে পরিস্থিতি ইসরায়েলের পক্ষে সুবিধাজনক হবে।’

গত শুক্রবার ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, তাঁদের নিরাপত্তা ট্রাম্পের জন্য একটি কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয়। অথচ গত মার্চে ৬৪ শতাংশ ইসরায়েলি এটা বিশ্বাস করতেন।

নেতানিয়াহুর জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, ইরান যদি আবার তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন করে, তবে ইসরায়েল এককভাবে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে। তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের মেয়াদকালে তেহরানের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

রয়টার্স

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি এরই মধ্যে সই হয়েছে। এবার দুই দেশ চুক্তির ‘দ্বিতীয় ধাপের’ দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। আগামী শুক্রবার থেকে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছে তেহরানও।

প্রাথমিক চুক্তিতে সই হওয়ার বিষয়টি সোমবার নিশ্চিত করেন ট্রাম্প। এ নিয়ে যতটুকু তথ্য সামনে এসেছে সে অনুযায়ী, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার পর যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ করা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা হবে।

এই আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল হতে পারে—বিশ্লেষকদের এমন ধারণার পরও সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমরা চুক্তি সম্পন্ন করেছি। আর এটিকে সফল হতে হবে। এটি দ্বিতীয় ধাপের দিকে এগোচ্ছে। আর আমার মনে হয় এই ধাপটি তুলনামূলক সহজ হবে।’ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ বিনিয়োগ করবে না বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মঙ্গলবার চুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পরমাণু কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা শুক্রবার শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সতর্ক করে তিনি এ-ও বলেন, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালালে তা চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর দুই দিন পর লেবাননেও হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রায় ছয় সপ্তাহ পর ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এখন তেহরানের ভাষ্য, প্রাথমিক চুক্তিতে লেবাননসহ সব সম্মুখসারিতে যুদ্ধ বন্ধের কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহুর সমালোচনায় ট্রাম্প

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি হলেও লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে এই চুক্তি কতটা আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের এমন আচরণের কারণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।

বিগত কয়েক মাসেও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন করে তুলছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার। ট্রাম্প এ-ও বলেছেন, ‘আমি না থাকলে ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না; কারণ, আমি যা করেছি অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট তা করতে রাজি ছিলেন না।’

নেতানিয়াহু অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সতর্কতার পথ ধরেছেন। সোমবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু বিষয় আছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমি একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি না। ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আমার দায় রয়েছে। আর বিচক্ষণতার সঙ্গে আমাকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

‘সিরিয়া হিজবুল্লাহ নিয়ে ভালো কাজ করতে পারে’

মঙ্গলবার জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রসঙ্গও তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সিরিয়ায় বর্তমানে দায়িত্ব থাকা ব্যক্তি হিজবুল্লাহর ব্যাপারে খুবই দক্ষ। সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে মোকাবিলায় সিরিয়া হয়তো ইসরায়েলের চেয়ে ভালো কাজ করতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি ইসরায়েল পরামর্শ দিয়েছেন যে হিজবুল্লাহর বিষয়টি যেন আহমেদ আল-শারা সামাল দেন। কারণ, তিনি কাজটি আরও ভালোভাবে করতে পারবেন। ইসরায়েল অনেক দীর্ঘ সময় ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এর ফলে অনেক বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে।

রয়টার্স এএফপি

ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে গেছে। তবে তাদের সত্যিকারের সমস্যাগুলো বোধ হয় এখনই শুরু হবে। একদিকে যুদ্ধে টিকে যাওয়ার সাফল্যে উজ্জীবিত কট্টরপন্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া, অন্যদিকে দারিদ্র্যপীড়িত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—এই দুই বিপরীতমুখী চাপ সামলানোই হবে শাসকগোষ্ঠীর বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের প্রভাবশালী কট্টরপন্থীরা মনে করছে, তিন মাসের এ সংঘাতে তারা বিজয়ী হয়েছে। তাই তারা চায়, ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিক এবং দেশের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিক। কট্টরপন্থীদের বিশ্বাস, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে যেকোনো অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত বা প্রতিবাদ দমন করা সম্ভব হবে।

তবে সাধারণ ইরানি জনগণ অর্থনৈতিক স্বস্তি দেখতে চান, যা তাঁদের জীবনমান উন্নত করতে কাজে লাগবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ভালো সম্ভাবনা তৈরি করবে। কারণ, বিধ্বংসী যুদ্ধের পাশাপাশি তাঁরা বছরের পর বছর ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ভারও বহন করে এসেছেন।

এ দুই পক্ষেরই প্রত্যাশা অনেক, দাবি পরস্পরবিরোধী, আর ধৈর্যও খুব কম। এরই মধ্যে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে হওয়া রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মতো এই পরিস্থিতি আবারও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করেছিল ইরান সরকার।

অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ

বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তী চুক্তির ভিত্তি যেহেতু নড়বড়ে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য প্রকৃত সমস্যাগুলো তখনই শুরু হবে।’

ইরানের বর্তমান চার কর্মকর্তা এবং এক সাবেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এতদিন সাধারণ জনগণের মনোযোগ যুদ্ধের দিকে ছিল। এখন তারা আবার দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতির দিকে তাকাতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনজন বলেন, জনগণের প্রত্যাশা হলো—নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া বা বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে সরকার যে আর্থিক স্বস্তি অর্জন করবে, তা যেন অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে খরচ করা হয়।

ওই কর্মকর্তাদের একজন ইরানি জনগণকে ‘যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগে ক্লান্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সম্ভাব্য অর্থের বড় অংশ পুনর্গঠন কাজে, ব্যাংক খাতে তারল্য জোগাতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচিতে খরচ করা হতে পারে।

চার কর্মকর্তাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন, সরকার যদি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাঁদের একজন যুদ্ধবিরতির এ চুক্তিকে ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চুক্তির কারণে জনগণের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

এক সংস্কারপন্থী সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা এসব ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। তাঁর মতে, এ কারণে তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি মেনে নিয়েছে।

যুদ্ধ অবসানে আগামী শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার কথা আছে। এতে ইরানের জন্য কিছু আর্থিক ছাড় বা সহায়তার ব্যবস্থা থাকার কথা। পাশাপাশি, দুই পক্ষ যদি গ্রীষ্মের শেষ দিকে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে অত্যন্ত মূল্যস্ফীতি চলছে, জাতীয় মুদ্রার মান ক্রমাগত কমছে, বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এর ওপর যুদ্ধ শুরুর পর শিল্পকারখানা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে।

ইরানি অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাইদ লায়লাজ মনে করেন, দেশের ভেতরের অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইরানের হাতে এখন খুব সীমিত সময় আছে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নজর দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈশ্বিক বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পথ আবার খুলে দিতে হলে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে যেতে হবে। সেই চুক্তির মূল বিষয় হবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে আপাতত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় ইসলামি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রতিকৃতি–সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মানুষ হাঁটছে। ১৪ জুন, ২০২৬
ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় ইসলামি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রতিকৃতি–সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মানুষ হাঁটছে। ১৪ জুন, ২০২৬, ছবি: রয়টার্স

নিজেদের ভূমিকার পুরস্কার চায় কট্টরপন্থীরা

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের কর্তৃপক্ষ কঠোর সতর্কবার্তা, কঠিন শাস্তি ও সরকারপন্থী সমর্থকদের রাস্তায় নামিয়ে ভিন্নমত দমন করার চেষ্টা করেছে। শাসনব্যবস্থার সমর্থনে প্রায় অবিরাম বিক্ষোভ, সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে তারা জনমত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়েছে।

অনেক বছর ধরে ইরানের কট্টরপন্থীরা দেশটির নেতৃত্বকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের পক্ষে ছিলেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, তাঁদের অবস্থানই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে তাঁরা আশা করছেন, যুদ্ধকালে তাঁদের ভূমিকা ও সমর্থনের যথাযথ পুরস্কার দেওয়া হবে।

ইরানের এ কট্টরপন্থী শিবিরে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী আছে। এর মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড অন্যতম। তবে বর্তমানে ইরানের টিকে থাকার স্বার্থে বিপ্লবী গার্ড একটি সমঝোতা চুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত হলেও তথাকথিত পেদারি ফ্রন্ট সে অবস্থানে নেই। এই ফ্রন্টে প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যাঁরা রাস্তায় নেমে শাসনব্যবস্থার সমর্থনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে এই গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব আছে। তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রের নীতি উল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী না হলেও, শাসকগোষ্ঠীর জন্য নানা ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা ও চাপ তৈরি করতে পারেন।

আরও ভালো শর্ত পূরণের জন্য অপেক্ষা না করে ইরান এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ।

ইরানের স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ–এর সদস্য হোসেইন বলেন, ‘যে শত্রু আমাদের নেতাকে (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) শহীদ করেছে, তাদের সঙ্গেই তারা এখন চুক্তি করছে। অথচ আমরা যুদ্ধ জিতেছি। তাহলে ইমাম খামেনির রক্তের প্রতিশোধ কোথায়? এটা কেমন ইসলামি সরকার? আর এখন শুক্রবার তারা ইমামের হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছে।’

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা চার কর্মকর্তার একজন স্বীকার করেছেন, জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলা করা জরুরি হলেও এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের কাজ ‘পূর্ণগতিতে’ চলবে।

বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, যদি অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা বা অর্থ প্রবাহ শুরু হয়, তাহলে সরকার হয়তো আপাতত জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের সংকট বা জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়াটা ঠেকাতে পারবে।

ইরানের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেদের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠীকে বোঝানো যে এটি আসলে একটি ভালো চুক্তি। কারণ, যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধবিরতির সময় সরকার এই কট্টরপন্থী সংখ্যালঘু সমর্থকদের ওপরই অনেক বেশি নির্ভর করেছে।

২০২২–২৩ সালে ইরানে বড় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত সরকার নারীদের পোশাকবিধি নিয়ে কঠোর অবস্থান কার্যত শিথিল করতে বাধ্য হয়েছিল। হেফাজতে থাকা অবস্থায় মাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়িয়েছিল। তখন থেকে অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়াই প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। আর এই বিষয়টি ইরানের কট্টরপন্থীদের অসন্তুষ্ট করে আসছে।

সংঘাত চলাকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর পছন্দের উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রেও বিপ্লবী গার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোজতবা এখনো জনসমক্ষে দেখা দেননি এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রভাবকেও আগের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটাঙ্কা মনে করেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের মতোই নিজেদের সমর্থিত চুক্তির বিরোধিতা করা কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে পারে।

ভাটাঙ্কা আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, যে বা যারাই প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে, তার বিরুদ্ধেই তারা ব্যবস্থা নেবে। কারণ, আলী খামেনির পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। নারীরা হয়তো হিজাব ছাড়া চলাফেরার মতো কিছু সামাজিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহনশীলতা দেখানো হবে না।’

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দেশটির বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই বিধ্বস্ত হয়ে আটজন নিহত হয়েছেন। খবর বিবিসির।

স্থানীয় সময় সোমবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আকাশে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। কয়েক মাইল দূর থেকেও যা চোখে পড়ছিল।

১৯৫০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বোয়িং বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বিমানটি ব্যবহার করে আসছে। বিশাল আকৃতির এই বিমানের ডাকনাম ‘দ্য বাফ’, যা ‘বিগ আগলি ফ্যাট’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে।

বি-৫২ একটি দীর্ঘপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এ বিমান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী।

বিশাল এই বোমারু বিমান ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। এটি প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড ওজনের সমরাস্ত্র বহন করতে পারে। এর মধ্যে কয়েক শ সাধারণ বোমা বা ৩২টি পারমাণবিক অস্ত্র–সংবলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়।

উড্ডয়নরত অবস্থায় আকাশেই এই বিমানে জ্বালানি ভরা যায়। ফলে এটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে হামলা চালাতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ বা পারমাণবিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করত।

সাধারণত বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসে পাঁচজন ক্রু থাকেন। তাদের মধ্যে একজন কমান্ডার, একজন পাইলট, একজন রাডার নেভিগেটর, একজন নেভিগেটর ও একজন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার কর্মকর্তা।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান গত রোববার গভীর রাতে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার পরদিন গতকাল সোমবার সকালে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি সই হয়েছে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, এ চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

এ–সংক্রান্ত আলোচনায় সহযোগিতা করার জন্য ইসরায়েলের চিরবৈরী দেশ তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।

পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ’ হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের আগে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১১ জুন, ২০২৬
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের আগে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১১ জুন, ২০২৬ছবি: এএফপি

‘মানতে বাধ্য নই’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।

নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের সুর ধরে গতকাল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে।

কাৎজ আরও বলেন, ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। ওই এলাকার বেসামরিক বাড়িঘরগুলো ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

চুক্তিটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেছেন চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

স্মোট্রিচ লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এ চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী

সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের ভবনগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন স্মোট্রিচ। এখন এই চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে সেনাবাহিনীকে ‘পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার’ অনুমতি দেওয়া অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীন রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ এই উগ্রপন্থী মন্ত্রী আরও দাবি করেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। ইসরায়েল কোনো ‘বানানা রিপাবলিক (দুর্বল বা পুতুল রাষ্ট্র) নয় উল্লেখ করে বেন গভির বলেন, ‘এ চুক্তি আমাদের কোনোভাবেই বেঁধে রাখতে পারে না।’

ইসরায়েল সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাও চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইরানে হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর ওয়াইনেটকে বলেন, তাঁদের সরকার শুধু একটি বিষয়েই আগ্রহী—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, কি নেই।

জোহর দাবি করেন, ‘ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।’ তিনি আরও বলেন, এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’

ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর দাবি করেন, ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে। এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’

‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’

ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও, বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১৪ নিউজ’-এর সাংবাদিক ইনন মাগাল, যাঁকে ইসরায়েলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে আখ্যা দেন।

ইনন মাগাল মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইঙ্গিত করে একটি সাধারণ ইহুদিবিদ্বেষী গালি ব্যবহার করে ‘লিটল জিউস’ (ছোট ইহুদি) বলে উল্লেখ করেন।

একই টেলিভিশন চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন গতকাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের যে নিজস্ব স্বার্থ আছে, তা এই ‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’কে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।

 ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি ইসরায়েল ও পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর। ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

বেজালেল স্মোট্রিচ, ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী

ইসরায়েলের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ (আইডিএসএফ) গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের “সন্ত্রাসী” সরকারের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বর্তমান চুক্তিটির পরিণতিও ভিন্ন কিছু হবে না।’

আইডিএসএফ আরও বলেছে, ‘এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, সামনে কী আসছে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এবং লেবানন ও ইরান থেকে হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করার উপযুক্ত সময়।’

অন্যদিকে অনেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও চড়াও হয়েছেন। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই সুযোগে তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।

লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬
লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬, ছবি: এএফপি
 

মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

গোলানের মতে, এ নতুন চুক্তি ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বহু বছরের ভুল নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। এর ফলে ইসরায়েল এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কোনো সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের ‘মহাবিপর্যয়ের’ (ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলা) পর গত প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ (গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন) একটি ব্যর্থ সরকারের নির্মম ফলাফল বয়ে এনেছে।

ইসরায়েলের মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘এ সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এবং আমাদের একটি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’

বেনেট আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার এবং তাঁর ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করার জন্য তাঁর কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি হিসেবে একটি সমঝোতা চুক্তি ভার্চুয়ালি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স অনলাইন মাধ্যমে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা।

চুক্তির আওতায় ইরানের বন্দরে আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে নতুন আলোচনা শুরুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের পক্ষে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে।

তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কোনো পাঠ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরই এটি প্রকাশ করা হতে পারে। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে বেশ কিছু বিষয়ে পার্থক্য দেখা গেছে। বিশেষকরে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম নিয়ে অবস্থান ভিন্ন।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ‘ফি’ আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, শুক্রবার থেকে কোনো ধরনের টোল ছাড়াই প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে।

এদিকে, চুক্তি নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব বিষয়ে একমত নন। একই সময়ে, ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী ২০ সংসদ সদস্য গতকাল রোববার নয়াদিল্লিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন, তাঁরা এবার লোকসভায় আলাদা আসন নিয়ে বসতে চান। তবে তৃণমূল বা নতুন তৃণমূলের নাম নিয়ে বসা যে সম্ভব হবে না, সেই ইঙ্গিত পাওয়ার পর বিদ্রোহী এই ২০ সংসদ সদস্য নতুন একটি অখ্যাত আঞ্চলিক দলে যোগ দিয়েছেন। ওই দলটির নাম ভারতের জাতীয়তাবাদী নাগরিক দল বা এনসিপিআই।

তৃণমূল কংগ্রেসের এই ২০ সংসদ সদস্য অখ্যাত দলটিতে যোগদানের ফলে কার্যত দলটি ভেঙে গেল।

এই এনসিপিআই দলটি প্রথম গঠন করেন অনিকেত দে ও শিউলি কুন্ডু। হাওড়ার সাকরইল থেকে তাঁরা এই দল গঠন করেন। প্রথম এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (এনজিও) হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তী সময় এই এনজিওকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করা হয়।

দলটির নেতা হন উত্তীয় কুন্ডু ও শিউলি কুন্ডু। ২০২২ সালের ২০ জানুয়ারিতে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই দলটিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে এই দল থেকে সাতজনকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল। তাদের দলীয় প্রতীক হচ্ছে কলম। ওই নির্বাচনে সাত প্রার্থীর কেউ জয়ী হতে পারেননি। জয় পাওয়া তো দূরের কথা, ভোটও পেয়েছেন হাতে গোনা কিছু। ওই সাত প্রার্থীর মধ্যে সর্বাধিক ভোট পেয়েছিলেন কৈলা বিধানসভা আসনের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলী। পেয়েছিলেন ২৮৬ ভোট।

তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা স্পিকার ওম বিড়লার হাতে আলাদা বসার সুযোগ চেয়ে করা আবেদন তুলে দেন। ১৪ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি
তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা স্পিকার ওম বিড়লার হাতে আলাদা বসার সুযোগ চেয়ে করা আবেদন তুলে দেন। ১৪ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি, ছবি: এএনআই
 

অবশেষে আইনগত নানা দিক খতিয়ে ও ঝুঁকি এড়াতে তৃণমূলের বিদ্রোহীরা এনসিপিআই দলে নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েছেন। মিশে গেছেন এনসিপিআইয়ের সঙ্গে। আর লোকসভায় ২০ জন সংসদ সদস্য পেয়ে দেশের অখ্যাত এক রাজনৈতিক দল এখন দেশে পঞ্চম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ধরনের পরাজয় হয়। রাজ্য বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল জয়ী হয় ৮০ আসনে। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ২০০-এর বেশি আসনে জয়ী হয়। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হন উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারী।

বিধানসভায় তৃণমূলের ভরাডুবির পর দলের ভেতরে অস্থিরতা দেখা দেয়। অধিকাংশ বিধায়ক ও সংসদ সদস্যরা এই পরাজয়ের জন্য দায়ী করেন দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দুর্নীতিরও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে দলের অনেক বিরুদ্ধে।

দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে প্রস্তাব দেন বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম। স্পিকারের কাছে লেখা অভিষেকের চিঠিতে ৮০ বিধায়কের মধ্যে ৭০ জনের স্বাক্ষরসহ আবেদন করা হয় স্পিকারের কাছে। তবে বিদ্রোহী শিবির থেকে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী নেতা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে ৭০ জনের স্বাক্ষরসহ স্পিকারের কাছে অভিষেকের করা আবেদনে অনেকের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

ঢাকায় ভারতে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বঢেকে আজ সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে গতকাল রোববার দিল্লির বিমানবন্দরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।

আজ সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, দিল্লির ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে যা হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। ঘটনার বিস্তারিত খবর নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট উইং।

কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ‘রহস্যজনক কারণে’ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে আজ দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন।

আজ থেকে দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

পাকিস্তানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় দেশটির বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বিমানটির দুই চালক। 

সোমবার (১৫ জুন) সকালের দিকে প্রদেশের মারদান জেলায় ঘটেছে এ ঘটনা। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর আন্তঃবিভাগ সংযোগ এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

নিহত দুই চালকের নাম-পরিচয়ও জানানো হয়েছে বিবৃতিতে। এরা হলেন বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুহম্মদ কাসিম আব্দুল্লাহ এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তাহা আব্বাসী।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুটিন প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিমানটি উড়িয়েছিলেন এ দুই চালক। কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই মারদান জেলায় ভূপাতিত হয় বিমানটি। চালক দু’জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে পাকিস্তান আইএসপিআর।

এ ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

এর আগে, গত সপ্তাহেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মিরে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়েছিল। ২২ জন সেনা কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত হয়েছিলেন এ ঘটনায়।