যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। এই চুক্তির আওতায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, চুক্তির মধ্যে ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিও রয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী সময়ে শুরু হবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা এ চুক্তির কিছু তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, ইরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে কি না, তা নির্ভর করবে তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করছে তার ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার জানান, তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু হামলা বাতিল করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দুই পক্ষের আলোচকেরা ‘একটি চমৎকার সমঝোতায়’ পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই এই চুক্তি সই হতে পারে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

গত এপ্রিলে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এমনকি চলতি সপ্তাহেও উভয় পক্ষ দুই দফায় একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।

মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি
মানচিত্রে হরমুজ প্রণালিফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার জানান, তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু হামলা বাতিল করেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দুই পক্ষের আলোচকেরা ‘একটি চমৎকার সমঝোতায়’ পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই এই চুক্তি সই হতে পারে।

গতকাল শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যমে একটি ১৪ দফা চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর সঙ্গে সম্মত হওয়া শর্তগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই এবং এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই।

এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হয়েছে এবং এটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উল্লেখ্য, এ চুক্তির ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান।

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ প্রধান প্রধান বিষয়ে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে এই চুক্তি হচ্ছে। তবে এ বিষয়ক আলোচনায় ইসরায়েল অংশ নেয়নি।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদ ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর সদস্যদের মধ্যে এ চুক্তির সর্বশেষ শর্তগুলো নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, এই বিষয়ে এখনো কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ‘আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ প্রধান প্রধান বিষয়ে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে এই চুক্তি হচ্ছে। তবে এ বিষয়ক আলোচনায় ইসরায়েল অংশ নেয়নি।

পশ্চিমা দেশগুলো দশকের পর দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ এনেছে। তবে ইরান বরাবর এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার মতো শান্তিপূর্ণ কাজের জন্যই এ পারমাণবিক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।

গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে তেহরানের রাস্তায় আবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে
গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে তেহরানের রাস্তায় আবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে,ছবি: রয়টার্স
 

গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এ চুক্তির আওতায় ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। বিনিময়ে ইরানের নৌ-পরিবহনের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। পদক্ষেপগুলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর করা হবে। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রধান উপাদান।

কর্মকর্তারা বলেছেন, আলোচনার ফলে ওই সব উপাদান ইরানের ভেতরেই ধ্বংস করা হবে এবং পরে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এটি ঠিক কীভাবে করা হবে, সেই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

ইরান আর্থিক সুবিধা পাবে শর্ত পূরণের ভিত্তিতে

অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানকে আগেভাগে কোনো অর্থ দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে ইরানি গণমাধ্যমের আগের কিছু প্রতিবেদন সরাসরি নাকচ হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, মূল আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরানের কিছু অবরুদ্ধ সম্পদ বা তহবিল ছেড়ে দেওয়া হবে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এর পরিবর্তে ইরানকে ধাপে ধাপে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ বা তহবিল অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করার মতো পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে পর্যায়ক্রমে।

এই চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য প্রক্সি বা ছায়া গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের অর্থায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কোনো বিশ্বাস বা প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি, বরং তা তৈরি হয়েছে কাজের প্রমাণের ওপর। ইরান শুধু তখনই অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, যখন এটি নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, তারা তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং এ দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতায় সহায়তাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যে বর্তমানে একটি সতর্ক আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। তবে চুক্তিটি চূড়ান্ত হতে এখনো কিছুটা পথ বাকি। গত এক বা দুই মাসে বেশ কয়েকবার এ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চুক্তি নিয়ে এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত নিউজ চ্যানেলে সরাসরি টেলিফোন কলে তিনি এ কথা জানান।

এ সময় ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইরান এখনো কোনো চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, চুক্তির খসড়ার বেশির ভাগ অংশ এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি করছে। নতুন নতুন অনুরোধ যোগ করছে।

ইসমাইল বাঘাই জানান, পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজ করছে।

জ্বালানিসহ বিশ্ববাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন ইসমাইল বাঘাই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ প্রণালিকে তুলনামূলক ‘কম নিরাপদ’ করে তুলেছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনায় চূড়ান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ অনুমোদন করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইরানে ‘খুবই কঠিন’ হামলার যে হুমকি দিয়েছিলেন, সেই পরিকল্পনা স্থাগিতের ঘোষণা দেন।

বৃহস্পতিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ চুক্তির বিষয়গুলো এবং সেগুলোর বিস্তারিত—দুটোই অনুমোদন করেছে।

পরে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প জানান, সপ্তাহান্তে ইউরোপের কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এ চুক্তি সই হতে পারে। তিনি এ আয়োজনে থাকতে পারবেন না। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স থাকবেন।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হবে। ট্রাম্পের এসব দাবির পরে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হলো, কিছুই এখনো চূড়ান্ত নয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ।

৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে ওয়াশিংটন ও তেহরান; কিন্তু এ যুদ্ধবিরতি ছিল ভঙ্গুর। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ।

এর মাঝে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনায় বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে সেই সময় চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো যায়নি। পরবর্তী সময়ে হামলা হলেও পর্দার অন্তরালে আলোচনা চলছিল।

বিবিসি

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মিরে সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রাণ হারানো ২২ জন সেনা কর্মকর্তার জানাজা সম্পন্ন। বৃহস্পতিবার (১২ জুন) মুজাফফরাবাদে নিহতদের শেষ বিদায়ের এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় অংশ নেন নিহতদের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বেসামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। এছাড়া শোকাতুর এই বিদায়লগ্নে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে নিহত সেনাসদস্যদের প্রতি বিশেষ সামরিক সম্মাননা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

এর আগে গত বুধবার (১১ জুন) পাকিস্তানের মুজাফফরাবাদ এলাকায় উড্ডয়নের পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি এমআই-সেভেনটিন  হেলিকপ্টার ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে পড়ে। আকাশযানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সাথে সাথেই ভেতরে থাকা ২২ জন আরোহীর সবাই প্রাণ হারান। প্রাথমিক তদন্তের পর সামরিক সূত্রগুলো জানান, মূলত উড্ডয়নের সময় হঠাৎ দেখা দেওয়া যান্ত্রিক ত্রুটির  কারণেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। তবে দুর্ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।

এই মর্মান্তিক ও আকস্মিক সেনা নিহতের ঘটনায় পুরো পাকিস্তানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পরপরই গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং দেশটির প্রতিরক্ষা প্রধানসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনায় চূড়ান্ত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ অনুমোদন করেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ইরানে ‘খুবই কঠিন’ হামলার যে হুমকি দিয়েছিলেন, সেই পরিকল্পনা স্থাগিতের কথা জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বিষয়গুলো ও সেগুলোর বিস্তারিত—দুটিই অনুমোদন করেছে।

এখানে সব পক্ষ বলতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, মিসর ও অন্যান্য দেশের কথা পোস্টে উল্লেখ করেছেন।

পরে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প আরও জানান, সপ্তাহান্তে ইউরোপের কোথাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এই চুক্তি সই হতে পারে। তবে তিনি এ আয়োজনে থাকতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেথানে থাকবেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত হবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানে বৃহস্পতিবার রাতের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, তেহরানের নেতৃত্বের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়’ এবং একাধিক আঞ্চলিক রাষ্ট্রের (চুক্তির খসড়া) অনুমোদনের পর তিনি ইরানে হামলা ও বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আলোচনার বিষয়টি ইরানের নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পেয়েছে। এর পরই আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজ সন্ধ্যায় ইরানে পূর্বনির্ধারিত হামলা ও বোমাবর্ষণ স্থগিত করেছি।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ইরানের সংবাদ সংস্থা ফারসের বরাতে এএফপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তির খসড়া তেহরানের পক্ষ থেকে এখনো অনুমোদন করা হয়নি। নাম প্রকাশ না করা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে এ কথা জানায় সংবাদ সংস্থাটি।

আর ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ ট্রাম্পের এমন ঘোষণা নাকচ করে বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগেও এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন; কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি।

সংবাদ সংস্থাটি বলেছে, যতক্ষণ না ইরান একটি সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে ঘোষণা দিচ্ছে, এ বিষয়ে ট্রাম্পের যেকোন কথাকে তাঁর আগের বার্তার মতোই বিবেচনা করা উচিত হবে।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ।

৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে ওয়াশিংটন ও তেহরান; কিন্তু এ যুদ্ধবিরতি ছিল ভঙ্গুর। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ।

এর মাঝে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনায় বসেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে সেই সময় চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌছানো যায়নি। পরবর্তী সময়ে হামলা হলেও পর্দার অন্তরালে আলোচনা চলছিল।

এর ফলে এবার ট্রাম্প জানালেন, চুক্তির বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ অনুমোদন করেছে। আর এ কারণে নতুন হামলার পরিকল্পনা থেকে তিনি সরে এসেছেন।

এএফপি আল–জাজিরা

সময়টা ছিল এপ্রিলের শুরু। মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জ সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সময় এসেছে।

জেনারেল জর্জ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। কারণ, বেশ কিছু বিষয়ে পেন্টাগনপ্রধান সরাসরি সেনা কর্মকর্তাদের কর্মজীবনে হস্তক্ষেপ করছিলেন। এর মধ্যে একটি ঘটনায় হেগসেথ নিজে উদ্যোগী হয়ে চারজন কর্নেলকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি আটকে দেন।

কয়েক মাস ধরেই হেগসেথকে সেনাবাহিনী ও জেনারেল জর্জসহ এর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্রমশ অসন্তুষ্ট হতে দেখা যাচ্ছিল। সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো সিএনএনকে জানায়, এই অসন্তোষের কারণ তাঁদের কাছে রহস্যময় ঠেকছিল। কারণ, হেগসেথের মেয়াদে তাঁর সঙ্গে জেনারেল জর্জের যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। এমনকি পদোন্নতি আটকে দেওয়ার আগেও তাঁদের মধ্যে তেমন কোনো আলাপ হয়নি।

সূত্রগুলোর মতে, এই ঘটনাটি হেগসেথের একটি নির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতির সঙ্গেই মিলে যায়—যেখানে সব তথ্য তাঁর দপ্তরের মধ্যেই কঠোর গোপনীয়তায় রাখা হতো এবং পেন্টাগন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা কী, তা বাইরের খুব কম মানুষই জানতে পারতেন।

হেগসেথ তাঁর চারপাশের অনেককেই তীব্র অবিশ্বাস করতেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল, সামরিক অভিযান সম্পর্কে জানতে কিছু সেনাকে গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে হতো এবং পেন্টাগনে মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা বা ‘পলিগ্রাফ টেস্ট’ নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

জেনারেল জর্জ হেগসেথের সঙ্গে এই টানাপোড়েন কিছুটা কমাতে চেয়েছিলেন। তাই ১ এপ্রিল তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং এগুলো অর্জনে সেনাবাহিনী কীভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের অনুরোধ করেন। পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা সিএনএনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কিন্তু সেই বৈঠক আর আলোর মুখ দেখেনি। পরদিনই জর্জকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

পেন্টাগনের বর্তমান ও সাবেক ১৫ জন কর্মকর্তা এবং হেগসেথের অধীনে এই বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সিএনএন।

একাধিক সূত্র জানায়, দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় শুরু থেকেই হেগসেথ তাঁর চারপাশের বেসামরিক–সামরিক কর্মকর্তাদেরই অবিশ্বাস করে আসছিলেন এবং তাঁদের আনুগত্য নিয়ে সংশয়ে ভুগছিলেন।

হেগসেথ এ পর্যন্ত ২৪ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো নৌবাহিনী সচিবকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় পদোন্নতির বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন, যা সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠিত করছে।

জেনারেল জর্জের বরখাস্তের সময়টি ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। যখন সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল শহরের বাইরে ছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে এই সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হতভম্ব করে দেয়। তবে এই বরখাস্তের ঘটনাটি অবশম্ভাবীই ছিল। এটি ছিল হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিশেষ করে জেনারেল জর্জের কয়েক মাসের টানাপোড়েনের চূড়ান্ত পরিণতি।

হেগসেথ ও ট্রাম্পের অন্য ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা শুরু থেকেই জর্জকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এর আংশিক কারণ ছিল, বাইডেন প্রশাসনের সময় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জর্জ।

হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে (ট্রাম্পের বাম পাশে) প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ২৭ মে ২০২৫, হোয়াইট হাউস
হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে (ট্রাম্পের বাম পাশে) প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ২৭ মে ২০২৫, হোয়াইট হাউসছবি: রয়টার্স

অরাজনৈতিক এই সামরিক দায়িত্বটি ছিল জর্জের দীর্ঘ কর্মজীবনের অনেকগুলো পদের একটি। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে সেনা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা জর্জের মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও ব্যাপক সুসম্পর্ক ছিল।

কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা এবং তথ্য প্রাপ্তি সীমিত করা হেগসেথের মেয়াদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, এটি কেবল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই সংস্কৃতি পেন্টাগনের অন্যান্য দপ্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি করেছে।

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন আমরা যা কিছু করতাম, তা হিসাব কষে করতে হতো—এই কাজের ফলে বসের চাকরি থাকবে তো, নাকি তিনি বরখাস্ত হবেন? প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে এটিই ছিল মূল ভাবনার বিষয়। কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া সত্যিই নজিরবিহীন।’

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সিএনএন যেসব বেনামী সূত্রের বরাত দিয়েছে, তারা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বহিরাগত। তারা উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিভাগকে কালিমালিপ্ত করতে এবং মন্ত্রী হেগসেথের নেতৃত্বকে দুর্বল করতে চায়।’

পার্নেল আরও বলেন, ‘যেকোনো সফল সংস্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তন হয় এবং যাঁরা চলে গেছেন, দেশের প্রতি তাঁদের সেবার জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী এবং আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।’

পেন্টাগনের ভেতরে এটি এখন এক প্রকাশ্য যে, পদে টিকে থাকতে হলে যতটা সম্ভব চুপচাপ থাকতে হবে এবং হেগসেথ ও তাঁর দপ্তরের নজর এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কখনো কখনো নেতাদের দায়িত্বে থাকাকালে সাহসী কিছু করতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয় এবং সেনাবাহিনী এমন নেতাদেরই এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, যাঁরা তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই পরিস্থিতি সেই ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে।’

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানান, জেনারেল জর্জ যখন সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ পরিচালকদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে তাঁকে জানানো হয়, হেগসেথ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।

জর্জ বৈঠক থেকে বের হয়ে যান এবং হেগসেথ তাঁকে বরখাস্তের খবরটি জানান। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, এটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি একটি ফোন কল, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। হেগসেথ খবরটি দেওয়ার ঠিক পরপরই সিবিএস নিউজের সাংবাদিক জেনিফার জ্যাকবস জনসমক্ষে এই বরখাস্তের খবরটি প্রকাশ করেন।

এর প্রায় ৩০ মিনিট পর জর্জ আবার তাঁর কর্মীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ততক্ষণে সবাই টুইটটি দেখে ফেলেছিল। পরিবেশটা বেশ অস্বস্তিকর ছিল। কারণ, সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—তিনি এখন কী বলবেন?’

জেনারেল জর্জ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কোনো আবেগ বা নাটকীয়তা ছাড়াই খবরটি জানান। তাঁর আচরণ এতটাই সহজ ছিল, যেন তিনি পরিবেশের অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করছিলেন।

সেই কর্মকর্তা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এরপর কর্মীরা একে একে এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করলেন বা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। পুরো পরিবেশটা ছিল বিষাদময়—যেন কেউ মারা গেছে।’ পরদিন সকালের মধ্যেই জেনারেল জর্জের দপ্তর খালি করে দেওয়া হয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সচিব ড্যানিয়েল ড্রিসকল ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন। ৭ মার্চ ২০২৬, ডেলাওয়ার
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সচিব ড্যানিয়েল ড্রিসকল ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন। ৭ মার্চ ২০২৬, ডেলাওয়ারছবি: রয়টার্স

তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ

পেন্টাগনে এই রদবদল আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে জেনারেল জর্জের বরখাস্তের বিষয়টি মার্কিন রাজনীতির উভয় শিবিরেই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আইনপ্রণেতারা তাঁকে একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর বরখাস্তের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

জেনারেল জর্জের বিদায়ের পর গত মাসে হাউস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস ডিফেন্স সাবকমিটির এক শুনানিতে সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল বলেন, ‘জেনারেল জর্জের ৪২ বছরের সেবা, তাঁর পার্পল হার্ট সম্মাননা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি আমার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা আর কারও নেই। আমি তাঁদের অত্যন্ত পছন্দ করি।’

হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের কাছে জর্জকে বরখাস্তের সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ‘ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি বিভাগের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা খুবই কঠিন, যদি সেখানে আগের কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকেন।’

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, হেগসেথের এই মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে, জর্জের বরখাস্তের ঘটনাটি ‘হেগসেথের সেই সংজ্ঞাহীন সংস্কৃতি যুদ্ধের অংশ, যা তিনি তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যেতে চান।’

তবে এই গোপনীয়তা ও সন্দেহের বাতাবরণই পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে।

নিজের মেয়াদের অধিকাংশ সময়ের মতোই হেগসেথ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে প্রধান সামরিক পরিকল্পনাবিদদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এর অর্থ হলো, জয়েন্ট স্টাফ—যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সামরিক পরিকল্পনা ও পরামর্শ দেওয়ার মূল কেন্দ্র—তার কিছু সদস্য ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত ভাবনা সম্পর্কে খুব কমই জানতেন।

ফলে সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আকস্মিকভাবে ভেনেজুয়েলা উপকূলে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডসহ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরের রসদ জোগানোর দায়িত্ব সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

সূত্রগুলো জানায়, হেগসেথ ও প্রশাসনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ধরনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা মার্কিন কমান্ডারদের জন্য ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা হেগসেথের মেয়াদ সম্পর্কে বলেন, ‘এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও পেন্টাগনের ভেতরে স্পষ্ট কোনো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। যার মূল কারণ চরম সংশয় ও অবিশ্বাস। এখানে কোনো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নেই, কোনো বিশ্বাস নেই। আর বিশ্বাস না থাকলে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হেগসেথ এবং তাঁর দল এই সংঘাতকে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে চিত্রিত করতে ব্যস্ত। এমনকি সংবাদ সম্মেলনগুলোতে তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোকে ‘চরম দেশদ্রোহী’ বলে সমালোচনা করেছেন।

অন্য একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে হেগসেথ হোয়াইট হাউসের জন্য ‘যুদ্ধের ভিডিও’ তৈরির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এটি অনেকটা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রচেষ্টার মতোই, যারা অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগের ভিডিও প্রচার করে নিজেদের সাফল্য জাহির করার চেষ্টা করেছিল।

তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের পদক্ষেপের ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক বাস্তবতা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে এবং তেহরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে হেগসেথের দাবির বিপরীত প্রতিবেদনগুলো দেখে ট্রাম্প যখন ক্রমশ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবারও তথ্য ফাঁসের তদন্তে মনোযোগ দিয়েছেন।

হেগসেথের পথ অনুসরণ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মোতায়েন থাকা সেনাদের তথ্য ফাঁসের বিষয়ে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এমনকি সাধারণ তথ্য শেয়ার করা থেকে সেনাদের বিরত রাখতে ক্লাসিফিকেশনের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের ভয় দেখানো হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ওই সূত্রটি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ‘তারা আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন আমরাই শত্রু।’

বরখাস্ত হওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জ
বরখাস্ত হওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জফাইল ছবি: রয়টার্স

সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েন

হেগসেথের মেয়াদে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অন্যতম বড় উদাহরণ হলো সেনাবাহিনী সচিব ড্রিসকলের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব। এর মূল কারণ ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ড্রিসকলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ড্রিসকলের এই সম্পর্ককে হেগসেথ তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখতেন। এই নিরাপত্তাহীনতা গত বছর চরম রূপ নেয় যখন ড্রিসকল ভ্যান্স ও ট্রাম্পকে পেন্টাগনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।

ড্রিসকল এবং ভ্যান্স ইয়েল ল স্কুলের সহপাঠী ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব রয়েছে। তরুণ এই সেনাবাহিনী সচিব প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও নিজস্ব সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা স্পষ্ট হয় যখন ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে আবার আলোচনায় বসানোর জন্য ড্রিসকলকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

তা সত্ত্বেও পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ড্রিসকল ও হেগসেথের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব ‘শুরু থেকেই’ স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর প্রতি তাঁর এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।’

জেনারেল জর্জকে সরানোর কয়েক মাস আগেই হেগসেথ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ভাইস চিফ অব স্টাফ জেনারেল জেমস মিঙ্গুসকে সরিয়ে তাঁর নিজের সামরিক সহকারী জেনারেল ক্রিস লানেভকে সেই পদে বসান।

সূত্রগুলো জানায়, লানেভকে এই পদে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যই ছিল একসময় তাঁকে দিয়ে জর্জের স্থলাভিষিক্ত করা। জর্জ বরখাস্ত হওয়ার পর লানেভ ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ায় সেই ধারণাই সত্যি হলো।

জেনারেল জর্জকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা স্তব্ধ হয়ে যান, যখন নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানকেও আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

সিএনএন জানায়, পেন্টাগনের মুখপাত্র যখন এক্সে ঘোষণা দেন, ফেলান ‘অবিলম্বে’ পদত্যাগ করছেন, তখনো ফেলান হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন, তাঁর বরখাস্তের আদেশটি বৈধ কি না।

প্রতিরক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা রসিকতা করে বলছিলেন, ড্রিসকলের আগে ফেলানকে সরিয়ে দেওয়াটা বেশ আশ্চর্যজনক ছিল।

তবে একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, বেশ কিছু কারণে ফেলানের সঙ্গেও হেগসেথের সম্পর্ক গত কয়েক মাসে তিক্ত হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে প্রশাসনের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোতে ফেলানের ধীরগতি এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ফেলানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে হেগসেথের সন্দেহ অন্যতম।

ফেলানের বরখাস্তের আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, কাজের ক্ষেত্রে তাঁর বেশ কিছু ‘ঘাটতি’ পাওয়া গিয়েছিল—প্রধানত জাহাজ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি ধীরগতিতে চলছিলেন এবং নৌবাহিনী ও মেরিন কোরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হেগসেথের দপ্তরের সরাসরি যোগাযোগে নিরুৎসাহিত করছিলেন।

একই সূত্র জানায়, নৌবাহিনীর আন্ডার সেক্রেটারি হাং কাওকে তাঁর বসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কাও এখন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ার আগেই হেগসেথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল।

ফেলানকে বরখাস্তের প্রায় একদিন পর ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করে বলেন, তিনি ‘দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী, যিনি অসাধারণ কাজ করেছেন।’

একইভাবে ট্রাম্প হেগসেথের প্রশংসাও জারি রেখেছেন, যদিও পেন্টাগনের ভেতরের ও বাইরের সূত্রগুলো এক বছর ধরে ধারণা আসছিল, প্রেসিডেন্ট শিগগিরই নতুন কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেছে নিতে পারেন।

সূত্রগুলো জানায়, হেগসেথ তাঁর জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যগুলোতে প্রায়ই সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, যা আসলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্যেই বলা এবং প্রেসিডেন্টের এই শৈলী পছন্দ। পেন্টাগনের ওপারে যতই নাটকীয়তা চলুক না কেন, প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পাশ থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ দেখাননি।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক শুনানিতে নিজের বাম পাশে বসা হেগসেথকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ, একদম উপযুক্ত চরিত্র। ও যুদ্ধ ভালোবাসে।’

২০২৪ সালে মিয়ানমার জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকরের পর গৃহযুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। জোরপূর্বক নিয়োগ করা বিপুল সেনা জান্তার শক্তি অনেক বাড়িয়েছে; পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে করা নিরাপত্তাচুক্তিও তাদের বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। অন্যদিকে চরম অর্থ ও অস্ত্রসংকটে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যার ফলে থমকে গেছে তাদের এত দিনের অগ্রযাত্রা। এ নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন বিবিসির কুয়েন্টিন সামারভিল

কুয়েন্টিন সামারভিল, বিবিসি

লাইসেন্স জালিয়াতি করে প্রায় ১৭ বছর ধরে শত শত ফ্লাইট পরিচালনার অভিযোগে কানাডার বিমান সংস্থার এক সাবেক পাইলটকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চার মাসের তদন্ত শেষে গতকাল মঙ্গলবার এয়ার কানাডার সাবেক ক্যাপ্টেন জিওফ্রে ওয়ালের বিরুদ্ধে জালিয়াতিসহ বেশ কিছু অপরাধের অভিযোগ এনেছে কানাডার পিল অঞ্চলের পুলিশ।

পিল রিজিওনাল পুলিশ জানায়, ৫৯ বছর বয়সী জিওফ্রে ওয়াল ভুয়া পাইলট লাইসেন্স ব্যবহার করে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৯ শতাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন। গত বছর অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত যোগ্যতার সনদ নিয়ে এয়ার কানাডা ও কানাডার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষকেই তিনি প্রতারিত করেছেন বলে পুলিশের কাছে প্রমাণ রয়েছে।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, ওয়ালের একটি বৈধ বাণিজ্যিক পাইলট লাইসেন্স ছিল। তবে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন (প্রধান চালক) থেকে উচ্চস্তরের যে ‘এয়ারলাইন ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স’ প্রয়োজন, সেটি তাঁর ছিল না।

গত বছর অবসরে যাওয়ার আগপর্যন্ত যোগ্যতার সনদ নিয়ে এয়ার কানাডা ও কানাডার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষকেই তিনি প্রতারিত করেছেন বলে পুলিশের কাছে প্রমাণ রয়েছে।

সাবেক এই পাইলটের বিরুদ্ধে একটি জালিয়াতি, দুটি জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, তিনটি ভুয়া ট্রেডমার্ক নিজের কাছে রাখা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার একটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য ওয়ালের কোনো আইনি প্রতিনিধির খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আল-জাজিরা।

‘এ ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের এবং জনমানুষের আস্থা ও নিরাপত্তার মূলে আঘাত করেছে। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি ৯০০টিরও বেশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে লাখ লাখ যাত্রীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে’, এক বিবৃতিতে বলেন পিল রিজিওনাল পুলিশের প্রধান নিশান দুরাইয়াপ্পা।

অন্যদিকে এয়ার কানাডা জানিয়েছে, তারা সাবেক এ পাইলটের কর্মকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের’ সঙ্গে দেখলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা কখনোই বিঘ্নিত বা ঝুঁকির মুখে পড়েনি। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রতি ছয় মাস পরপর সব পাইলটের দক্ষতা যাচাইয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি একজন সনদধারী পাইলটের অধীন বছরে একবার ফ্লাইট পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের এবং জনমানুষের আস্থা ও নিরাপত্তার মূলে আঘাত করেছে। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি ৯০০টিরও বেশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে লাখ লাখ যাত্রীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।নিশান দুরাইয়াপ্পা, পিল রিজিওনাল পুলিশের প্রধান
 

বিমান সংস্থাটি আরও জানায়, ওয়াল তাঁর সব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন ও বড় উড়োজাহাজ নিরাপদে চালানোর ক্ষেত্রে ‘উচ্চস্তরের দক্ষতা’ প্রদর্শন করেছেন। রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, তাদের অন্য পাইলটদের লাইসেন্স পরীক্ষার পর লাইসেন্স–সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের আর কোনো প্রমাণ বা নজির পাওয়া যায়নি।

এদিকে এয়ার কানাডা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিষয়টি জানার পরপরই ওই ব্যক্তিকে সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং স্বেচ্ছায় বিষয়টি ‘ট্রান্সপোর্ট কানাডা’–কে জানানো হয়।

এয়ার কানাডা জানায়, লাইসেন্স জালিয়াতির আশ্রয় নিলেও ওয়াল তাঁর সব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন ও বড় উড়োজাহাজ নিরাপদে চালানোর ক্ষেত্রে ‘উচ্চস্তরের দক্ষতা’ প্রদর্শন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান ও পেশাদার পাইলট হাসান শাহিদি অভিযুক্ত ওয়ালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ‘ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত বিরল ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

আল–জাজিরা

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহর ‘ফিফথ ফ্লিট’কে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানস্থল হিসেবে পরিচিত একটি বিমানঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি।

এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখনো চলছে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ার করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

আইআরজিসি আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে জাস্ক, সিরিক ও কেশম দ্বীপের কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে। হামলায় সিরিকের বেমানি জেলায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে।

জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক সদস্যরা থাকেন।

আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বিমানঘাঁটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে ও সেগুলো ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে আছে–এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও কন্ট্রোল কেন্দ্র।

আইআরজিসি এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে বড় আকারের প্রতিশোধমূলক অভিযানের বড় ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, এ অভিযানের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন মার্কিন বিমান ও নৌঘাঁটির ২১টি নিশানায় আঘাত হানা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফ বলেছেন, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় আছে এবং এর সাহায্যে (ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ইত্যাদি) প্রতিহত করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কুয়েতের সেনাবাহিনী বাসিন্দাদের কর্তৃপক্ষের জারি করা নিরাপত্তা নির্দেশনা ও সতর্কতামূলক পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের শুধু সরকারি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আল–জাজিরা

ইরানে আবার হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানকে ‘পাল্টা জবাব’ দেওয়ার হুমকির পর দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলো। হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার অভিযোগ এনে ইরানে এ হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বলেছে, মঙ্গলবার ইরানে হামলা চালানো শুরু করে মার্কিন বাহিনী। এ অভিযান ইরানের ‘অযৌক্তিক আগ্রাসনের সমানুপাতিক জবাব’।

হামলার পর পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির উপকূল এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় ভূপাতিত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের দুই ক্রুকে একটি মার্কিন সামুদ্রিক ড্রোন উদ্ধার করেছে। এমন অভিযানে এ ধরনের যান ব্যবহারের বিষয়টি এই প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করল মার্কিন সামরিক বাহিনী।

[caption id="attachment_275785" align="alignnone" width="749"] যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প[/caption]

এর আগে নিজের ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাঁকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও লেখেন, হেলিকপ্টারটিতে দুজন পাইলট ছিলেন। তাঁরা নিরাপদ ও অক্ষত আছেন। তা সত্ত্বেও এ হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেই হবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হেলিকপ্টারটিতে হামলার জন্য ইরান একটি ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে ড্রোনটি ইচ্ছাকৃতভাবে হেলিকপ্টারটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ইরানের আধা সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনায় তেহরান দায় স্বীকার করেনি।

হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেন্টকম ঘোষণা দেয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে।

বিবিসি

চলতি জুন মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৭ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার। এই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১২ কোটি ২৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, চলতি জুন মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আর গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৯০ কোটি ৭২ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৮ জুন পর্যন্ত দেশে এসেছে ৩ হাজার ৩৭৩ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স। বছর ব্যবধানে যা বেড়েছে ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এর আগে গত মে মাসে দেশে এসেছে মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। যা দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।

গত এপ্রিলে দেশে এসেছিল ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার। আর গত মার্চে দেশে এসেছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। যা দেশের ইতিহাসে যে কোনো এক মাসের সর্বোচ্চ।

গত ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসে যথাক্রমে দেশে এসেছে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ৬০ হাজার ও ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। গত ডিসেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার; নভেম্বরে এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স।

এছাড়া গত অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছিল যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ও ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আর গত আগস্ট ও জুলাইয়ে যথাক্রমে দেশে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ও ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

এদিকে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে দেশে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড।