যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মধ্যেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। এ অবস্থায় শান্তি আলোচনার পরিবেশ জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওয়াশিংটন ছেড়েছেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বলেছে, আজ রোববার আলোচনা শুরু হবে।

আলোচনা চলাকালে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। লেবাননে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলার জেরে গতকাল শনিবার ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বলেছে, ওই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে।

মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার অভিযোগ করেছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া ১৪ দফা অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। ওই শর্তে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা বলা ছিল।

এমন পরিস্থিতি শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আলোচনার লক্ষ্য হলো, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া ইরান–যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী চুক্তি এগিয়ে নেওয়া। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর উদ্দেশ্য, দুই দেশের মধ্যে প্রায় চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো।

লেবাননে ইসরায়েলের হামলা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে আইআরজিসি। তারা সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে আসা জাহাজগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, শনিবার ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসব জাহাজে করে বিশ্ববাজারের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবহন করা হচ্ছে।

সেন্টকম আরও বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

চুক্তি যদি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবে কার্যকর না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহও স্বাভাবিক হবে না।
মোহাম্মদ মোখবার, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে এবং এর পরেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো টোল বা ফি নেওয়া হবে না। তবে যদি শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে এমন ফি আরোপ করতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প আরও লিখেছেন, শান্তিচুক্তি না হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা পালন করছে, তার বিনিময়ে টোল আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার অভিযোগ করেছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া ১৪ দফা অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্ত বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। ওই শর্তে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা রয়েছে।

মোহাম্মদ মোখবার বলেন, চুক্তি যদি শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহও স্বাভাবিক হবে না।

এদিকে লেবাননের যুদ্ধবিরতি বেশ নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে যুদ্ধবিরতি বহাল থাকবে। একই সঙ্গে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো কোনো আলামত তিনি দেখেননি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডে আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। এ দলে আরও আছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনে উদ্ধারকাজ চলছে। কাছাকাছি জায়গায় দাঁড়িয়ে তা দেখছে এক শিশু। ২০ জুন, ২০২৬
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনে উদ্ধারকাজ চলছে। কাছাকাছি জায়গায় দাঁড়িয়ে তা দেখছে এক শিশু। ২০ জুন, ২০২৬, ছবি: রয়টার্স
 

ওদিকে মার্কিন প্রতিনিধিদলে জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার রয়েছেন।

গতকাল গ্রিনিচ মান সময় রাত ৯টার দিকে ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হন। মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটি থেকে উড়োজাহাজে ওঠার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আলোচকেরা সম্ভবত ‘কয়েক দিন’ বৈঠক করবেন।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, আমরা আলোচনায় পারমাণবিক ইস্যুতে এগোতে পারব। একই সঙ্গে লেবাননে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা এগিয়ে নিতে পারব।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, অতীতে চুক্তি কার্যকর করতে অপর পক্ষের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ইরান সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেবে।

ইতিমধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠেয় বৈঠকগুলোতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির অংশ নেবেন।

লেবাননে সংঘর্ষ বন্ধ করা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম শর্ত। তবে লেবাননের ‘লেবানিজ সিভিল ডিফেন্স’ বলেছে, গতকাল শনিবার যুদ্ধবিরতি (লেবানন–ইসরায়েল) কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন।

লেবাননে নিজেদের বাহিনীকে রক্ষার অঙ্গীকার ইসরায়েলের

লেবাননে সংঘর্ষ বন্ধ করা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম শর্ত। তবে লেবাননের ‘লেবানিজ সিভিল ডিফেন্স’ বলেছে, গতকাল যুদ্ধবিরতি (লেবানন–ইসরায়েল) কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের দাবি, তারা হিজবুল্লাহর হামলার জবাব দিয়েছে। আর ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা লেবাননে ইসরায়েলকে ‘অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা’ দেবে না।

ইসরায়েল বলেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া চুক্তির সঙ্গে তারা নেই। সে কারণে লেবাননের যে অঞ্চলগুলো বর্তমানে তাদের দখলে রয়েছে, সেখানে নিজেদের বাহিনী বহাল রাখবে তারা।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ইসরায়েল বা তার সেনাদের প্রতি যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে তারা পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভ বলেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী দেশটির সেনাবাহিনীকে লেবাননে গোলাগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে সেনারা যে এলাকাগুলো দখল করেছেন, সেখান থেকে তাঁরা আপাতত সরে আসবেন না।

রয়টার্স

ইরানের যুদ্ধ বন্ধে চলমান আলোচনা ব্যর্থ হলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে টোল বসানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের খরচের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই টোল আদায় করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এই হুঁশিয়ারি দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ট্রুথ সোশ্যালে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের সঙ্গে যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি না হয়, তবে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে টোল বসানো হবে। টোলের অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ বা অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে মার্কিন বাহিনী। এই সুরক্ষার পেছনে ওয়াশিংটনের যে বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে, তা উশুল করতেই এই টোল আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের টোল বসানোর এমন হুমকি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

এএফপি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দেশটির সামরিক বাহিনীকে হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে দখল করে রাখা এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।

ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২ এ খবর জানিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটির কমপক্ষে ৪ হাজার ৫৭ জন মানুষ নিহত ও ১২ হাজার ১২১ জন আহত হয়েছেন। হতাহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দা।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে হরমুজ প্রণালিতে আজ শনিবার আবার নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে ইরান। দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বলেছে, এটি ‘প্রথম পদক্ষেপ’ এবং আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ)’ পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আগামীকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে দুই দেশের ‘টেকনিক্যাল পর্যায়ের’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন।

১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফাতেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গত বুধবার স্মারকটি সই হওয়ার পরও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় সুইজারল্যান্ডের পরিকল্পিত আলোচনা বিলম্বিত হলো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে উচ্চপর্যায়ের একটি ইরানি প্রতিনিধিদল আজ সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও শিগগিরই বৈঠকে যোগ দিতে রওনা হবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং তেল খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

আল–জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল আবার বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ আজ শনিবার জানায়, দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর কাতাম আল-আনবিয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বলেছে, এটি ‘প্রথম পদক্ষেপ’ এবং আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানে যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর ইরান জলপথটি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হওয়ার পর তা খুলে দিয়েছিল তেহরান।

সমঝোতা স্মারক সই হলেও যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের মধ্যে এখনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পর তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আজ বলেছেন, তিনি শিগগির সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে যেতে পারেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের ১৪ দফা চুক্তির ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি টিকে থাকবে বলে তিনি আশাবাদী এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের কোনো প্রমাণ তিনি দেখেননি।

আজ ইরানের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তাদের একটি প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফারস নিউজ এজেন্সিকে বলেন, সুইজারল্যান্ডে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরবেন এবং কীভাবে তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করবে, তা স্পষ্ট করার চেষ্টা করবেন।

মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, প্রতিনিধিদলটি কয়েক মিনিটের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেবে। তিনি আরও বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তবে ইরান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রেসিডেন্ট পরিবহন বহরে নতুন একটি উড়োজাহাজ যুক্ত করেছে। কাতারের উপহার দেওয়া বিলাসবহুল ওই ভিসি-২৫বি ব্রিজ উড়োজাহাজটি নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।

এটি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে নৈতিকতা, সংবিধান ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এ উড়োজাহাজে কী এমন আছে যে এত বিতর্ক আর সমালোচনার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি গ্রহণ করেছেন।

গতকাল শুক্রবার মার্কিন বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশেষ ক্ষমতা ও নিরাপত্তা সুরক্ষাযুক্ত নতুন ভিসি-২৫বি ব্রিজ উড়োজাহাজটি প্রেসিডেনশিয়াল এয়ারলিফট গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নানা সংস্কার ও সংযোজনের মাধ্যমে আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করে তোলা এই বোয়িং ৭৪৭-৮আই উড়োজাহাজটির ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিলাসবহুল ভিভিআইপি পরিবহন উড়োজাহাজটি মূলত কাতারের রাজপরিবারে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমে এটি কাতারের রাজপরিবারের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়।

প্রেসিডেন্টকে বহন করার দায়িত্ব নেওয়ার আগে চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষার জন্য উড়োজাহাজটি মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে নেওয়া হয়েছে। এটি শিগগিরই প্রাথমিক পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শুরু করবে।

নানা সংস্কার ও সংযোজনের মাধ্যমে আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করে তোলা এই বোয়িং ৭৪৭-৮আই উড়োজাহাজটির ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। প্রায় ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিলাসবহুল ভিভিআইপি পরিবহন উড়োজাহাজটি মূলত কাতারের রাজপরিবারে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রথমে এটি কাতারের রাজপরিবারের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ‘ব্রিজ’ উড়োজাহাজটি আনা হয়েছে পুরোনো ভিসি-২৫এ বহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধান হিসেবে বোয়িং ভিসি-২৫বি সেবায় যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের আকাশপথে যাতায়াত কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এটি ব্যবহার করা হবে।

কাতারের উপহার ৪০ কোটি ডলারের উড়োজাহাজ

এই নির্দিষ্ট উড়োজাহাজ কীভাবে নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান হয়ে উঠল, তার পেছনের গল্পে রয়েছে উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও করপোরেট বিলম্ব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ।

উড়োজাহাজটি মূলত কাতারের রাজপরিবারের (হাউস অব থানি) জন্য একটি ‘বোয়িং বিজনেস জেট’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। পরে কাতারের আমির এটি যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এয়ারফোর্স ওয়ান বহরে পুরোনো হয়ে যাওয়া উড়োজাহাজগুলোর স্থানে নতুন উড়োজাহাজ সংযুক্ত করতে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে ২০১৮ সালে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু বোয়িং উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে অনেক বেশি দেরি করছে, প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৪ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে।

বিদেশি নেতারা যেখানে নতুন ও বড় উড়োজাহাজে ভ্রমণ করছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখনো ৩৫ বছরের পুরোনো উড়োজাহাজ ব্যবহার করছেন। বিরক্ত ট্রাম্প তাই নিজেই কাতারের রাজপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের থেকে উড়োজাহাজটি বিনা মূল্যে উপহার হিসেবে সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন।

যেহেতু উড়োজাহাজটি আনুষ্ঠানিক উপহার হিসেবে হস্তান্তর করা হয়েছিল, তাই প্রাথমিকভাবে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের এই বিলাসবহুল ভিভিআইপি পরিবহনটি যুক্তরাষ্ট্র সরকার অধিগ্রহণ করে। যদিও এ সিদ্ধান্ত বিদেশি উপহারের বিষয়ে সাংবিধানিক নিয়ম নিয়ে উল্লেখযোগ্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের কেন ‘ব্রিজ’ উড়োজাহাজ দরকার

বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যাতায়াতের জন্য যে দুটি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত বোয়িং ৭৪৭-২০০বি উড়োজাহাজের ওপর নির্ভর করেন, সেগুলো সামরিকভাবে ভিসি-২৫এ নামে পরিচিত। এই উড়োজাহাজগুলো ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বয়স বৃদ্ধির কারণে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ক্রমশ দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল হয়ে উঠছে।

স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বোয়িংয়ের নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহ করা না পর্যন্ত ঘাটতি এড়াতে বিমানবাহিনী তাই ‘ব্রিজ’ কর্মসূচি চালু করেছে।

এই উড়োজাহাজ পুরোনো বহরের ওপর থাকা ব্যাপক চাপ কমাতে সহায়তা করবে। সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের যেকোনো মুহূর্তে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য একটি উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট ব্যবহার করার সুবিধাও নিশ্চিত করা যাবে।

বিলাসিতা যখন সামরিক নিরাপত্তায় মেশে

মার্কিন বিমানবাহিনী উড়োজাহাজটির সংস্কার করে সেটির গতি, বিলাসিতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য এনেছে। এই প্রক্রিয়া উড়োজাহাজটিকে বিশেষ করে তুলেছে।

যেহেতু উড়োজাহাজটি একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল, তাই এটি আগে থেকেই অত্যন্ত বিলাসবহুল এবং এটিতে অতি উন্নত মানের যাত্রীসুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বিমানবাহিনী উড়োজাহাজটির বিলাসবহুল অভ্যন্তরের অনেক অংশই অপরিবর্তিত রেখেছে। তারা মূলত সেটির সামরিক উন্নয়নে সব মনোযোগ দিয়েছে।

কেবিনগুলো সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করার পরিবর্তে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থার নিরাপত্তা–বিশেষজ্ঞদের একটি অভিজাত দল উড়োজাহাজটি সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে সম্ভাব্য যেকোনো প্রযুক্তিগত ঝুঁকি শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করেছে। এরপর তারা অত্যাধুনিক উন্নয়নসমূহ সংযোজন করেছে।

নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সেটিতে উন্নত ও বহস্তরবিশিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে প্রেসিডেন্ট আকাশপথে থেকেও দেশ পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে এটিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও নিরাপদে উড্ডয়নের উপযুক্ত করা হয়েছে

এরপর কী

তবে উড়োজাহাজটি এখনো প্রেসিডেন্টকে বহনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বর্তমানে এটি মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে ‘কমিশনিং ফ্লাইট’ পরিচালনার পর্যায়ে রয়েছে। ক্রু ও প্রযুক্তিবিদেরা উড়োজাহাজটির মিশন সক্ষমতা যাচাই করছেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতাকে পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত নিরাপত্তা প্রটোকল নির্ধারণ করছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আগামী ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে ওয়াশিংটন ডিসিতে বিমানবাহিনীর যে প্রদর্শনী হবে, সেখানে এই উড়োজাহাজ রাখতে চান। এ ছাড়া মাউন্ট রাশমোরে প্রেসিডেন্টের প্রথম উড়োজাহাজ ভ্রমণের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও দুরূহ সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো একটি বিশেষায়িত ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটার’ তৈরির কাজ অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার মোরেটন বে এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঐতিহাসিক প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী এ প্রকল্পকে একটি বড় জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এর ফলে আগামী দিনের এমন জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন অস্ট্রেলিয়াতেই তৈরি হবে, তেমন এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

চিকিৎসা, জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম এ প্রযুক্তি বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়াকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জনসংখ্যায় ছোট হলেও কোয়ান্টাম পদার্থবিদের সংখ্যার দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া বেশ এগিয়ে। দক্ষ বিজ্ঞানীদের বিশাল উপস্থিতির কারণে দেশটিকে এই প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জটিল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির ঐতিহাসিক প্রকল্পের কাজ
অস্ট্রেলিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জটিল কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির ঐতিহাসিক প্রকল্পের কাজ, ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমকে এ প্রকল্প নিয়ে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘সাইকোয়ান্টাম’-এর অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী ভিক্টর পেং বলেন, বাস্তব পৃথিবীর জটিল সমস্যা সমাধানের উপযোগী একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। তবে মোরেটন বে শহর এ কাজটিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।

বাস্তব পৃথিবীর জটিল সমস্যা সমাধানের উপযোগী একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ।

ভিক্টর পেং, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সাইকোয়ান্টাম-এর অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল বিজ্ঞানবিষয়ক মন্ত্রী টিম আয়ারস এ প্রকল্পকে একটি বড় জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগের ফলে আগামী দিনের এমন জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন অস্ট্রেলিয়াতেই তৈরি হবে, তেমন এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এ লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় এবং কুইন্সল্যান্ড রাজ্য সরকার যৌথভাবে ৯৪ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের (প্রায় ৯৪০ মিলিয়ন) বিশাল তহবিল বরাদ্দ করেছে।

সিডনি

ওয়াশিংটন ও দুবাই

আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা হবে। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দেওয়ার অল্প সময় আগে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ লেবাননে আবারও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ অবসানে হওয়া সমঝোতা স্মারক ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দেশটির পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সহিংসতা অবসানের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

দুই নেতা ২৩ ও ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় আলোচনা নিয়েও কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ‘বৈঠকগুলোতে দুটি সার্বভৌম সরকার স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করবে।’

গত এপ্রিল মাসে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে প্রথম দফার সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালের পর ওই প্রথম দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বৈঠকে বসেন।

ওই বৈঠক এবং জুনে অনুষ্ঠিত পরবর্তী দফার আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবানন দুই দেশই সংঘর্ষে বিরতির ঘোষণা দিয়েছে। তবে এসব আলোচনায় হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এতে অর্থবহ কোনো অগ্রগতি অর্জন করার কাজটি কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত আছে। সর্বশেষ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে লেবাননের সরকার যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি রোডম্যাপের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

লেবাননের সরকারও দেশটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে জুন মাসে হওয়া একটি চুক্তিতে হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা হয়েছে, তাতে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তবে চলমান সংঘর্ষ সে সমঝোতা বাস্তবায়নের পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিরলভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা করেন।

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল স্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ বজায় রাখতে চায়।

আল–জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তি–পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ড সফর করার কথা থাকলেও তা স্থগিত করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি চলছে।

আজ শুক্রবার এ আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। হোয়াইট হাউসের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হোয়াইট হাউসের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ রাতে রওনা হচ্ছেন না।’

মুখপাত্র আরও বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব কারিগরি আলোচনা শুরু করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।’

উল্লেখ্য, জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা ছিল আজ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। তবে কোনো আভাস না দিয়ে এক দিন আগেই গত বুধবার রাতে (বাংলাদেশ সময়) স্মারকে সই করা হয়।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেন, এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) রাতে রওনা হচ্ছেন না।

ফ্রান্স থেকে ভার্চ্যুয়ালি স্মারকে সই করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তেহরান থেকে সই করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

পরে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানিয়ে দেন, শুক্রবার (আজ) জেনেভায় প্রাথমিক চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) সইয়ের আনুষ্ঠানিকতা হচ্ছে না। তবে এদিন চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছে দেশটি।

এ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল পর্বতের শীর্ষে অবস্থিত একটি অবকাশকেন্দ্রে। সেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা থাকার কথা। আলোচনা চলার কথা ৬০ দিন। সেখানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও জব্দ করা অর্থ ছাড় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

লেবাননে যদি ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যায়, তবে ইরান চুক্তি থেকে সরে যেতে পারে। ইসরায়েলকে সামলে রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই পড়ে।
—মোস্তাফা কোসচেশম, তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক

তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালে চুক্তি করতে প্রায় দুই বছর লেগেছিল। তাই এবারের আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকেরা। তাঁর ভাষ্য, ইরান যত দিন ‘ঠিকঠাক আচরণ’ করবে, এ সময়সীমা নিয়ে তিনি ভাববেন না।

বুধবার সই হওয়া এ স্মারককে ‘ঐতিহাসিক’ বলেছে ইরান। দেশটি ইতিবাচক থাকলেও শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিক দিয়ে। স্মারকে সই করার পরই হুমকি আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে। সমঝোতার শর্ত মেনে না চললে ইরানে হামলা করা হবে বলে জানান তিনি। আর সমঝোতা স্মারকের বিপরীতে গিয়ে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল।

শঙ্কা থাকলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সবচেয়ে বড় ঘটনা। যুদ্ধে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এর ধাক্কা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ওপর পড়েছে।

যদিও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি ভালো হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সমঝোতা অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু জাহাজ পারাপারের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের পতাকাবাহী একটি জাহাজ রয়েছে। ইরানের ১১টি জাহাজও দেশটির বন্দর ছেড়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়েছে। এদিন প্রতি ব্যারেল তেলের দামও কমে ৭৯ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

এ পরিস্থিতিতে চুক্তি টেকসই করার বড় দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বলে মনে করেন তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তাফা কোসচেশম। তাঁর শঙ্কাও ইসরায়েলকে নিয়ে।

আল–জাজিরাকে এই অধ্যাপক বলেন, লেবাননে যদি ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যায়, তবে ইরান চুক্তি থেকে সরে যেতে পারে। ইসরায়েলকে সামলে রাখার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই পড়ে।

এএফপি, আল–জাজিরা
বিবিসি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, এই চুক্তির বিষয়ে তাঁর ভিন্ন মত রয়েছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মরিয়া হয়েই’ এই চুক্তিতে সই করেছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, ‘প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী’ এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অবরোধ কার্যকরের মার্কিন তৎপরতা বন্ধ হলো।

এ বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, শুরুতে তিনি এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন।

এই চুক্তিতে বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।

চুক্তির পক্ষে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, চুক্তির শর্তগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থ পাবে না বা নিষেধাজ্ঞা থেকেও ছাড় পাবে না।

সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ অনুযায়ী, ইরান এখনই কোনো সুবিধা পাবে না। এর আগে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা ‘পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলবে এবং নিজেদের আচরণ বদলাবে’। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে আর কোনো অর্থ দেওয়া চলবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি
 

বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেডি ভ্যান্স। তিনি জানান, চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে পরবর্তী ৬০ দিন আরও আলোচনা চলবে। ‘কারিগরি আলোচনার’ জন্য তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে যেতে পারেন বলেও জানিয়েছেন।

তবে তিনি কবে যাবেন, তা নির্দিষ্ট করে জানাননি। ভ্যান্স বলেন, ইরান ‘খুব একটা সহজ দেশ নয়’। তাই এই সফরটি ঠিক কবে হবে, তা তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন।

শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা ছিল। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বিবিসিকে জানিয়েছে যে অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। কারণ, চুক্তিটি ইতিমধ্যে দূর থেকেই সই হয়ে গেছে।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসবেন।

ইরানের সংবাদমাধ্যমে খামেনির একটি লিখিত বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা এই চুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা ‘আন্তরিক উদ্বেগ ও সদিচ্ছা’ থেকেই এ পর্যন্ত এসেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প এটি বাস্তবায়নের জন্য ‘মরিয়া হয়ে সব ধরনের প্রভাব খাটিয়েছেন’।

বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে খামেনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর ‘ভিন্ন মত’ রয়েছে। ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘সরাসরি আলোচনা’ হতে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা ‘শত্রুর অবস্থান মেনে নিচ্ছেন’।

এই চুক্তির বিষয়ে এবারই প্রথম মুখ খুললেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন তাঁর বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপরই মূলত আঞ্চলিক যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বাবার মৃত্যুর পর মার্চ মাসে দায়িত্ব নেন মোজতবা খামেনি। এর পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালির জাহাজ। ১৫ জুন ২০২৬
ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালির জাহাজ। ১৫ জুন ২০২৬, ছবি: রয়টার্স
 

খামেনির বিবৃতির সরাসরি কোনো জবাব দেননি ট্রাম্প। তবে সামাজিক যোাগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি আশা প্রকাশ করেন, লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহসহ ‘সব ফ্রন্টে’ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তিনি আরও আশা করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ধরে রাখবে।

চুক্তি সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন তাঁদের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দাঁড়িয়েছিল।

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্যরা এই চুক্তির সমালোচনা করার পরই নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করলেন।

এর জবাবে ভ্যান্স বলেছেন, যাঁরা চুক্তির সমালোচনা করছেন, তাঁদের ‘জেগে ওঠা উচিত এবং বাস্তবতা বোঝা উচিত’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে টিকে থাকা আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে এভাবে আক্রমণ করতাম না।’

জি–৭ সম্মেলন শেষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৭ জুন ২০২৬, ফ্রান্স
জি–৭ সম্মেলন শেষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৭ জুন ২০২৬, ফ্রান্স, ছবি: এএফপি
 

ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার ঠিক কারা চুক্তির সমালোচনা করেছেন, তা ভ্যান্স সরাসরি জানাননি। তবে বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন–গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করেছেন।

ভ্যান্স বলেন, ‘তাঁদের প্রতি আমার প্রশ্ন হলো—আপনাদের আসল প্রস্তাবটা কী? আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার সব সমস্যা শুধু মানুষ মেরেই সমাধান করা যায় না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ফাইল ছবি: রয়টার্স
 

যুদ্ধবিরতি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তি ১৪টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর মধ্যে রয়েছে ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাতের অবসান, অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ইরানের ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের (৩০ হাজার কোটি ডলার) একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তির ঘোষণা আসার পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার লেবাননে হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইসরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের এই সংঘাত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের চেয়ে আলাদা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই চুক্তির শর্তগুলো মানতে রাজি হয়নি হিজবুল্লাহ।

বিবিসি