সৌরভ কুশওয়াহা, বয়স মোটে ১৭ বছর। এক কাপড়েই বড় ভাইয়ের সঙ্গে ট্রেনে চেপেছিলেন এই কিশোর। ভারতের মধ্যপ্রদেশ থেকে, গন্তব্য রাজধানী দিল্লি।

গতকাল শনিবার ভোরে দুই ভাই নয়াদিল্লি পৌঁছান। এরপর ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিতে থাকেন। আর থাকেন অপেক্ষায়, কখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।

ভারতের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ জমে উঠছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। দেশটির ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরীক্ষায় নানা অসংগতি এই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সেই ক্ষোভ অপ্রত্যাশিতভাবে রূপ নিয়েছে একটি অপ্রথাগত রাজনৈতিক দলে। সেটি হলো—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। মূলত ঠাট্টা-বিদ্রূপ আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে এ দলটির জন্ম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দীপকের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রথমে তরুণদের এই ক্ষোভকেই আন্দোলনের শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করে। দলটি রাজধানী নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ‘সব তেলাপোকাকে’ একত্র হওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের প্রধান দাবি, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

গত মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তিনি দেশের একদল বেকার তরুণকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা অনেকের কাছেই অপমানজনক ঠেকেছিল।

এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?’

তাঁর এই মন্তব্য অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেটে আলোড়ন তোলে। সেখান থেকেই জন্ম ককরোচ জনতা পার্টির। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে এই নামকরণ।

দীপকের ব্যঙ্গাত্মক এ উদ্যোগটি দ্রুতই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০১৪ সাল থেকে ভারতে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু মজা থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন নিছক মজায় নেই। দীপকে এবং গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

আমি প্রথমে মজা করেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই হয়তো আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।
সৌরভ কুশওয়াহা, মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা এক কিশোর

বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে দীপকে বলেন, ‘মোদি সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা খুবই পরিষ্কার—শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করাতে হবে। তা না হলে আমরা এখান থেকে যাব না।’

শিক্ষার্থী সৌরভ কুশওয়াহাও এই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছেন। মধ্যপ্রদেশের এ শিক্ষার্থী সম্প্রতি ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) পরিচালিত দ্বাদশ শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উত্তরপত্রে ডিজিটাল মূল্যায়নসহ বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়।

কুশওয়াহা এখনো নিশ্চিত নন যে তিনি উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করতে পারবেন কি না। কিন্তু তাঁর আরও বড় ক্ষোভ সেই সরকারের প্রতি, ‘যারা ক্ষমতায় এসেছে জনগণের ভোটে, অথচ এখন সেই জনগণের সমস্যার প্রতিই উদাসীন।’

স্কুল বোর্ডের এই বিতর্কের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্নাতক পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনা এখন প্রায় প্রতিবছরই ঘটে, কিন্তু এর জন্য রাজনৈতিকভাবে কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) লোগো
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) লোগোছবি: রয়টার্স

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দীপকের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রথমে তরুণদের এই ক্ষোভকেই আন্দোলনের শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করেন।

দলটি রাজধানী নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ‘সব তেলাপোকাকে’ একত্র হওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের প্রধান দাবি, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কুশওয়াহা বলেন, ‘আমি প্রথমে মজা করেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই হয়তো আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।’

যদি সেটি ঘটে, তাহলে তা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে ঘটা এ ধরনের প্রথম ঘটনা।

ভারতের জেন–জি প্রজন্মের বেশির ভাগই বড় হয়েছে শুধু মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসন দেখে। সমালোচকদের দাবি, ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ক্রমাগত ভিন্নমত দমন করেছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের অবস্থানেরও অবনতি হয়েছে।

আমি স্কুল শেষ করতে পারিনি। কিন্তু লাখো শিক্ষার্থী আছে, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ওই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করাটা আমাদের দায়িত্ব।
মোহাম্মদ আফতাব, দিল্লির বাসিন্দা এক যুবক

অভিজিৎ দীপকের আগমন

যুক্তরাষ্ট্রের শীতল আবহাওয়ার পরিবেশ থেকে সবে দেশে ফেরা অভিজিতের গায়ে ছিল কালো জিপ-আপ হুডি, মাথায় ক্যাপ।

চারপাশে অসংখ্য ক্যামেরা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। ভিড় ঠেলে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দীপকে জনতার দিকে ইশারা করতেই চারদিক স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লির প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘামে ভিজে একপর্যায়ে তিনি হুডিটিও খুলে ফেলেন।

প্রথম বক্তব্যেই দীপকে আগের রাতের উদ্বেগপূর্ণ বিমানযাত্রার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁর পরিবার আশঙ্কা করছিল, দিল্লিতে নামার পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

‘কিন্তু এই ভয় শুধু আমার মায়ের নয়’—এ কথা বলতেই জনতা সমস্বরে চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘লজ্জা! লজ্জা!’

দীপকে এরপর বলেন, ‘এ দেশের প্রতিটি মা–ই ভয় পান যে তাঁর সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, যদি সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’

গত কয়েক বছরে মোদি সরকারের আমলে বেশ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মী ও ছাত্রনেতাকে বন্দী করা হয়েছে। বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকদের অভিযোগ, এটি দেশকে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদির সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, দেশের আইন ও সংবিধান মেনেই তারা কাজ করেছে।

৩০ বছর বয়সী দীপকে মাত্র দুই বছর আগে জনসংযোগ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। অথচ এখন হঠাৎ করেই নিজেকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে দেখতে পাচ্ছেন। গত মাসে আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর উদ্যোগ যে বিপুল সাড়া পেয়েছে, সেটির প্রতি তিনি একধরনের দায়িত্ববোধ অনুভব করেন।

প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে একসময় দীপকে মাইক্রোফোন অন্য একজনের হাতে তুলে দেন। তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে পানি পান করেন এবং হাতে থাকা বোতলের বাকি অংশ জনতার দিকে ছুড়ে দেন।

ভিড়ের মধ্য থেকে এক তরুণ চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘অভিজিৎ, আমরা তোমাকে ভালোবাসি!’

অনেক বিক্ষোভকারী তেলাপোকার মুখোশ পরে এসেছিলেন। কারও হাতে ছিল গোলাপ, কারও হাতে ফুলের তোড়া। আবার অনেকে বইও সঙ্গে এনেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের দল তাঁদের এমনটাই করতে বলেছিল।

অনেক বিক্ষোভকারী তেলাপোকার মুখোশ পরে এসেছিলেন। কারও হাতে ছিল গোলাপ, কারও হাতে ফুলের তোড়া। আবার অনেকে বইও সঙ্গে এনেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের দল তাঁদের এমনটাই করতে বলেছিল।

পরে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের নীল জার্সি পরে আবার বক্তব্য দেন দীপকে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা মনে করেন ভারতের তরুণেরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেয়, তাঁরা এখানে এসে এই দৃশ্য দেখে যান।’

এরপর আরও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যাঁরা ভাবছেন আমরা শুধু স্লোগান দিয়ে চলে যাব, আমি তাঁদের বলছি—আমরা তেলাপোকা। আর শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব।’

ভারতের নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। এ সময় তাঁর হাতে বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনীর একটি কপি দেখা যায়। ৬ জুন, ২০২৬
ভারতের নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। এ সময় তাঁর হাতে বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনীর একটি কপি দেখা যায়। ৬ জুন, ২০২৬ছবি: রয়টার্স

‘রাস্তায় নামতেই হবে’

অভিজিৎ দীপকেকে ভালোভাবে দেখার জন্য একটি গাছে উঠে বসেন ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আফতাব। দিল্লির উপকণ্ঠের একটি স্যাটেলাইট শহরে তাঁর বসবাস।

আফতাব বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর পক্ষে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য মুদি পণ্য সরবরাহের কাজ করেন। তাঁর কোনো সামাজিক নিরাপত্তা–সুবিধাও নেই।

তেলাপোকার মুখোশ পরে থাকা আফতাব আল–জাজিরাকে বলেন, ‘একদিন কাজ না করলে হয়তো রাতের খাবারের অর্থও জুটবে না। তারপরও আমি এখানে আসতে চেয়েছি।’

আফতাব আরও বলেন, ‘আমি স্কুল শেষ করতে পারিনি। কিন্তু লাখো শিক্ষার্থী আছে, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ওই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করাটা আমাদের দায়িত্ব।’

এদিকে মোদি সরকার এখনো এই বিক্ষোভ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

বিক্ষোভস্থল থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন শিবানি নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর বড় মেয়ে এই বিক্ষোভে ছিল। তবে এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই বলে জানান শিবানি। সরকারি আক্রোশের আশঙ্কায় তিনি নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

শিবানি বলেন, ‘এই ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও উদ্বিগ্ন।’

এরপর তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘একটা সময় তো আসে, যখন মানুষের রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না, তাই না?’

আল–জাজিরা

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নকভি ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছেন। তেহরান পৌঁছানোর পর সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দর মোমেনি তাঁকে স্বাগত জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি জানিয়েছেন, তিনি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের একটি ‘বিশেষ চিঠি’ নিয়ে তেহরান গেছেন। এ চিঠি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনির কাছে পৌঁছে দেবেন তিনি।

তেহরানে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মহসিন নকভি আরও বলেন, এই বিশেষ চিঠির পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের একটি বার্তাও তিনি ইরানি নেতার কাছে হস্তান্তর করবেন।

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই দেশ শর্তযুক্ত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কয়েক দিন পর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হামলা চালাল ইসরায়েল।

লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় তাদের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, একজন ক্যাপ্টেন ও এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের খারদালি–নাবাতিয়েহ সড়কে একটি সামরিক যানে হামলা হলে তাঁরা নিহত হন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, গতকাল শনিবার ‘সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে’ হামলা চালানো হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চলাচলের জন্য ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। তবে ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

লেবাননের সেনাবাহিনী বলেছে, ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত, বারবার চালানো এমন নৃশংস আগ্রাসনের ধারাবাহিকতার লক্ষ্য হলো কোনো সমাধানে পৌঁছানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়া।

হামলার নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তিনি বলেছেন, এ হামলা লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন–রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম একে তাঁর দেশ, দেশের সব জনগণের ওপর হামলা বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও বলেন, এটি একটি জঘন্য অপরাধ।

এক বিবৃতিতে নাওয়াফ সালাম ইসরায়েলি হামলায় নিহত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওয়াসাম সাবরা, ক্যাপ্টেন এলি খুরি ও সেনাসদস্য হুসেইন ঘোজালের শোকসন্তপ্ত পরিবার–সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানান। পাশাপাশি তিনি লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতিও সমবেদনা জানান।

গতকাল লেবাননের সেনাবাহিনী জানায়, তাদের কমান্ডার জেনারেল রুডল্ফ হায়কাল পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

হায়কালের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এই আলোচনায় লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অন্যতম অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

শনিবারের হামলার তীব্র সমালোচনা করেছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তারা বলেছে, এটি একটি জঘন্য অপরাধ। একই সঙ্গে তারা লেবানন সরকারের বিরুদ্ধে ‘ওয়াশিংটনে শত্রুর দাবির কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দেশকে রক্তপাতের মুখে ঠেলে দেওয়ার’ অভিযোগ তুলেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই হামলাকে লেবানন, দেশটির সেনাবাহিনী ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ এবং আগ্রাসনের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে লেবাননের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি চায় না ইসরায়েল।

এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে আঞ্চলিক দেশগুলোও। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, জর্ডান ও কাতার।

আল–জাজিরা

আগেই জানিয়েছিলেন ‘ককরোচ জাতীয় পার্টি’র (সিজেপি) সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা। কথা রাখলেন লাদাখের বিশিষ্ট পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। শনিবার দুপুরে যন্তর মন্তরে গিয়ে তিনি যোগ দেন সিজেপির প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশে।

সেই সমাবেশে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ‘তেলাপোকারা’ দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তুলবে। এ ছাড়া ১৩ জুন আবার যন্তর মন্তরে সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

মহারাষ্ট্রের এনসিপি (শরদ পাওয়ার) নেতা রোহিত পাওয়ারও সিজেপির দাবি–দাওয়া সমর্থন করেছেন। আজ শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, নিট ও সিবিএসই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা নিয়ে সিজেপির আন্দোলনে দেশের যুবসমাজ যেভাবে সাড়া দিয়েছে, তা সরকারের ব্যর্থতা ও সরকারি নীতির প্রতি অনাস্থারই প্রকাশ। এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, যুবসমাজ কতটা হতাশ।

আজ স্থানীয় সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল সিজেপিকে। তার আগে এই আন্দোলনের নেতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা অভিজিৎ দীপকে জানান, শনিবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করলে দেশজুড়ে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ানো হবে।

অভিজিৎ বলেন, সপ্তাহজুড়ে দেশের সর্বত্র যুবসমাজ বিক্ষোভ দেখাবে। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করলে ১৩ জুন শনিবার আরও একবার যন্তর মন্তরে সিজেপির সমাবেশ হবে।

সোনম ওয়াংচুকও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। অভিজিৎ দীপকের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই সমাবেশকে বিক্ষোভ বলা ঠিক হবে না। সরকারের প্রতি এটা একধরনের আবেদন। পদত্যাগের দাবির চেয়েও আমি চাই, সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে যাবতীয় দুর্নীতির দায় নিক।’

ওয়াংচুক বলেন, সরকার এই সমাবেশ করতে দিয়েছে। অনুমতি বাতিল করেনি। এটা ভালো দিক। গণতন্ত্রে ক্ষোভ প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। তাঁর আশা, সরকার ভবিষ্যতেও এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেবে।

সোনম ওয়াংচুক ছয় মাসের বন্দিদশার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ‘দেশবিরোধী’ কাজের অভিযোগে। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান।

সিজেপির সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগের দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন জানিয়ে ৫৯ বছরের এই পরিবেশবিদ বলেছিলেন, ‘এখন যাব না তো কবে যাব? এটাই তো যাওয়ার সময়।’

শনিবার সমাবেশ শেষ হলে ওয়াংচুক ও অভিজিৎ এক সঙ্গে যন্তর মন্তর ছেড়ে চলে যান।

দেশে ফেরার কয়েক দিন আগে অভিজিৎ গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আশঙ্কা করছি, দেশে ফিরলে আমার স্থান হবে তিহার জেলে।’ সমাবেশস্থলে শনিবার সেই কথারই রেশ টেনে অভিজিৎ বলেন, ‘আমার মা ও বোনের আশঙ্কাও ঠিক তেমনই ছিল।’

নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তৃতা করছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এ সময় দলের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কাও উপস্থিত ছিলেন। ৬ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তৃতা করছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। এ সময় দলের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কাও উপস্থিত ছিলেন। ৬ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি,ছবি: এএনআই
 

শনিবার দুপুরে এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে সেই কথা জানিয়ে অভিজিৎ লিখেছেন, ‘বিদেশে যাওয়ার সময় মা যতটা ভয় পেয়েছিলেন, ফেরার সময় তার চেয়ে বেশি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ফিরলেই আমাকে কারাগারে ঢোকানো হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আর কত কাল আমরা এই রকম ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকব।’

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত সম্প্রতি এক মামলার শুনানিতে দেশের তরুণসমাজের একাংশের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একশ্রেণির তরুণ রয়েছেন, যাঁরা কোথাও কিছুই করতে পারেননি। কোনো পেশায় জায়গা করে নিতে পারেননি। কোনো কাজ জোগাড় করতে পারেননি। তাঁদের কেউ সাংবাদিক হয়েছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে গেছেন, কেউ আইন পেশায়, কেউবা তথ্য জানার অধিকার আন্দোলনের কর্মী। প্রধান বিচারপতি এই তরুণদের ‘পরজীবী ও তেলাপোকা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

এ ঘটনার পরই জেন–জি প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত অভিজিৎ দীপকে সেই তেলাপোকার নামেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ককরোচ জাতীয় পার্টি (সিজেপি) গড়ে তোলেন।

নিট বা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এনট্রান্স টেস্ট একমাত্র সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেন। এই পরীক্ষারই প্রশ্নপত্র সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। অকূলপাথারে পড়েছেন লাখ লাখ শিক্ষার্থী।

এরপর শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো দাবি উঠেছে। দাবি তুলেছে ককরোচ বা তেলাপোকা পার্টিও। সিজেপির দাবিতে লাখ লাখ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন, তা সত্ত্বেও শিক্ষামন্ত্রী দায় গ্রহণ করেননি। ককরোচ বা তেলাপোকারা তাই ঠিক করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে বেরিয়ে পথে নেমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে শামিল হবে। আজ সেই আন্দোলনের যাত্রা শুরু হলো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে গত মে মাসে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আপাতত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই তা ভঙ্গ করে। এর মধ্যে নৌ অবরোধের কারণে ইরানের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস সংকুচিত হয়েছে।

১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে যে নৌ অবরোধ শুরু করে ওয়াশিংটন, তা ইরানকে শান্তিচুক্তির শর্ত মেনে নিতে চাপ প্রয়োগের কৌশলের অংশ। তেহরান এ পদক্ষেপকে অবৈধ মনে করে। নিজেদের বন্দরের আশপাশে জাহাজ জব্দ করাকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর অধিকাংশ দেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। পারস্য উপসাগরকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই সাধারণত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ পরিবাহিত হয়।

এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

তবে সেই সময় ইরান নিজেদের তেল রপ্তানি অনেকটাই সচল রাখতে পেরেছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় মার্চ ও এপ্রিলের অংশজুড়ে ইরানের রপ্তানির পালে হাওয়া লেগেছিল। একই সঙ্গে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইরানের আয়ও বেড়ে যায়।

কিন্তু মার্কিন নৌ অবরোধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়। সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য বলছে, ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধ এখন ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। ফলে দেশটি কত দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

রপ্তানি কতটা কমেছে

বাণিজ্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে ৩ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে। এটা মে মাসের তথ্য। তুলনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি অবরোধ শুরুর আগের ৪০ দিনের তথ্য ব্যবহার করেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি কমে গেলেও ইরান নিজেদের তেল রপ্তানি করতে পারছিল। ফলে মার্চ ও এপ্রিলের বড় অংশে তাদের রপ্তানি ও আয় উভয়ই ভালো অবস্থানে ছিল।

ইরানের বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম সাধারণত ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি ছিল, কখনো কখনো তা ১০০ ডলারও ছাড়িয়ে যায়।

ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ধরে হিসাব করলে, দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল রপ্তানি থেকে মে মাসে ইরানের আয় দাঁড়ায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, পুরো মাসে প্রায় ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।

অথচ মার্চ মাসে দৈনিক গড়ে ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল রপ্তানি করে দেশটি প্রতিদিন আনুমানিক ১৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলার আয় করেছে। পুরো মাসে সেই আয় ছিল প্রায় ৫১৩ কোটি ডলার।

এপ্রিল মাসে দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ১৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। এতে দৈনিক আয় হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৬ লাখ ডলার এবং পুরো মাসে প্রায় ৩৬২ কোটি ডলার।

জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রকাশনা লয়েডস লিস্টের হিসাবে, মার্চের তুলনায় মে মাসে ইরানের তেল থেকে আয় প্রায় ৮৪ শতাংশ কমে গেছে। মার্চের সমপরিমাণ আয় ধরে হিসাব করলে, এপ্রিল ও মে—এই দুই মাসে দেশটির সম্ভাব্য আয় কমেছে প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার।

তবে কেপলার জানিয়েছে, তাদের তথ্য ইরান থেকে সরাসরি বের হওয়া নতুন তেলের চালানের ভিত্তিতে করা। মালয়েশিয়ার উপকূলের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে কিছু চালান ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে; এই হিসাব সব সময় পরিসংখ্যানে আসে না।

উৎপাদন কি অব্যাহত আছে

ইরান এখনো তেল উৎপাদন করছে। তবে বিক্রি না হওয়া তেল সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটি।

জ্বালানিনীতি গবেষক ও পরামর্শক মার্ক আয়ুব আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান কৌশলগতভাবে অবশিষ্ট সংরক্ষণ-ক্ষমতা ব্যবহার করছে। তথ্য বলছে, অবরোধ কার্যকর হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত চাপ তৈরি হবে তখনই, যখন এই সংরক্ষণ সক্ষমতা ফুরিয়ে আসবে।’

এই মজুতের বড় অংশই সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে রাখা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট ভাসমান মজুত হিসেবে সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে আটকে আছে; মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করতে পারছে না।

কীভাবে এখনো রপ্তানি হচ্ছে

মে মাসেও প্রতিদিন ইরানের প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে রপ্তানি হয়েছে।

মার্ক আয়ুব বলেন, অবরোধ শুরু হওয়ার পরও কিছু জাহাজ সামুদ্রিক সীমারেখা অতিক্রম করতে পেরেছে। ইরান এই অবরোধ পাশ কাটানোর উপায় বের করেছে বলেই কম পরিমাণে হলেও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে।

আয়ুবের মতে, অবরোধের তাৎক্ষণিক প্রভাব উৎপাদন বন্ধ করা নয়; বরং তেল বিক্রির অর্থপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা। বিশেষ করে চীনের মতো বড় ক্রেতার ক্ষেত্রে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি কষ্টদায়ক হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রভাব অতটা না–ও বোঝা যেতে পারে।

বাস্তবতা হলো, ইরান ও চীন অনেক দিন ধরে হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালির মতো সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থলভিত্তিক বাণিজ্যপথ গড়ে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রেলপথ ইরানের তেল রপ্তানির কার্যকর বিকল্প হবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম। চীন-ইরান রেলপথে মূলত উৎপাদিত পণ্য ও ভোগ্যপণ্য পরিবাহিত হয়, অপরিশোধিত তেল নয়।

এ ছাড়া সরবরাহ-সংক্রান্ত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে। ইরানের অধিকাংশ তেলক্ষেত্র দেশটির দক্ষিণে, অথচ চীনের যেসব শোধনাগারে ইরানের তেল প্রক্রিয়াজাত হয়, তার বেশির ভাগই পূর্ব উপকূলে। এসব শোধনাগার মধ্য এশিয়া হয়ে যাওয়া রেলপথ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।

রেলপথে সাধারণ তেলবাহী চালানে ৬০ থেকে ৭০ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়। ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ধরে ৭০ হাজার ব্যারেলের চালানের মূল্য প্রায় ৬৩ লাখ ডলার। অন্যদিকে প্রচলিত তেলবাহী ট্যাংকারে ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি এবং ভিএলসিসি জাহাজে ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বহন করা যায়। অর্থাৎ একটি বড় ট্যাংকারের সমপরিমাণ তেল পরিবহনের জন্য কয়েক ডজন ট্রেন চালানো প্রয়োজন হবে।

ইরান কি এই ধাক্কা সামলাতে পারবে

বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াইয়ে শেষমেশ কোন পক্ষ কত দিন অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।

তেল থেকে আয় কমে গেলে ধীরে ধীরে ইরানের সামরিক ব্যয় ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি পরিচালনার সক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। তবে এর খরচ শুধু ইরানকেই বহন করতে হচ্ছে না।

হরমুজ প্রণালিতে চলমান অচলাবস্থার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর স্বাভাবিক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যার আঁচ মার্কিন অর্থনীতিতেও লাগছে।

মার্ক আয়ুবের ভাষায়, এখন ইরানে চাপ অনুভূত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে যুক্তরাষ্ট্র কি দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তৃত পরিসরে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পারবে।

আয়ুব আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত যে ধরনের চুক্তিই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন একটাই—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। হয় ইরান কোনো না কোনোভাবে সেখানে প্রভাব বজায় রাখবে, নয়তো এই সংঘাত আরও কয়েক মাস চলতে পারে।’

আল–জাজিরা

বাংলাদেশিসহ যেসব বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতের নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ কথা বলেছেন।

ব্রিফিং চলাকালে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের এক সংবাদকর্মী বাংলাদেশ–সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে ঢাকা। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী, তা জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে জয়সোয়াল বলেন, ভারতে যদি বাংলাদেশিসহ কোনো বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেশে আইন রয়েছে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, এসব মানুষকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা চালু আছে। সে অনুযায়ী প্রথমে মামলাগুলো বাংলাদেশি পক্ষের কাছে পাঠানো হয়, যেন তারা ওই ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে। যাচাই–বাছাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

জয়সোয়ালের মতে, এ ধরনের অনেক অনুরোধ এখনো বাংলাদেশি পক্ষের কাছে ঝুলে আছে। এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার মধ্য দিয়ে ভারতে অবৈধভাবে থাকা মানুষদের ফেরত পাঠানোর কাজটি সহজ ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

আজভ সাগর ও রুশ অধিকৃত উপকূলীয় এলাকায় পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বলছে, জাহাজগুলোতে অবৈধ পণ্য বহন করা হচ্ছিল। ইউক্রেনের ড্রোন বাহিনীর কমান্ডার জানিয়েছেন, জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় শস্য ‘চুরির’ পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ও জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার একটি বড় অর্থনৈতিক ফোরামে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বক্তৃতা দেওয়ার প্রস্তুতির সময় এই হামলা চালানো হয়। এই হামলার এক দিন আগে যুদ্ধ বন্ধে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

এদিকে ইউক্রেন নিশ্চিত করেছে যে শুক্রবার রোমানিয়া উপকূলের কাছে তাদের একটি নৌ-ড্রোন বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে এই বিস্ফোরণে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

জেলেনস্কি চিঠিতে তাঁর শান্তি প্রস্তাবের পাশাপাশি লিখেছেন, রাশিয়ার নাগরিকেরা ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানিসংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এই যুদ্ধ চার বছর ধরে চলছে।

রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতা কমাতে ইউক্রেন বারবার দেশটির ভেতরের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর এক দিন আগেই শহরটির উপকণ্ঠে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল কিয়েভ।

আজভ সাগরে দুটি জাহাজে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তাদের পাঁচ নাগরিক নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে আজারবাইজান এই হামলার জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করেনি। দেশটি জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজগুলো আজারবাইজানের নয়।

এর আগে ইউক্রেনের ড্রোন কমান্ডার রবার্ট ব্রভদি জানান, মারিউপোল ও বেরদিয়ানস্ক বন্দরে গত রাতে পাঁচটি ‘অবৈধ’ জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। রুশ নিয়ন্ত্রিত অধিকৃত উপকূলীয় এলাকায় এসব জাহাজ অবস্থান করছিল।

ব্রভদি জানান, আক্রান্ত জাহাজের তালিকায় পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার ছিল। গোপনে ইউক্রেনীয় শস্য চুরির উদ্দেশ্যে জাহাজগুলোর নাম মুছে ফেলা হয়েছিল এবং রাডার বন্ধ রাখা হয়েছিল। আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্ত দুটি জাহাজের নাম ‘নাস্ত্রা’ ও ‘সারকন’।

বিবিসি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। গৃহীত শোকপ্রস্তাবের অনুলিপি তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। এ বিষয়ে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রধান সচিব সৌমেন্দ্র নাথ দাস স্বাক্ষরিত এক চিঠি কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বিধানসভার অধিবেশনে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ওই অধিবেশনের কার্যবিবরণীর সংশ্লিষ্ট অংশের অনুলিপি চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।

চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়, শোকপ্রস্তাবসংবলিত ওই অনুলিপি যেন বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে, অধিবেশনে স্পিকার খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও অবদান স্মরণ করেন। এরপর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন বিধানসভার সদস্যরা।

প্রায় চার মাস পর, ২ জুন ওই শোকপ্রস্তাবের অনুলিপি পৌঁছে দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়।

শোকপ্রস্তাবে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

এছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে তার অবদান তুলে ধরা হয়। শোকপ্রস্তাবে তাকে দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন রাজনীতির এক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।

সিউল

ওয়াশিংটন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি হতে হলে একটি চেনা বাধা টপকাতে হবে। আর সেই বাধা হলো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সম্ভাব্য আলোচনায় এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অস্থির মিত্রতাকে আরও একবার পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবার যে চাপের মুখে পড়েছেন, তা আগের মতো নয়। নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আসন্ন নির্বাচনের আগে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর সামরিক অভিযান সফল হয়েছে।

গত সোমবার নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহকে উৎখাত করতে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে বোমা হামলার হুমকি দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান জানায়, এই সংঘাত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা বন্ধ রাখবে। চুক্তি খুব কাছাকাছি—ট্রাম্পের এমন দাবির পর আলোচনা ভেস্তে গেলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা অনেক বেশি কথা বলে ফেলেছি।’

এই সংকট শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে এক উত্তপ্ত ফোনালাপে গড়ায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি এসব কী ছাইপাঁশ করছেন?’ ট্রাম্পের মন্তব্যের সূত্র দিয়ে আরেক ব্যক্তি জানান, তিনি বলেছেন, ‘আমি না থাকলে তুমি কারাগারে থাকতে।’

তবে ফোনালাপের এই বর্ণনা নিয়ে ভিন্নমত আছে। ইসরায়েলের গণমাধ্যম চ্যানেল ১২ বলেছে, দুই নেতার মধ্যে মূলত ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল। ওই চ্যানেলের প্রধান রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত সেগাল নেতানিয়াহুর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের মনে হয়েছিল নেতানিয়াহু পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন ট্রাম্প পুরোপুরি একটি যুদ্ধবিরতির কথা বলছেন।’

ট্রাম্প পরে এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আজ ছোটখাটো একটা সমস্যা হয়েছিল। তবে আপনারা হয়তো আগেই খেয়াল করেছেন যে আমি খুব দ্রুতই বিষয়টি সামলে নিয়েছি।’

১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন প্রেসিডেন্টের সময়কাল দেখেছেন নেতানিয়াহু। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল আলোচিত। ১৯৯৬ সালে দুজনের প্রথম বৈঠকের পর বিল ক্লিনটন নাকি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে আসলে পরাশক্তিটা কে?’

তবে নেতানিয়াহুর জন্য সময়টি এখন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। গত সোমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ ভেঙে দেওয়ার বিল প্রথম চেষ্টাতেই ১০৬-০ ভোটে পাস হয়েছে। এর ফলে আগামী শরতে দেশটিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইরানি নেতৃত্বের ওপর সফল হামলার পর জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন বাড়লেও গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা এখন পড়তির দিকে।

তবে নেতানিয়াহুর জন্য সময়টি এখন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। গত সোমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ ভেঙে দেওয়ার বিল প্রথম চেষ্টাতেই ১০৬-০ ভোটে পাস হয়েছে। এর ফলে আগামী শরতে দেশটিতে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইরানি নেতৃত্বের ওপর সফল হামলার পর জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন বাড়লেও গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাঁর জনপ্রিয়তা এখন পড়তির দিকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইরান-বিষয়ক বিশেষ কৌশলগত সেলের সাবেক প্রধান ইলান গোল্ডেনবার্গ বলেন, ‘নির্বাচনে ভোটারদের সামনে বলার মতো জোরালো কোনো সাফল্যের গল্প তাঁর হাতে নেই। তাই তাঁকে হয় লেবাননে যেকোনোভাবে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে অথবা অন্তত এই গল্পটা বলতে হবে যে তিনি এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।’ গোল্ডেনবার্গ বর্তমানে লবিং ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘জে স্ট্রিট’-এর প্রধান নীতি কর্মকর্তা। এই সংস্থা নিজেদের ‘ইসরায়েলের পক্ষে ও শান্তির পক্ষে’ বলে পরিচয় দেয়।

গোল্ডেনবার্গ বলেন, ‘নেতানিয়াহুর এখন এমন একটি গল্পের প্রয়োজন যাতে তিনি বলতে পারেন—আমি এখনো “চূড়ান্ত বিজয়ের” লক্ষ্যেই লড়ছি। “সব শেষ হয়ে গেছে এবং ইসরায়েলের ওপর আসা হুমকি সরাতে ব্যর্থ হয়েছি”—এমনটা বলার চেয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার গল্প শোনানো তাঁর জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক।’

প্রতারণা ও ঘুষের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলার শুনানি চলতি সপ্তাহেই আবার শুরু হয়েছে। দেশ হুমকির মুখে আছে—এমন অজুহাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি বরাবরই এই বিচারপ্রক্রিয়া পিছিয়ে দিয়েছেন। এই বিলম্বের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নটি সম্ভবত এড়িয়ে গেছেন।

নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানে একসঙ্গে হামলা চালানোর জন্য রাজি করাতে সফল হয়েছিলেন। তবে ট্রাম্পের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণই বেশি অগ্রাধিকার পেতে পারে।

জনসমক্ষে ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই বলে দাবি করলেও নিজের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তিনি নিয়মিত অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে আসছিলেন। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সরব তিনি। অথচ মেমোরিয়াল ডের ছুটির দিনে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের গড় দাম ছিল করোনা মহামারির পর সর্বোচ্চ।

[caption id="attachment_275646" align="alignnone" width="848"] লেবাননের টায়ার উপকণ্ঠে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ১ জুন ২০২৬ ছবি: এএফপি[/caption]

নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপের তথ্য ফাঁস করার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তারা বিশ্বকে দেখাতে চায় যে ইসরায়েলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে। ‘নেতানিয়াহুর ইশারাতেই ট্রাম্প চলছেন’—এমন অপবাদ ঘোচাতে চায় তারা।

ফোনালাপের পর নেতানিয়াহু জানান, হিজবুল্লাহ আগে হামলা না করলে বৈরুতে অভিযান চালাবে না ইসরায়েল। কিন্তু সংঘাত কমানোর বিষয়ে দুই নেতা একমত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় কমপক্ষে আটজন নিহত হয়েছেন।

সমীকরণের অপর পিঠে রয়েছে ইরান। তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এখন আটকে দিয়েছে। তাদের বাজি হলো তেলসংকটের এই অর্থনৈতিক চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে। তবে মার্কিন অবরোধ আবার ইরানের অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিয়েছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে তাদের তেলশিল্পের ভবিষ্যৎ এবং খোদ ইরান সরকারের আয়ের উৎস এখন হুমকির মুখে।

নেতানিয়াহুর দর-কষাকষির প্রধান হাতিয়ার হলো লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান। তবে ইরানের কাছে এটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে তেহরানের জব্দ করা অর্থ ছেড়ে দেওয়ার মতো সুবিধা দেওয়া হতে পারে। তবে ট্রাম্প নিজে এ পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক। কারণ, ওবামা আমলে পারমাণবিক চুক্তির আওতায় জব্দ করা অর্থ ফেরত দেওয়ায় তাঁর কড়া সমালোচনা করেছিলেন খোদ ট্রাম্প।

একই সঙ্গে ট্রাম্প বলে বলেছেন, তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি আছেন। এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাকে আরও কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট হতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যা প্রয়োজন, আমরা তা আদায় করে ছাড়ব।’

দ্য গার্ডিয়ান