ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এই শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

বিষয়টি হলো, উপসাগরীয় এলাকায় একাধিক দেশের ডেটা অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম অনেকটাই বিনষ্ট করে দিয়েছে তেহরান। ডেটা সেন্টারের প্রাত্যহিক কাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

এক দিকে তেলের দাম বাড়তি, অপর দিকে তার জোগানও কম—এই দুই চাপে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হচ্ছে এআই–শিল্পকে। ডেটা সেন্টার চালানোর ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় কিছু সেন্টার হয় বন্ধ করে দিতে হয়েছে, না হয় এসব কেন্দ্রের কাজকর্মের রাশ টানতে হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর চিপের জন্য অতি প্রয়োজনীয় হিলিয়াম–অ্যালুমিনিয়াম, ব্রোমিনসহ একাধিক কাঁচামালের সরবরাহ সংকট। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বজুড়ে এর অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারী। কিন্তু গত এক মাসে হরমুজ প্রণালি একরকম বন্ধ থাকায় সরবরাহব্যবস্থা যেভাবে ধাক্কা খেয়েছে, তাতে আগামী বেশ কয়েক মাস এআই চিপ তৈরির পরিকল্পনা নতুন করে করতে হচ্ছে।

হিলিয়ামের ব্যবহার ও উৎপাদন

চিপ উৎপাদনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, যেমন শীতলীকরণ, ছিদ্র শনাক্তকরণ ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিখুঁত করতে হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরুর পর থেকে এই গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম উৎপাদিত হয়। এর উৎপাদন ভৌগোলিকভাবে খুবই সীমিত কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই কাতার থেকে আসে।

সরবরাহব্যবস্থা–বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিডাল ওয়েভ সলিউশনসের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ক্যামেরন জনসন রয়টার্সকে বলেন, ‘হিলিয়ামের ঘাটতি নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়।’ চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত শিল্প খাতের অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক আয়োজন ‘সেমিকন চায়না’ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

ক্যামেরন আরও বলেন, আপাতত উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া কোম্পানিগুলোর উপায় নেই। অনেকেই আশা করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

জনসনের ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দেখা দিলে তাঁর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে অটোমোবাইল—বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর উপাদান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভিএটির চীন শাখার বিক্রয়প্রধান জেরি ঝ্যাং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হিলিয়ামের সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য কোম্পানির উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তিনি জানান, পরিবহন বিলম্বে পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।

জেরি আরও বলেন, বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও সরবরাহ আনার উদ্যোগ রয়েছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, এই বিঘ্ন কেবল হিলিয়ামেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক বিস্তৃত সরবরাহের শৃঙ্খলে তা ছড়িয়ে পড়ছে। মাইক্রোনিকের এমআরএসআই ইউনিটের ঝৌ লিমিন জানান, ইসরায়েল থেকে সংগ্রহ করা কিছু কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিয়েছে। ফলে সরবরাহের সময় বাড়ছে। শেষমেশ তার প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর।

ঝৌ বলেন, স্বল্প মেয়াদে যে এআই খাতে প্রভাব পড়েছে, তা পরিষ্কার। এদিকে ফরাসি শিল্প গ্যাস কোম্পানি এয়ার লিকুইডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা গত বুধবার স্বল্প মেয়াদে হিলিয়ামের ঘাটতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

কোন খাতে হিলিয়ামের কত ব্যবহার

হিলিয়ামের খাতভিত্তিক ব্যবহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ—প্রায় ২২ শতাংশ ব্যয় হয় বিশ্লেষণাত্মক, প্রকৌশল, গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক কাজে। অর্থাৎ এটি কেবল সাধারণ গ্যাস নয়; বরং আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তির জ্বালানি।

এরপরেই রয়েছে ফাইবার অপটিকস ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, যেখানে ব্যবহৃত হয় ১৭ শতাংশ। আরও ১৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গ্যাস উত্তোলনের কাজে। স্বাস্থ্য খাতেও হিলিয়ামের গুরুত্ব কম নয়। এমআরআই স্ক্যান পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় মোট সরবরাহের ১৫ শতাংশ। এরপর মহাকাশ খাত। এই খাতে ব্যবহৃত হয় মোট হিলিয়ামের ৯ শতাংশ, বিশেষ করে রকেট প্রযুক্তিতে।

শিল্পকারখানায়ও এর ব্যবহার আছে, যদিও তুলনামূলকভাবে কম। ওয়েল্ডিংয়ে ব্যবহৃত হয় ৮ শতাংশ হিলিয়াম, ডাইভিং ও ছিদ্র শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয় ৫ শতাংশ করে। বাকি ২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় অন্যান্য খাতে।

চট্টগ্রাম

শ্রমিক অধিকার ও শ্রম খাতের সংস্কারের দাবিতে শ্রম অধ্যাদেশ (২০২৫) দ্রুত আইনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ)। আজ শনিবার সকালে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে জাতীয় সংসদ ও সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানানো হয়।

টাফের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতারের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। এতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আশরাফ, টাফের যুগ্ম সম্পাদক আলীফ দেওয়ান, হকার সমিতির সভাপতি বাচ্চু ভূঁইয়া, রিকশা-ভ্যানচালক শ্রমিক সংহতির বেলাল হোসাইন, নারী সংহতির অপরাজিতা দেব, আউটসোর্সিং শ্রমিক কর্মচারী পরিষদের নুরুল হকসহ আরও অনেকে। সভা পরিচালনা করেন টাফের নেতা অঞ্জন দাস।

বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে শ্রম অধ্যাদেশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে দেশের বৃহৎ শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনমান, অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের আলোচনার ভিত্তিতে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়।

তাঁরা বলেন, অধ্যাদেশটি এখন সংসদে আইনে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি পাস না হলে বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঈদের পরবর্তী সংসদ অধিবেশনেই দ্রুত এটি আইন হিসেবে পাস করার দাবি জানান বক্তারা।

নেতারা জানান, সংশোধিত অধ্যাদেশে মোট ১২৫টি ধারা পরিবর্তন ও সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত সহজ করা, গৃহশ্রমিকদের স্বীকৃতি, মাতৃত্বকালীন ও উৎসব ছুটি বৃদ্ধি, তিন বছর পরপর ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তাঁদের মতে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিবেশে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং শ্রম খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি কমবে। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, কোনো অজুহাতে এই অধ্যাদেশ আইনে রূপ নিতে ব্যর্থ হলে তা হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে তাসলিমা আখতার বলেন, ‘শ্রমিক অধিকার ও শ্রম খাতের সুরক্ষায় শ্রম অধ্যাদেশ (২০২৫) দ্রুত আইনে পরিণত করা জরুরি। তাই সরকারে কাছে এটা আইনে পরিণত করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’

 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এতে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধের মধ্যে তেহরান এটিকে কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায়, এ নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ২ হাজার জাহাজ আটকা পড়েছে। সংকীর্ণ এই নৌপথটির উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান।

বৃহস্পতিবার ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ তেল পরিবহন পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের জন্য আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট।

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে ইরানের কাছে দেনদরবার করছে। কারণ, উপসাগরীয় বেশির ভাগ দেশ থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এটাই একমাত্র সমুদ্রপথ। যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে ইরান পাঁচটি দাবির একটি হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছে।

ইরানি পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফারস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এ–সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইনি দল এটি চূড়ান্ত করবে।

এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে ফি আদায় করতে হবে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটি একেবারেই স্বাভাবিক। অন্য করিডরগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দেশের মধ্য দিয়ে পণ্য গেলে শুল্ক দিতে হয়। হরমুজ প্রণালিও একটি করিডর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। তাই জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলো আমাদের শুল্ক দেবে—এটাই স্বাভাবিক।’

তবে অভ্যন্তরীণ এ আইনি কাঠামোটি এখনো চূড়ান্ত না হলেও, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে। গত বুধবার জাহাজ চলাচল বিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্ট এমন খবর প্রকাশ করেছে।

তাহলে ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা কী? এটি কীভাবে কাজ করে? এটি কি বৈধ?

হরমুজ প্রণালির ম্যাপের ইলাস্ট্রেশন
হরমুজ প্রণালির ম্যাপের ইলাস্ট্রেশন, ছবি: রয়টার্স

ইরান কেন টোল আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে

ইরানের জলসীমা হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর দেশটির উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী জাহাজগুলোর চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি বিতরণ সীমিত করতে ও শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে ইরানের কাছে দেনদরবার করছে। কারণ, উপসাগরীয় বেশির ভাগ দেশ থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এটাই একমাত্র সমুদ্রপথ। যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে ইরান পাঁচটি দাবির একটি হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছে।

ইরান জাতিসংঘের সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদে স্বাক্ষরকারী হলেও দেশটির পার্লামেন্টে এটি অনুমোদন করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে ইরান যুক্তি দেখাতে পারে যে তারা এই আন্তর্জাতিক বিধির আওতায় বাধ্য নয়
অপূর্ব মেহতা, ভারতের আইনি পরামর্শক সংস্থা এএনবি লিগ্যালের অংশীদার

ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য আলায়েদ্দিন বোরৌজারদি গত রোববার যুক্তরাজ্যভিত্তিক পার্সি ভাষার স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনালকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পেরোতে কিছু কিছু জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার ফি নিচ্ছে ইরান।

বোরৌজারদি বলেন, ‘এখন যেহেতু যুদ্ধের একটা খরচ আছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এটা করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ট্রানজিট ফি নিতে হবে।’

হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে কত জাহাজ অপেক্ষায় আছে

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিশেষায়িত সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ আল–জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য প্রায় ২ হাজার জাহাজ অপেক্ষা করছে। জাহাজগুলো প্রণালির উভয় পাশে অবস্থান করছে।

১৫ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত এক সপ্তাহে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) চালু থাকা মাত্র ১৬টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানকারী সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড আলাদা করে নিশ্চিত করেছে, গত ১৩ মার্চ রাতে ও তার পরদিন ভোরে চারটি কার্গো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে একটি পাকিস্তানি জাহাজও ছিল।

এ ছাড়া এআইএস ব্যবস্থা বন্ধ রাখা অবস্থায় প্রণালিতে অবস্থানকারী আটটি জাহাজ (ডার্ক শিপ) শনাক্ত করতে পেরেছে উইন্ডওয়ার্ড।

ডার্ক শিপগুলোর (এআইএস বন্ধ রাখা জাহাজ) মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি জাহাজও রয়েছে। ১৬ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরের কাছে জাহাজটিকে দেখা গিয়েছিল। এটি তেল ট্যাঙ্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এরপর এআইএস বন্ধ করে চলাচল করতে শুরু করে।

টোল নেওয়ার প্রক্রিয়া কী

ইরানি পার্লামেন্ট এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে টোল আরোপের আইন পাস না করলেও, গত দুই সপ্তাহে ২৬টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেওয়ার জন্য আইআরজিসির ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থার পূর্ব অনুমোদিত পথ অনুসরণ করেছে। গত বুধবার জাহাজ চলাচল বিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্ট এমন খবর প্রকাশ করেছে। এই জাহাজগুলোতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) চালু ছিল না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, নতুন ব্যবস্থার আওতায় হরমুজ প্রণালি পার হতে জাহাজগুলোকে আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের সব তথ্য জমা দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—নথিপত্র, আইএমওর নম্বর, পরিবহনকৃত পণ্য, ক্রু সদস্যদের নাম এবং জাহাজের চূড়ান্ত গন্তব্য।

মধ্যস্থতাকারীরা এসব তথ্য আইআরজিসির নৌ কমান্ডে জমা দেন। এ কমান্ডটি তথ্যগুলোর সত্যতা যাচাই করে। যদি কোনো জাহাজ যাচাইবাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে আইআরজিসি সেটিকে একটি ক্লিয়ারেন্স কোড দেয় এবং প্রণালি পারাপারের জন্য নির্ধারিত রুট সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়।

জাহাজ যখন প্রণালিতে প্রবেশ করে, তখন আইআরজিসি কমান্ডাররা ভিএইচএফ রেডিওর মাধ্যমে জাহাজের কাছে ক্লিয়ারেন্স কোড চান। জাহাজ থেকে তখন কোডটি বলা হয়। যদি কোডটি অনুমোদিত হয়, তখন ইরানি একটি নৌযান জাহাজের কাছে এসে সেই জাহাজটিকে লারাক দ্বীপের আশপাশ দিয়ে ইরানের জলসীমা পার হতে সহযোগিতা করে।

যদি কোনো জাহাজ আইআরজিসি নৌবাহিনীর স্ক্রিনিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়, তাহলে তাদের এই জলপথ দিয়ে পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয় না।

কারা টোল ফি দিচ্ছে

ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খোলা।

গত মঙ্গলবার ইরান আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও–এর ১৭৬ সদস্যকে পাঠানো একটি চিঠিতে বলেছে, যেসব জাহাজ ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসনে অংশ নেয় না এবং ঘোষিত নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়মাবলি পুরোপুরি মেনে চলে, তারা ইরানি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচলের সুবিধা পেতে পারে।

এখন পর্যন্ত আলোচনার পর মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি পারাপারের অনুমতি পেয়েছে। ইরানের ভাষায় এসব দেশ তাদের বন্ধু দেশ।

লয়েডস লিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালি পার হতে কমপক্ষে দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ইউয়ানে ফি দিয়েছে। কত অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভারত সরকার বলেছে, ভারতীয় জাহাজগুলো নিরাপদে প্রণালি পারাপারের জন্য ইরানকে কোনো অর্থ দেয়নি।

ভারতের আইনি পরামর্শক সংস্থা এএনবি লিগ্যালের অংশীদার অপূর্ব মেহতা আল–জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালি পারাপারের অনুমতি কেবল নির্দিষ্ট বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর জন্য দেওয়া হলে, তা বৈষম্যমূলক হবে।

অপূর্ব বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোন জাহাজগুলোকে টোল দিতে হবে ও সেই অর্থ কোন মুদ্রায় দেওয়া হবে, তা এখন স্পষ্ট নয়।’

হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ট্যাংকার
হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ট্যাংকার, ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি
 

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ থেকে টোল নেওয়া কি বৈধ

জাতিসংঘের সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদ (ইউএনসিএলওএস)-এর ধারা ৩৮ অনুযায়ী, সব জাহাজ ও উড়োজাহাজ ‘ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার’ ভোগ করে, যা কোনো দেশ স্থগিত করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদের ধারা ১৭ অনুযায়ী, প্রত্যেকটি বিদেশি জাহাজের কোনো দেশের জলসীমা দিয়ে নির্বিঘ্নে পারাপারের অধিকার রয়েছে।

ধারা ১৯ অনুযায়ী পারাপার তখনই নির্দোষ ধরা হয়, যদি তা উপকূলীয় দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর না হয়।

ভারতের আইনি পরামর্শক সংস্থা এএনবি লিগ্যালের অংশীদার অপূর্ব মেহতা বলেন, উপকূলীয় দেশ যদি কোনো পারাপারকে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে তারা নির্দিষ্ট এলাকায় বিদেশি জাহাজের নির্দোষ পারাপার স্থগিত করার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

অপূর্ব আরও বলেছেন, ইরান ইউএনসিএলওএস–এর স্বাক্ষরকারী হলেও দেশটির পার্লামেন্টে এটি অনুমোদন করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে ইরান যুক্তি দেখাতে পারে, তারা এই আন্তর্জাতিক বিধির আওতায় বাধ্য নয়।

সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং লন্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাসন চুয়াহ বলেন, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানটি ২১ নটিক্যাল মাইল (৩৯ কিমি) প্রশস্ত। আর ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের উপকূল থেকে সর্বাধিক ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত জলসীমা দাবি করতে পারে।

চুয়াহ আরও বলেন, পুরো প্রণালিটি ইরান ও ওমানের জলসীমার মধ্যে পড়েছে। তাঁর মতে, ইরান এই এলাকার ওপর সর্বভৌমত্ব দাবি করছে। উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইলের বাইরের জলসীমায় নিজেদের মালিকানা দাবি করার অধিকার ইরানের নেই।

চুয়াহ বলেন, ‘সুতরাং আপনার জাহাজ যদি ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে, তাহলে ইরান টোল নিতে পারবে না। কিন্তু ইরান যেকোনো জাহাজকে রকেট, মাইন বা ড্রোন দিয়ে আঘাত করার অধিকার রাখে, সেটা ওমান বা ইরানের পাশে হোক।’

এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এমন পরিস্থিতিতে কোনো জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে চাইলে সেটিকে হয়তো ইরানের পাশ দিয়ে চলাচলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, টোল দিয়ে নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে হবে।

এটি যুদ্ধকালীন সময়ে টোল আরোপের প্রথম ঘটনা নয়।

২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, ইয়েমেনের হুতিরা তাদের উপকূলের কাছে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ফি নিচ্ছিল।

সেই সময় ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা করেছিল। হুতিরা দাবি করেছিল, তারা গাজায় যুদ্ধের প্রতিবাদে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বা ইসরায়েলগামী জাহাজগুলোকে নিশানা করেছে।

দেশীয় বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে আগামী ১ এপ্রিল থেকে পেট্রোল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া।

দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক শুক্রবার (২৭ মার্চ) এক সরকারি বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, ফেডারেল অ্যান্টিমনোপলি সার্ভিস, সেন্ট পিটার্সবার্গ এক্সচেঞ্জ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে নোভাক বলেন, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশে রাশিয়ার জ্বালানির চাহিদা এখনও শক্তিশালী রয়েছে, যা দেশের জন্য ইতিবাচক দিক।

এদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেল শোধনের পরিমাণ ২০২৫ সালের মার্চের পর্যায়ে স্থিতিশীল রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত পেট্রোল ও ডিজেলের মজুদ রয়েছে এবং রিফাইনারিগুলোও উচ্চ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী-তে অস্থিতিশীলতার কারণে তেল পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

গত এক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিমান চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

 

ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে কমে গেছে জ্বালানি তেলের দাম।

শুক্রবার (২৭ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদিন গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) রাত আড়াইটায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৩ দশমিক ০৭ ডলারে। অন্যদিকে, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ব্যারেল প্রতি ১০৬ দশমিক ১২ ডলার।

এর আগে, বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) তেলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। শুক্রবার দাম কিছুটা কমলেও তা আগের দিনের সেই বড় উল্লম্ফনকে পুরোপুরি কমিয়ে আনতে পারেনি। ইরান যুদ্ধ ধারণার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে- এমন ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই শুক্রবার (২৭ মার্চ) তেলের বাজারে এ পরিস্থিতি দেখা গেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। আর এ সময়ে ডব্লিউটিআই তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

এদিকে যুদ্ধের মধ্যেই প্রতিদিন গড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ (১৩৯ মিলিয়ন) ডলার আয় করছে ইরান। এই বিপুল অর্থের প্রায় পুরোটাই আসছে তেল রপ্তানি থেকে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’তে অবরোধ জারি করেছে ইরানের অভিজাত বাহিনী আইআরজিসি। বিশ্বের মোট তেল ও তরল গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচলের প্রায় ২০ শতাংশ এই রুটটি ব্যবহার করে। বর্তমানে এই রুটের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকায় সংকটের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে তারা।

হরমুজ প্রণালিকে বলা হয় ‘জ্বালানির বৈশ্বিক দরজা’। অবরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে এবং তেলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইরানের ফ্ল্যাগশিপ জ্বালানি তেল ‘ইরানিয়ান লাইট’ এই রুট দিয়ে অবাধে বহির্বিশ্বে যাচ্ছে।

বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে ইরান থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে।

 

জনগণের দুর্ভোগ কমাতে সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত)। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টায় যশোরে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার কাজ করছে। বহির্বিশ্বের অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, গণপরিবহন ও খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। চতুর্দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করেনি সরকার। জনগণের দুর্ভোগ কোনো কারণে যাতে না বাড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সরকার ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে।’

আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত জনগণের জ্বালানি তেলের চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে দাবি করে অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি তেল নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ৮০টা দেশ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করলেও বাংলাদেশ সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেনি। সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রেখেছে। কিন্তু আমাদের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে প্রতিদিন গড়ে ডিজেলের চাহিদা ছিল ১২ হাজার টন। পেট্রল–অকটেনের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। ঈদের আগে প্রতিদিন ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। বতর্মান সরকার আগামী এপ্রিল পর্যন্ত জনগণের জ্বালানির চাহিদা নিশ্চিত করতে সক্ষম। আগামী দিনগুলোতেও যাতে সরকার ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করতে পারে, সেটির কাজও শুরু হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সভাকক্ষে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে সমাজসেবা অধিদপ্তর। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ১৫৩ জন দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির হাতে এককালীন আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন প্রধান অতিথি অনিন্দ্য ইসলাম। এ সময় তিনি জানান, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভাতা কর্মসূচি চালু করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পরে বিভিন্ন সরকার উপকারভোগী ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে যশোর-৩ আসন থেকে জয় পাওয়া অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মানুষের দোরগোড়ায় গিয়েছি। বঞ্চিত মানুষের আকুতি শুনেছি। আমরা চাই, যাঁদের ভাতা প্রাপ্তির হক আছে, তাঁরাই যেন পান। উপকারভোগী বাছাইয়ে যেন রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পরিচয় প্রাধান্য না পায়। সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ শুরু করেছে। ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু হয়েছে। ধর্মগুরুদের সম্মানী চালু হয়েছে। পয়লা বৈশাখে কৃষক কার্ড চালু হবে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনগণ প্রতিবেশী ও আত্মীয়ের হক আদায় করলে সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমে আসবে।’

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক হারুন অর রশিদ। উপস্থিত ছিলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন (খোকন), পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার, প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদ হাসান (টুকুন) প্রমুখ।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম এখনো কম থাকায় দেশে সোনার দাম সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। আজ শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সোনার ভরিতে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৫৯০ টাকা কমেছে। গত বুধবার ভরিতে কমেছিল ৫ হাজার ৪৮২ টাকা।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আজ সকাল ১০টায় সোনার নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত ১৬ দিনে সোনার দাম ভরিতে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার ৫৭৫ টাকা কমেছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, হলমার্ক করা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা। আর ২১ ক্যারেটের সোনার দাম ভরিতে ৬ হাজার ২৯৯ টাকা কমে হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা।

এ ছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ৫ হাজার ৩৬৬ টাকা কমে নতুন দাম হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ১৬৪ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম ৪ হাজার ৪৩২ টাকা কমিয়ে দাম কমে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৭৩ টাকা।

গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া এক ভরি ২১ ক্যারেট ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৮১ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০৫ টাকা।

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা ক্রয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ—সব মিলিয়ে সোনার দামে অনেক দিন ধরেই ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত জানুয়ারিতে স্পটমার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তার প্রভাবে দেশের বাজারে গত ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের এই অনিশ্চয়তার সময়েও সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সোনার দাম না বেড়ে বরং প্রায় স্থির হয়ে ছিল। তবে গত সপ্তাহের শেষ দিকে সোনার দাম পড়তে শুরু করে।

সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের সঙ্গে সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের ওপর প্রভাব—এই পরস্পরবিরোধী সংকেত মূল্যায়ন করছেন।

আজ দুপুর সোয়া ১২টায় বিশ্ববাজারের স্পটমার্কেটে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৪৬৭ ডলার। এই দাম গতকালের তুলনায় ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। গত সোমবার স্পটমার্কেটে সোনার দাম একপর্যায়ে কমে ৪ হাজার ১০০ ডলারের ঘরে নেমে যায়, যা কিনা গত ১১ ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তারপর ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা পাঁচ দিন স্থগিত করার ঘোষণা দিলে সোনার দাম বাড়তে থাকে।

দেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে তিন লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। আজ বৃহস্পতিবার সরকারি ছুটির দিনে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভা৵র্চুয়াল সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

[caption id="attachment_270397" align="alignnone" width="835"] অর্থ মন্ত্রণালয়[/caption]

সভায় জানানো হয়, বৈশ্বিক অস্থিতিশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারই  অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রয়ের মাধ্যমে সরাসরি পদ্ধতিতে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে এই ডিজেল কেনা হবে। এর মধ্যে এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনা হবে। পাশাপাশি সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেডের কাছ থেকে আরও দুই লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।

দেশের বাজারে জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে চলমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি সহজ করতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একক গ্রাহকের ঋণসীমার ২৫ শতাংশ শর্ত এলপিজি আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এই সীমা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। 

জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে বুধবার (২৫ মার্চ) এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে যে ২৫ শতাংশ ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে, তা আপাতত বহাল থাকবে না। এর বদলে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ঋণসীমা কত হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদাভাবে নির্ধারণ করবে।

একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এই সুবিধা শুধু এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। অন্য কোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে একক ঋণগ্রহীতা সীমা অতিক্রমের সুযোগ থাকছে না।

জানা যায়, এই সুবিধার দাবিতে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আবেদন করেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। পরে নতুন সরকার গঠিত হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একই দাবি উত্থাপন করেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক শর্ত শিথিলের সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এলপিজি বাজারে যাদের বাজার হিস্যা সবচেয়ে বেশি, তারা ১৩টি ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি করে। একক গ্রাহকের ঋণসীমা নিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে না। যেসব ব্যবসায়ী প্রভাবশালী ও এক ব্যাংকনির্ভর, তারাই এ সুবিধার জন্য তোড়জোড় করেন। তাদের ঋণ পরিশোধের অতীত রেকর্ডও ভালো নয়। এরপরও গভর্নর তাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন।

এর আগে, গত জানুয়ারিতে সরবরাহ সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করে বাকিতে এলপিজি আমদানির সুযোগ দেয়। তখন বলা হয়েছিল, অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট, বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বায়ার্স বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে এলপিজি আমদানি করা যাবে। সে জন্য এলপিজিকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে গণ্য করা হবে এবং ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন।

সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পরে শুল্ক-ভ্যাটেও ছাড় দেয় সরকার। ফেব্রুয়ারি মাসে এলপিজির স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতির প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৪ দিনে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। এর মাধ্যমে একক মাস হিসেবে রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে মার্চ মাস। বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ৩০৫ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। চলতি মাসে ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। সাধারণত ঈদের মাসে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়ে যায়। পরিবারের ঈদের খরচ মেটাতে প্রবাসীরা এ সময় বেশি অর্থ পাঠান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে। সে সময় প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন মোট ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। ওই মাসে দেশে আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে। এর পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি মার্কিন ডলার।

এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১০ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময় প্রবাসী আয় এসেছিল ২ হাজার ১২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে প্রবাসী আয়ে ডলারের দাম বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় আট অর্থনীতিবিদ।

অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে। তাই রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক সভায় অর্থনীতিবিদেরা এসব পরামর্শ দেন। তাঁরা বলেছেন, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা গ্রাহক পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।

এর তিন মাস আগে সেপ্টেম্বরে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২২১ কোটি ডলার। আর জুনের শেষে বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ বিদেশি ঋণ গত বছরের জুনের চেয়ে কমেছে, তবে সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই বিদেশি ঋণ বেড়েছে। এসব ঋণের বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি।

[caption id="attachment_270301" align="alignnone" width="832"] অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে ঋণের পরিস্থিতি[/caption]

বিদেশি ঋণের পরিস্থিতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের বেশির ভাগ বা প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল সরকারি খাতের। বাকিটা বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের। ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ ছিল ২০ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ঋণের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৬২ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি এবং ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি। সরকারি ঋণের মধ্যে ৮০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার সরাসরি সরকার নিয়েছে। ১২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেওয়া।

বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিন প্রান্তিকে এ খাতের ঋণ কমেছে। তবে শেষ প্রান্তিকে অর্থাৎ অক্টোবর–ডিসেম্বর শেষে তা আবার ২০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এ খাতের মোট স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ১০ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ঋণ ৬ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের স্থিতি ৯ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ডলার–সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি বহুজাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ নেওয়া হয়। এসব প্রকল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে না। এ জন্য ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হবে সরকারকে। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের অর্থ দিয়ে বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে সরকার ও বেসরকারি খাতকে।

এদিকে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাস জুলাই-জানুয়ারিতে যত বিদেশি ঋণ এসেছে, এর চেয়ে বেশি শোধ করতে হয়েছে। এই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে ২৬৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে সরকারকে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশের পাওনা বাবদ ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।

২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর হওয়ার জেরে দেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। এতে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। তখন ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকায় ওঠে। এতে দেশের মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। সংকট সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকার তখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি ঋণ বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এরপরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থামানো যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজার্ভের পতন থামাতে সক্ষম হয়েছিল। ডলারের বিনিময় হারেও এসেছে স্থিতিশীলতা।

ঋণ বেশি বেড়েছে কখন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সরকারের সময় ২০০৮ সালে তা বেড়ে হয় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। ওই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর ২০২৪ সালে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বা ১০ হাজার ৪৭৬ কোটি ডলারে। অন্তর্বর্তী সরকার ডলার–সংকট মেটাতে ঋণ নেয়। ফলে ২০২৫ সালে বিদেশি ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।