• Colors: Blue Color

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি এরই মধ্যে সই হয়েছে। এবার দুই দেশ চুক্তির ‘দ্বিতীয় ধাপের’ দিকে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। আগামী শুক্রবার থেকে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে বলে জানিয়েছে তেহরানও।

প্রাথমিক চুক্তিতে সই হওয়ার বিষয়টি সোমবার নিশ্চিত করেন ট্রাম্প। এ নিয়ে যতটুকু তথ্য সামনে এসেছে সে অনুযায়ী, শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার পর যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দ করা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা হবে।

এই আলোচনা দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল হতে পারে—বিশ্লেষকদের এমন ধারণার পরও সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমরা চুক্তি সম্পন্ন করেছি। আর এটিকে সফল হতে হবে। এটি দ্বিতীয় ধাপের দিকে এগোচ্ছে। আর আমার মনে হয় এই ধাপটি তুলনামূলক সহজ হবে।’ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ বিনিয়োগ করবে না বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

মঙ্গলবার চুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, পরমাণু কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা শুক্রবার শুরু হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সতর্ক করে তিনি এ-ও বলেন, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালালে তা চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর দুই দিন পর লেবাননেও হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রায় ছয় সপ্তাহ পর ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এখন তেহরানের ভাষ্য, প্রাথমিক চুক্তিতে লেবাননসহ সব সম্মুখসারিতে যুদ্ধ বন্ধের কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহুর সমালোচনায় ট্রাম্প

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি হলেও লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে এই চুক্তি কতটা আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের এমন আচরণের কারণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে হতাশাও প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুকে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।

বিগত কয়েক মাসেও নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি চুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন করে তুলছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার। ট্রাম্প এ-ও বলেছেন, ‘আমি না থাকলে ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না; কারণ, আমি যা করেছি অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট তা করতে রাজি ছিলেন না।’

নেতানিয়াহু অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সতর্কতার পথ ধরেছেন। সোমবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু বিষয় আছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমি একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করি না। ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে আমার দায় রয়েছে। আর বিচক্ষণতার সঙ্গে আমাকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

‘সিরিয়া হিজবুল্লাহ নিয়ে ভালো কাজ করতে পারে’

মঙ্গলবার জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রসঙ্গও তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সিরিয়ায় বর্তমানে দায়িত্ব থাকা ব্যক্তি হিজবুল্লাহর ব্যাপারে খুবই দক্ষ। সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে মোকাবিলায় সিরিয়া হয়তো ইসরায়েলের চেয়ে ভালো কাজ করতে পারে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি ইসরায়েল পরামর্শ দিয়েছেন যে হিজবুল্লাহর বিষয়টি যেন আহমেদ আল-শারা সামাল দেন। কারণ, তিনি কাজটি আরও ভালোভাবে করতে পারবেন। ইসরায়েল অনেক দীর্ঘ সময় ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এর ফলে অনেক বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে।

রয়টার্স এএফপি

ইরানের শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে গেছে। তবে তাদের সত্যিকারের সমস্যাগুলো বোধ হয় এখনই শুরু হবে। একদিকে যুদ্ধে টিকে যাওয়ার সাফল্যে উজ্জীবিত কট্টরপন্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া, অন্যদিকে দারিদ্র্যপীড়িত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—এই দুই বিপরীতমুখী চাপ সামলানোই হবে শাসকগোষ্ঠীর বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের প্রভাবশালী কট্টরপন্থীরা মনে করছে, তিন মাসের এ সংঘাতে তারা বিজয়ী হয়েছে। তাই তারা চায়, ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন আলোচনায় কঠোর অবস্থান নিক এবং দেশের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিক। কট্টরপন্থীদের বিশ্বাস, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে যেকোনো অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত বা প্রতিবাদ দমন করা সম্ভব হবে।

তবে সাধারণ ইরানি জনগণ অর্থনৈতিক স্বস্তি দেখতে চান, যা তাঁদের জীবনমান উন্নত করতে কাজে লাগবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ভালো সম্ভাবনা তৈরি করবে। কারণ, বিধ্বংসী যুদ্ধের পাশাপাশি তাঁরা বছরের পর বছর ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞার ভারও বহন করে এসেছেন।

এ দুই পক্ষেরই প্রত্যাশা অনেক, দাবি পরস্পরবিরোধী, আর ধৈর্যও খুব কম। এরই মধ্যে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে হওয়া রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মতো এই পরিস্থিতি আবারও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করেছিল ইরান সরকার।

অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ

বার্লিনভিত্তিক জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘এই অন্তর্বর্তী চুক্তির ভিত্তি যেহেতু নড়বড়ে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার জন্য প্রকৃত সমস্যাগুলো তখনই শুরু হবে।’

ইরানের বর্তমান চার কর্মকর্তা এবং এক সাবেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, এতদিন সাধারণ জনগণের মনোযোগ যুদ্ধের দিকে ছিল। এখন তারা আবার দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতির দিকে তাকাতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনজন বলেন, জনগণের প্রত্যাশা হলো—নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া বা বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে সরকার যে আর্থিক স্বস্তি অর্জন করবে, তা যেন অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে খরচ করা হয়।

ওই কর্মকর্তাদের একজন ইরানি জনগণকে ‘যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগে ক্লান্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সম্ভাব্য অর্থের বড় অংশ পুনর্গঠন কাজে, ব্যাংক খাতে তারল্য জোগাতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচিতে খরচ করা হতে পারে।

চার কর্মকর্তাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন, সরকার যদি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাঁদের একজন যুদ্ধবিরতির এ চুক্তিকে ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চুক্তির কারণে জনগণের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।

এক সংস্কারপন্থী সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা এসব ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। তাঁর মতে, এ কারণে তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি মেনে নিয়েছে।

যুদ্ধ অবসানে আগামী শুক্রবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার কথা আছে। এতে ইরানের জন্য কিছু আর্থিক ছাড় বা সহায়তার ব্যবস্থা থাকার কথা। পাশাপাশি, দুই পক্ষ যদি গ্রীষ্মের শেষ দিকে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে অত্যন্ত মূল্যস্ফীতি চলছে, জাতীয় মুদ্রার মান ক্রমাগত কমছে, বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এর ওপর যুদ্ধ শুরুর পর শিল্পকারখানা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ খরচ করতে হবে।

ইরানি অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাইদ লায়লাজ মনে করেন, দেশের ভেতরের অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইরানের হাতে এখন খুব সীমিত সময় আছে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নজর দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈশ্বিক বাজার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পথ আবার খুলে দিতে হলে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিস্তৃত একটি চুক্তিতে যেতে হবে। সেই চুক্তির মূল বিষয় হবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তবে আপাতত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে এখনো অনেক দূরের লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় ইসলামি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রতিকৃতি–সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মানুষ হাঁটছে। ১৪ জুন, ২০২৬
ইরানের তেহরানে একটি রাস্তায় ইসলামি বিপ্লবের প্রয়াত নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির প্রতিকৃতি–সংবলিত একটি দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে মানুষ হাঁটছে। ১৪ জুন, ২০২৬, ছবি: রয়টার্স

নিজেদের ভূমিকার পুরস্কার চায় কট্টরপন্থীরা

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের কর্তৃপক্ষ কঠোর সতর্কবার্তা, কঠিন শাস্তি ও সরকারপন্থী সমর্থকদের রাস্তায় নামিয়ে ভিন্নমত দমন করার চেষ্টা করেছে। শাসনব্যবস্থার সমর্থনে প্রায় অবিরাম বিক্ষোভ, সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে তারা জনমত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়েছে।

অনেক বছর ধরে ইরানের কট্টরপন্থীরা দেশটির নেতৃত্বকে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের পক্ষে ছিলেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, তাঁদের অবস্থানই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে তাঁরা আশা করছেন, যুদ্ধকালে তাঁদের ভূমিকা ও সমর্থনের যথাযথ পুরস্কার দেওয়া হবে।

ইরানের এ কট্টরপন্থী শিবিরে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী আছে। এর মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড অন্যতম। তবে বর্তমানে ইরানের টিকে থাকার স্বার্থে বিপ্লবী গার্ড একটি সমঝোতা চুক্তি মেনে নিতে প্রস্তুত হলেও তথাকথিত পেদারি ফ্রন্ট সে অবস্থানে নেই। এই ফ্রন্টে প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যাঁরা রাস্তায় নেমে শাসনব্যবস্থার সমর্থনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে এই গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব আছে। তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রের নীতি উল্টে দেওয়ার মতো শক্তিশালী না হলেও, শাসকগোষ্ঠীর জন্য নানা ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা ও চাপ তৈরি করতে পারেন।

আরও ভালো শর্ত পূরণের জন্য অপেক্ষা না করে ইরান এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ।

ইরানের স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ–এর সদস্য হোসেইন বলেন, ‘যে শত্রু আমাদের নেতাকে (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) শহীদ করেছে, তাদের সঙ্গেই তারা এখন চুক্তি করছে। অথচ আমরা যুদ্ধ জিতেছি। তাহলে ইমাম খামেনির রক্তের প্রতিশোধ কোথায়? এটা কেমন ইসলামি সরকার? আর এখন শুক্রবার তারা ইমামের হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছে।’

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা চার কর্মকর্তার একজন স্বীকার করেছেন, জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলা করা জরুরি হলেও এই যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের কাজ ‘পূর্ণগতিতে’ চলবে।

বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, যদি অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক সহায়তা বা অর্থ প্রবাহ শুরু হয়, তাহলে সরকার হয়তো আপাতত জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের সংকট বা জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়াটা ঠেকাতে পারবে।

ইরানের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেদের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠীকে বোঝানো যে এটি আসলে একটি ভালো চুক্তি। কারণ, যুদ্ধ চলাকালে ও যুদ্ধবিরতির সময় সরকার এই কট্টরপন্থী সংখ্যালঘু সমর্থকদের ওপরই অনেক বেশি নির্ভর করেছে।

২০২২–২৩ সালে ইরানে বড় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত সরকার নারীদের পোশাকবিধি নিয়ে কঠোর অবস্থান কার্যত শিথিল করতে বাধ্য হয়েছিল। হেফাজতে থাকা অবস্থায় মাসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়িয়েছিল। তখন থেকে অনেক নারী বাধ্যতামূলক হিজাব ছাড়াই প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। আর এই বিষয়টি ইরানের কট্টরপন্থীদের অসন্তুষ্ট করে আসছে।

সংঘাত চলাকালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর পছন্দের উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রেও বিপ্লবী গার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোজতবা এখনো জনসমক্ষে দেখা দেননি এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রভাবকেও আগের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাটাঙ্কা মনে করেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠী ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের মতোই নিজেদের সমর্থিত চুক্তির বিরোধিতা করা কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে পারে।

ভাটাঙ্কা আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, যে বা যারাই প্রতিষ্ঠিত ঐকমত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে, তার বিরুদ্ধেই তারা ব্যবস্থা নেবে। কারণ, আলী খামেনির পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। নারীরা হয়তো হিজাব ছাড়া চলাফেরার মতো কিছু সামাজিক স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহনশীলতা দেখানো হবে না।’

রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দেশটির বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই বিধ্বস্ত হয়ে আটজন নিহত হয়েছেন। খবর বিবিসির।

স্থানীয় সময় সোমবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আকাশে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। কয়েক মাইল দূর থেকেও যা চোখে পড়ছিল।

১৯৫০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বোয়িং বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বিমানটি ব্যবহার করে আসছে। বিশাল আকৃতির এই বিমানের ডাকনাম ‘দ্য বাফ’, যা ‘বিগ আগলি ফ্যাট’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান এখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে।

বি-৫২ একটি দীর্ঘপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান। সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এ বিমান ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী।

বিশাল এই বোমারু বিমান ৫০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। এটি প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড ওজনের সমরাস্ত্র বহন করতে পারে। এর মধ্যে কয়েক শ সাধারণ বোমা বা ৩২টি পারমাণবিক অস্ত্র–সংবলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়।

উড্ডয়নরত অবস্থায় আকাশেই এই বিমানে জ্বালানি ভরা যায়। ফলে এটি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে হামলা চালাতে পারে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ বা পারমাণবিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করত।

সাধারণত বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেসে পাঁচজন ক্রু থাকেন। তাদের মধ্যে একজন কমান্ডার, একজন পাইলট, একজন রাডার নেভিগেটর, একজন নেভিগেটর ও একজন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার কর্মকর্তা।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান গত রোববার গভীর রাতে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার পরদিন গতকাল সোমবার সকালে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি সই হয়েছে।’

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, এ চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

এ–সংক্রান্ত আলোচনায় সহযোগিতা করার জন্য ইসরায়েলের চিরবৈরী দেশ তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।

পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ’ হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের আগে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১১ জুন, ২০২৬
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের আগে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১১ জুন, ২০২৬ছবি: এএফপি

‘মানতে বাধ্য নই’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।

নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের সুর ধরে গতকাল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে।

কাৎজ আরও বলেন, ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। ওই এলাকার বেসামরিক বাড়িঘরগুলো ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

চুক্তিটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেছেন চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।

স্মোট্রিচ লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এ চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী

সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের ভবনগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন স্মোট্রিচ। এখন এই চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে সেনাবাহিনীকে ‘পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার’ অনুমতি দেওয়া অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীন রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ এই উগ্রপন্থী মন্ত্রী আরও দাবি করেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। ইসরায়েল কোনো ‘বানানা রিপাবলিক (দুর্বল বা পুতুল রাষ্ট্র) নয় উল্লেখ করে বেন গভির বলেন, ‘এ চুক্তি আমাদের কোনোভাবেই বেঁধে রাখতে পারে না।’

ইসরায়েল সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাও চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইরানে হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর ওয়াইনেটকে বলেন, তাঁদের সরকার শুধু একটি বিষয়েই আগ্রহী—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, কি নেই।

জোহর দাবি করেন, ‘ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।’ তিনি আরও বলেন, এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’

ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর দাবি করেন, ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে। এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’

‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’

ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও, বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১৪ নিউজ’-এর সাংবাদিক ইনন মাগাল, যাঁকে ইসরায়েলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে আখ্যা দেন।

ইনন মাগাল মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইঙ্গিত করে একটি সাধারণ ইহুদিবিদ্বেষী গালি ব্যবহার করে ‘লিটল জিউস’ (ছোট ইহুদি) বলে উল্লেখ করেন।

একই টেলিভিশন চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন গতকাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের যে নিজস্ব স্বার্থ আছে, তা এই ‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’কে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।

 ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি ইসরায়েল ও পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর। ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।

বেজালেল স্মোট্রিচ, ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী

ইসরায়েলের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ (আইডিএসএফ) গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের “সন্ত্রাসী” সরকারের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বর্তমান চুক্তিটির পরিণতিও ভিন্ন কিছু হবে না।’

আইডিএসএফ আরও বলেছে, ‘এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, সামনে কী আসছে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এবং লেবানন ও ইরান থেকে হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করার উপযুক্ত সময়।’

অন্যদিকে অনেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও চড়াও হয়েছেন। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই সুযোগে তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।

লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬
লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, তাঁদের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবাননে অবস্থান করবে। ১৫ জুন, ২০২৬, ছবি: এএফপি
 

মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

গোলানের মতে, এ নতুন চুক্তি ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বহু বছরের ভুল নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। এর ফলে ইসরায়েল এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কোনো সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের ‘মহাবিপর্যয়ের’ (ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলা) পর গত প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ (গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন) একটি ব্যর্থ সরকারের নির্মম ফলাফল বয়ে এনেছে।

ইসরায়েলের মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘এ সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এবং আমাদের একটি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’

বেনেট আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার এবং তাঁর ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করার জন্য তাঁর কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি হিসেবে একটি সমঝোতা চুক্তি ভার্চুয়ালি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স অনলাইন মাধ্যমে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বলে জানিয়েছেন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা।

চুক্তির আওতায় ইরানের বন্দরে আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে নতুন আলোচনা শুরুর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের পক্ষে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে।

তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কোনো পাঠ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পরই এটি প্রকাশ করা হতে পারে। তবে দুই পক্ষের বক্তব্যে বেশ কিছু বিষয়ে পার্থক্য দেখা গেছে। বিশেষকরে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম নিয়ে অবস্থান ভিন্ন।

ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ‘ফি’ আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, শুক্রবার থেকে কোনো ধরনের টোল ছাড়াই প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে।

এদিকে, চুক্তি নিয়ে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব বিষয়ে একমত নন। একই সময়ে, ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার দায় স্বীকার করেছে।

 

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব