• Colors: Green Color

অবিশ্বাস্য, বিখ্যাত এক ড্র কেপ ভার্দের!

এটাই কি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ড্র? স্পেনের খেলোয়াড়দের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না! কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের চোখে অশ্রু। আহা! বিশ্বকাপের এই তো মজা!

এবার বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ব্যবধানে রুখে দিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসে জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ (৫ লাখ ২৫ হাজার) কেপ ভার্দে! সেটাও বিশ্বকাপে তাদের অভিষেক ম্যাচে!

কেপ ভার্দে গোলকিপার ভোজিনিয়ার চোখে অশ্রুর বান। দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা উৎসবের এই লগ্ন নেমেছে তাঁর হাতে ভর করে। ৭টি দারুণ সেভ করেছেন ম্যাচে।

তারকাখচিত স্পেন, সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন—৮০১টি পাস খেলেও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৪ তম কেপ ভার্দের জালে বল পাঠাতে পারেনি!

কেপ ভার্দে ৬টি শট নিতে পেরেছে। পোস্টে রাখতে পেরেছে মাত্র একটি। বেশির ভাগ সময়ই পাঁচজনের ব্যাকলাইন নিয়ে রক্ষণ সামলেছে। কখনো কখনো একজন মিডফিল্ডার নিচে নামিয়েও ছয়জন মিলে ডিফেন্স করেছে।

স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট কাড়ার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট কাড়ার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন, এএফপি
 

স্পেন যে চেষ্টা করেনি তা নয়, মরিয়া হয়েই খেলেছে। চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে না ওঠা লামিনে ইয়ামালকে বাধ্য হয়ে বদলি নামিয়েছে। ২৭টি শট নিয়ে পোস্টে রাখতে পেরেছে ৭টি। কিন্তু গোলটা আর পাওয়া হয়নি। বল পোস্টেও লেগেছে।

পুরো ম্যাচে গোলের সুযোগ কম বের করেনি স্পেন। কিন্তু প্রায় সময়ই কেপ ভার্দের বক্সে ঢুকে কিংবা তার সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে ফেরান তোরেস, দানি ওলমো, ইয়ামালদের আক্রমণভাগ। কারণ? বুক চিতিয়ে লড়েছে কেপ ভার্দে। স্পেনের বেশির ভাগ শটের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন কেপ ভার্দের ডিফেন্ডাররা। তখন মনে হয়নি দুই দলের মধ্যে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬১ ধাপের ব্যবধান!

ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বল ধরে রেখেছে স্পেন।

গোলকিপার ভোজিনিয়ার বীরত্ব। কেপ ভার্দের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন
গোলকিপার ভোজিনিয়ার বীরত্ব। কেপ ভার্দের ইতিহাসে স্মরণীয় দিনওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ এক্স হ্যান্ডল

ইয়ামালকে ছাড়াই নামছে স্পেন

কেপ ভার্দের বিপক্ষে বিশ্বকাপে স্পেনের প্রথম ম্যাচের একাদশে নেই লামিনে ইয়ামাল। গত এপ্রিলে বার্সেলোনার হয়ে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ম্যাচের সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান। এরপর গত কয়েক সপ্তাহ মাঠের বাইরেই ছিলেন ইয়ামাল। তাঁর পুর্নবাসন প্রক্রিয়া এখনও শেষ না হওয়ায় এই ম্যাচের শুরু থেকে নেই ইয়ামাল।

স্পেনের প্রথম একাদশ গোলরক্ষক: ২৩–উনাই সিমন। ডিফেন্ডার: মার্কোস ইয়োরেন্তে, ১৪–এমেরিক লাপোর্ত ,২২–পাউ কুবারসি, ২৪–মার্ক কুকুরেয়া। মিডফিল্ডার: ৮– ফাবিয়ান রুইজ, ৯–গাভি, ১৬–রদ্রি, ২০–পেদ্রি। ফরোয়ার্ড: ৭–ফেরান তোরেস, ২১– মিকেল ওইয়ারসাবাল

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে আছে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ। এই দ্বীপগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কেপ ভার্দে, যার সরকারি নাম রিপাবলিক অব কাবো ভার্দে। ১৯৭৫ সালে পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময়ের পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা পায় দেশটি। জনসংখ্যা ছয় লাখের কম।

আজ সেই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রই বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছে স্পেনের বিপক্ষে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা দলটিকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল আছে অনেকের। কেমন এই দল, কারা আছেন স্কোয়াডে, কী তাদের ফুটবল-ঐতিহ্য—চলুন জেনে নেওয়া যাক।

যেভাবে বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে

কেপ ভার্দে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে। বাছাইপর্বের ‘ডি’ গ্রুপে ৮ ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে তারা।

তাদের চেয়ে ৪ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ক্যামেরুন। জেনে রাখা ভালো, আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটবার বিশ্বকাপ খেলেছে ক্যামেরুনই। তাদের টপকে কেপ ভার্দে এখন বিশ্বকাপে।

[caption id="attachment_276476" align="alignnone" width="700"] তাদের জাতীয় দল অনেকটাই প্রবাসী ফুটবলার–নির্ভরএক্স[/caption]

দলটি আসলে কেমন

কেপ ভার্দের জাতীয় দল অনেকটাই প্রবাসী ফুটবলার–নির্ভর। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যার চেয়েও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা বেশি। সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় ফুটবল দলেও।

দেশের ঘরোয়া লিগে ১২টি ক্লাব থাকলেও বিশ্বকাপ স্কোয়াডে স্থানীয় লিগের একজন খেলোয়াড়ও নেই। ২৬ সদস্যের দলে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা ফুটবলার আছেন মাত্র একজন—ডিফেন্ডার লোগান কস্তা, যিনি স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালের হয়ে খেলেন।

বাকি খেলোয়াড়েরা ছড়িয়ে আছেন ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের লিগে। স্কোয়াডের সর্বোচ্চ ৭ জন খেলেন পর্তুগিজ ক্লাবে।

[caption id="attachment_276475" align="alignnone" width="705"] বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাদের অভিষেক ২০০৩ সালেএক্স[/caption]

দলের অধিনায়ক ও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রায়ান মেন্দেস। ১৬ বছর আগে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ৩৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখনো আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা। আর ৩৯ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এখনো দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন।

কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো সাধারণত ৪-২-৩-১ কিংবা ৪-১-৪-১ ফরমেশনে দলকে খেলান। তাঁর কৌশলের মূল ভিত্তি হাই প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর ফুটবল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা

কেপ ভার্দে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১৯৭৮ সালের ২৯ মে, গিনির বিপক্ষে। সেই ম্যাচে তারা ১–০ গোলে হেরে যায়। ১৯৮২ সালে গঠিত হয় কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন এবং ১৯৮৬ সালে দেশটি ফিফার সদস্যপদ পায়।

১৯৯২ সালে প্রথমবার আফ্রিকান নেশনস কাপের বাছাইপর্বে অংশ নেয় কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাদের অভিষেক ২০০৩ সালে।

 

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় ২০১৩ সালে, যখন আফ্রিকান নেশনস কাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০২৩ সালেও তারা একই কীর্তি গড়ে।

বর্তমানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে কেপ ভার্দের অবস্থান ৭০তম। তবে র‍্যাঙ্কিংয়ের চেয়ে বড় পরিচয়, তারা এখন বিশ্বকাপের নবাগত দল—যারা নিজেদের প্রথম উপস্থিতিতেই সবাইকে চমকে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

শুরুটা করেছিলেন ইয়াসিন আয়ারি, শেষটাও করলেন তিনিই।

২২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের জোড়া গোলের ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৫–১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে সুইডেন। অন্য তিনটি গোল করেছেন ভিক্টর ইয়োকেরেস, আলেকসান্দার ইসাক ও মাটিয়াস সভানবার্গ।

গোল উদ্‌যাপন
গোল উদ্‌যাপনএএফপি

জাপান যে কখনো হাল ছাড়ে না সেটা দেখা গেল আবারও!

ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও ৮৮ মিনিটে কামাদার গোলে শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২–২ গোলে ড্র করেছে জাপান।

প্রথমার্ধ গোলশূন্য ব্যবধানে শেষ হওয়ার পর চারটি গোলই হয়েছে পরের অর্ধে। ৫১ মিনিটে ডাচ অধিনায়ক ভার্জিন ফন ডাইকের গোল শোধ করেন জাপানের কেইতো নাকামুরা। ৬৪ মিনিটে সামারভিলের গোলে ডাচরা আবারও এগিয়ে গেলেও কামাদোর গোলে শেষ পর্যন্ত ১ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছেড়েছে এশিয়ার দলটি।

নেদারল্যান্ডস ২ : ২ জাপান 

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৮৯ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছে জাপান। জয়ের স্বপ্ন দেখা ডাচদের থমকে দিয়ে গোলটি করেছেন দাইচি কামাদা।

বিশ্বকাপের এই এক মজা! ৪৮ দল হওয়ায় সম্ভাবনাটা আরও বেড়েছে। কুরাসাও প্রমাণ করল সেটাই।

২০২৩ সালের মার্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল কুরাসাও। সেই ম্যাচের আগে ক্যারিবিয়ান এই দ্বীপ দেশটির নাম জানতেন না অনেকেই। জনসংখ্যায় বিশ্বকাপের ইতিহাসেই ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে এবারের টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেওয়ার পর তাদের পরিচিতিটা আরেকটু বেড়েছে। কিন্তু হিউস্টনে আজ রাতে যা ঘটল, তাতে কুরাসাওকে আসলে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ অভিষেকে ৭ গোল করে ছোট্ট দ্বীপ দেশটিকে আরও ভালোভাবে মনে রাখার সুযোগ করে দিল জার্মানি।

কুরাসাওকে তাই অন্তত জার্মানদের ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। হিউস্টন স্টেডিয়ামে কয়েক হাজার ‘ব্লু ওয়েভ’ সমর্থক এবং দলটির বাইরে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরের এক চিলতে ভুখন্ডে এক লাখের কিছু বেশি কুরাসাওবাসীরাও এই ম্যাচকে মনে রাখবেন জনম জনম!

মাত্র ১ লাখ ৫৮ হাজার জনসংখ্যার একটি দেশ। বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়াটাই যেখানে তাঁদের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উৎসব, সেখানে একটা গোল কী করতে পারে! সেটাও যদি হয় চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির জালে! কাই হাভার্টজদের সাত গোলও যেটা করতে পারেনি, কুরাসাওয়ের লিভানো কোমেনেনসিয়া সেটা করতে পেরেছেন মাত্র এক গোলেই। তেমন কিছু না আসলে, আজ থেকে ১০০ বছর পরও যখন কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপে খেলার প্রসঙ্গে উঠবে, গল্প হবে প্রথম গোলটি করেছেন কে—তখন কোমেননসিয়ার নামটা উচ্চারিত হবে। অমরত্ব আর কি!

অনেকের মতেই, হিউস্টনের এই ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম ‘মিস–ম্যাচ’—অর্থাৎ দুই দলের শক্তির ব্যবধানে বড় বেশি অসমতা। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে নবম জার্মানির সঙ্গে ৭২ ধাপের ব্যবধানে পিছিয়ে কুরাসাও—যেটা ২০১০ বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়া–আইভরিকোস্ট ম্যাচের পর সবচেয়ে বড় ব্যবধান। এমন ম্যাচে জার্মানি কী করতে পারে, সেটা তো ২০০২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের জালে তাঁদের ৮ গোলেই পরিস্কার। ইউলিয়ান নাগলসমানের দলটিও কুরাসাওকে ৭–১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে একটি বার্তা দিয়েছে, যেটা পঞ্চম গোলের পর থেকেই বলছিলেন ধারাভাষ্যকার, ‘জার্মানি নিজেদের ফিরে পেয়েছে!’

খবরটা বিশ্বকাপে বাকি দলগুলোকে খুশি করবে না, তা নিশ্চিত।

জার্মানি আসলে কুরাসাওয়ের স্পর্ধার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার পথে দলটিকে গুরুত্বপূর্ণ এক পাঠও দিয়েছে। বিশ্বকাপে ছোট দল বলে তিল পরিমাণ ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। তা না হলে ২১ মিনিটে কুরাসাও সমতায় ফেরার পর জার্মানি কেন গুণে গুণে আরও ছয় গোল করবে। কারও কারও হয়তো ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালও মনে পড়েছে। সেবার জার্মানির প্রতিপক্ষ ছিল ব্রাজিল, এবার কুরাসাও। কিন্তু স্কোরলাইন একই। বাংলাদেশে অনেক ফুটবল সমর্থকের ভাষায় , ‘সেভেন আপ।’

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব