বার্লিনের গুপ্তচর জগৎকে পটভূমি করে তৈরি নতুন থ্রিলার সিরিজ ‘আনফ্যামিলিয়ার’ মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই নন–ইংরেজি কনটেন্টের তালিকায় বিশ্বব্যাপী শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছিল। ৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়া সিরিজটি দেখা যাচ্ছে নেটফ্লিক্সে। মুক্তির পর এ পর্যন্ত ২৫ মিলিয়ন ঘণ্টার বেশি ভিউ হয়েছে সিরিজটির। আন্তর্জাতিক দর্শকের আগ্রহ প্রমাণ করে দিয়েছে—ইউরোপীয় পটভূমির গোয়েন্দা গল্পও আজ বৈশ্বিক বিনোদনের কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে পারে।

সিরিজের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক শীর্ষ দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা—মেরেট ও সিমন। মেরেট চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুসান উলফ আর সিমনের ভূমিকায় ফেলিক্স কারমার। একসময় তাঁরা ছিলেন জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার দক্ষ অপারেটিভ; এখন বার্লিনে একটি গোপন ‘সেফ হাউস’ পরিচালনা করেন। কিন্তু অতীতের এক অন্ধকার হুমকি হঠাৎ ফিরে এলে তাঁদের শান্ত জীবন ভেঙে পড়ে। চুক্তিভিত্তিক খুনি, রুশ এজেন্ট ও নিজেদের সাবেক নিয়োগকর্তা জার্মান ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (বিএনডি)—সবাইকে মোকাবিলা করতে হয় তাঁদের। আর সেই লড়াই শুধু দায়িত্বের নয়, নিজেদের পরিবার ও জীবনের সুরক্ষারও।

‘আনফ্যামিলিয়ার’ আসলে প্রযোজনা সংস্থা গোমোঁ জার্মানির নেটফ্লিক্সের সঙ্গে দ্বিতীয় বড় প্রকল্প, রোমান সাম্রাজ্যকে ঘিরে নির্মিত ‘বারবারিয়ানস’–এর পর। সেই সিরিজের পরিকল্পিত তৃতীয় মৌসুমের জন্য কাজ শুরু করেছিলেন নির্মাতা পল কোটস। কিন্তু সেটি বাতিল হলে তিনি নতুন এক গুপ্তচর গল্পের ধারণা দেন, যা থেকে জন্ম নেয় ‘আনফ্যামিলিয়ার’।

কোটসের ভাষায়, এই সিরিজের ভেতরে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। তিনি নিজেও পঞ্চাশোর্ধ্ব, তাই মেরেট ও সিমনের বয়সও জীবনের বাস্তবতা তাঁকে টেনেছে। সাধারণত গুপ্তচর কাহিনিতে তরুণ, শক্তিশালী, প্রায় অতিমানবীয় চরিত্র দেখা যায়। কিন্তু এখানে দুই মধ্যবয়সী মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা, বয়সজনিত ক্লান্তি ও মানসিক টানাপোড়েন গল্পকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বেরাইসও মনে করেন, বয়সকে গল্পের অংশ করে তোলার মধ্যেই রয়েছে মৌলিকতা ও বাস্তবতা।

‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সিরিজ নির্মাণে বাস্তবতার ছোঁয়া আনতে সরাসরি সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল জার্মান গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডির কাছ থেকে। প্রযোজকেরা গল্পের খসড়া তাঁদের সঙ্গে ভাগ করেন, যাতে উপস্থাপনা বিশ্বাসযোগ্য হয়। অভিনয়শিল্পীরাও সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ পান। এমনকি বার্লিনে বিএনডির সদর দপ্তরের বাইরে শুটিংয়ের অনুমতিও মিলেছিল, তবে কড়া নিরাপত্তা বিধিনিষেধ মেনে। সপ্তাহান্তে শুটিং করতে হয়েছে, যাতে সংস্থার কর্মীদের স্বাভাবিক যাতায়াত চিত্রায়িত না হয়।

গোমোঁর জন্য ‘আনফ্যামিলিয়ার’ ছিল এক উচ্চাভিলাষী আন্তর্জাতিক প্রকল্প। তাদের আগের সফল সিরিজগুলোর মতো ‘নার্কোস’ বা ‘লুপিন’—এখানেও নির্মাতারা একটি স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করতে চেয়েছেন। বার্লিনের ইতিহাস, শীতল যুদ্ধের স্মৃতি, আধুনিক ইউরোপীয় রাজনীতির উত্তাপ—সব মিলিয়ে এক বাস্তব অথচ উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে গল্প স্বাভাবিকভাবেই বিস্তার লাভ করেছে।

কোটস জানান, শুরুতে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তারিক সালেহ পরিচালিত অ্যাকশন থ্রিলার ‘দ্য কন্ডাক্টর’ থেকে। বিশেষ করে একটি দৃশ্যে আহত নায়ককে একটি ফোন নম্বর দেওয়া হয়, সেই রহস্যময় সেফ হাউসের ধারণাই তাঁকে ভাবায়। সেখানে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি ছিল এডি মারসনের। সেই চরিত্রটির অদেখা জীবন, অজানা অতীত—এসব প্রশ্ন থেকেই সিরিজটির জন্ম।

সিরিজটির নির্মাণভঙ্গি ধীর ও সংযত। প্রথম পর্বেই সব রহস্য উন্মোচন না করে দর্শককে ধাপে ধাপে তথ্য দেন। চমকপ্রদ টুইস্টের বদলে তাঁরা বেছে নিয়েছেন ‘স্লো–বার্ন’ পদ্ধতি—চাপ জমতে থাকে, উত্তেজনা বাড়ে এবং দর্শক অনিবার্য পরিণতির অপেক্ষায় থাকেন। এই ধৈর্যশীল গতি সবার কাছে সমান আকর্ষণীয় না–ও হতে পারে, কিন্তু অনেকেই এই সংযমকেই সিরিজটির শক্তি হিসেবে দেখছেন।

‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

নেটফ্লিক্স সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্পাই থ্রিলারকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে দক্ষতা দেখিয়েছে। ‘আনফ্যামিলিয়ার’ সেই ধারাতেই নতুন সংযোজন। অল্প পর্বসংখ্যা সিরিজটিকে সহজে টানা দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বাস্তবধর্মী উপস্থাপন সিরিজটিকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে, যা অনেক কল্পনাপ্রবণ স্পাই ড্রামার ভিড়ে আলাদাভাবে চোখে পড়ে।

তবে বিতর্কের জায়গাটিও স্পষ্ট। অনেক দর্শকের কাছে এটি পরিচিত ফর্মুলার পুনরাবৃত্তি—অবসরপ্রাপ্ত গুপ্তচর, অতীতের ব্যর্থ মিশন, ভুয়া পরিচয়ে গড়া পরিবার। নতুনত্বের সন্ধানীরা হয়তো এটিকে ‘রিমিক্স’ বলবেন। কিন্তু চরিত্রকেন্দ্রিক উত্তেজনা, আবেগের ধীরে জমাট বাধা স্তর ও মধ্যবয়সী জীবনের বাস্তব সংকট—এই উপাদানগুলোই সিরিজটিকে অন্যদের কাছে আলাদা করে তুলেছে। মুক্তির পর প্রথম সপ্তাহেই বৈশ্বিক সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে, দর্শক এখন এমন গুপ্তচর কাহিনি দেখতে চায়, যেখানে আছে মানবিক দুর্বলতা, বয়সের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক জটিলতার সমন্বয়।

‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর পোস্টিার। আইএমডিবি
‘আনফ্যামিলিয়ার’–এর পোস্টিার। আইএমডিবি

এটি শুধু অ্যাকশন নয়; বরং মধ্যবয়সী দুই মানুষের টিকে থাকার গল্প; অতীতের ছায়া থেকে বর্তমানকে বাঁচানোর লড়াই। আর বার্লিন গুপ্তচর ইতিহাসের চিরন্তন শহর—এই লড়াইয়ের জন্য যেন আদর্শ মঞ্চ।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব