বানিজ্য

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বৈশ্বিক উত্থানের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় এই করপোরেশন চলতি বছরে এক ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে সিউলের শেয়ারবাজারও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম বাজার হয়ে উঠেছে।

তবে দেশটির একটি অংশ এই পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা আর কেউ নন, তাঁরা হলেন স্যামসাংয়ের শ্রমিকেরা। কয়েক হাজার কর্মী ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। নজিরবিহীন এই কর্মবিরতি হলে এমন এক সময়ে মেমোরি চিপ উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারত, যখন এআই শিল্পে এসব চিপের চাহিদা তুঙ্গে।

বৃহস্পতিবার ধর্মঘট শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো জানায়, তারা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। যদিও এই চুক্তি এখনো ইউনিয়নের সদস্যদের ভোটে অনুমোদন পেতে হবে, বিষয়টিকে স্যামসাং কর্মীদের জন্য প্রাথমিক জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোম্পানির রেকর্ড মুনাফার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই বেতন ও বোনাস বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

এ সমঝোতার ফলে আপাতত কোম্পানির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মঘট এড়ানো গেছে। ১৮ দিনব্যাপী সম্ভাব্য এই কর্মসূচিতে ৪৮ হাজারের বেশি কর্মী অংশ নিতেন—দক্ষিণ কোরিয়ায় স্যামসাংয়ের মোট কর্মীর প্রায় ৪০ শতাংশ। অংশগ্রহণকারী কর্মীদের অধিকাংশ মেমোরি চিপ বিভাগে কাজ করেন। এনভিডিয়া ও এএমডির মতো প্রযুক্তি জায়ান্টের এআই হার্ডওয়্যারে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে এসব চিপ।

উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ও বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্প—উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক ছিল। গত বছর স্যামসাংয়ের আয় ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের তিনটি প্রধান মেমোরি চিপ নির্মাণকারী কোম্পানির একটি। এমন সময় এই শিল্পে সরবরাহসংকট চলছে, যখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণ কার্যক্রম চলছে বিশ্বজুড়ে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সক রোববার বলেন, ‘স্যামসাংয়ের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে যেকোনো বিঘ্ন শুধু একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।’

এদিকে এআই প্রযুক্তির উত্থান বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের চাকরি কাঠামো পাল্টে দেবে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বুধবার মেটা প্রায় ১৫ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই ও পুনর্বিন্যাস করেছে। লক্ষ্য—এআই খাতে আরও বেশি সম্পদ বিনিয়োগ করা। এ বছর লিংকডইন, অ্যামাজন ও স্ন্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানও এআইকেন্দ্রিক পুনর্গঠন ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে।

রেকর্ড আয় করেছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস
রেকর্ড আয় করেছে স্যামসাং ইলেকট্রনিকসছবি: রয়টার্স

এআই মুনাফার বড় অংশ চাইছেন কর্মীরা

গত মাসে স্যামসাং ঘোষণা দেয়, তাদের রেকর্ড পরিমাণ ত্রৈমাসিক মুনাফা হয়েছে। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা ৮ দশমিক ৫ গুণের বেশি বেড়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের পুরো বছরের পরিচালন মুনাফাও ছাড়িয়ে গেছে এই আয়।

এখন সেই মুনাফার বড় অংশ নিজেদের জন্য চাইছেন কর্মীরা।

ইউনিয়নের দাবি, বার্ষিক বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত যে বোনাস সীমা, সেটা তুলে দিতে হবে। পাশাপাশি বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে হবে এবং এই সুবিধা শুধু চলতি বছর নয়, ভবিষ্যতেও বহাল রাখতে হবে।

স্যামসাংয়ের চিপ বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিরা প্রতিযোগিতামূলক বেতন পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের সঙ্গে বোনাস বৈষম্য তাঁদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সও চলতি বছর রেকর্ড মুনাফা করেছে। তবে গত সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি নতুন বোনাস কাঠামো চালু করে, যেখানে মূল বেতনের এক হাজার শতাংশ পর্যন্ত বোনাস সীমা তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে তারা বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ কর্মীদের বোনাস তহবিলে বরাদ্দ করছে।

নতুন কাঠামোর অধীন এসকে হাইনিক্সের কিছু কর্মী ২০২৫ সালে নিজেদের মূল বেতনের প্রায় ৩ হাজার শতাংশ সমপরিমাণ বোনাস পাবেন। কর্মীপ্রতি গড় বার্ষিক বোনাস দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ওন বা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার ডলার।

স্যামসাংয়ের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন গত মাসে বিবৃতিতে বলেছিল, ‘সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন মেধা ধরে রাখার যুদ্ধে নেমেছে। এসকে হাইনিক্স ইতিমধ্যে দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারিশ্রমিক কাঠামো পরিবর্তন করেছে। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোও আমাদের প্রকৌশলীদের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিচ্ছে।’

বুধবারের প্রাথমিক সমঝোতার অংশ হিসেবে স্যামসাং বিদ্যমান বোনাসসীমা তুলে দিতে এবং সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের জন্য ব্যবসায়িক মুনাফার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বোনাস হিসেবে বরাদ্দ করতে সম্মত হয়েছে।

বুধবার বিবৃতিতে স্যামসাং বলেছে, ‘সমঝোতা হয়েছে প্রত্যাশিত সময়ের পরে। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি আর তৈরি না হয়, সে জন্য আমরা আরও পরিণত ও গঠনমূলক শ্রম-ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে কাজ করব।’ এই বিরোধ দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে সম্পদ বণ্টন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবিষয়ক গবেষণা ও অধিকার সংগঠন ‘এনিওনইউনিয়ন’–এর প্রধান জো গিউন-জুন বলেন, এআইের উত্থান মাজে চরম বৈষম্যমূলক মেরুকরণ তৈরি করেছে।

জো গিউন আরও বলেন, সমাজের একদিকে চাকরির নিরাপত্তা ও শ্রম সুরক্ষা ছাড়া কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মীরা কোম্পানির বিপুল মুনাফার কারণে নজিরবিহীন বোনাস পাচ্ছেন।

সিএনএন

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব