বানিজ্য

  • Colors: Orange Color

গত শনিবারের পর আজ মঙ্গলবার আবার সোনার দাম বাড়াল বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। সংগঠনের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ ভালো মানের অর্থাৎ, ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়েছে ভরিপ্রতি ৩ হাজার ২৬৬ টাকা।

বাজুসের নতুন মূল্য অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম পড়ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা। এর ফলে গত শুক্রবারের পর সোনার দাম ভরিপ্রতি বাড়ল ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা। তার আগে টানা কিছুদিন দাম কমেছে।

নতুন দাম অনুযায়ী, ২১ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা। ১৮ ক্যারেট সোনার দাম ২ লাখ ২১৩ টাকা। সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা।

বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টা থেকে এই দাম কার্যকর হয়েছে। এই দামের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হবে।

সোনার সঙ্গে আজ রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। পরে ২২ ক্যারেট অর্থাৎ, ভালো মানের এক ভরি রুপার দাম হয়েছে ৫ হাজার ৭১৬ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধির আগে রুপার দাম ছিল প্রতি ভরি ৫ হাজার ৩৬৫ টাকা। অর্থাৎ, আজ রুপার দাম বেড়েছে ভরিপ্রতি ৩৫১ টাকা।

বাজুস বলছে, দেশের বাজারে তেজাবি সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে মূলত বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় ৩১ মার্চ স্পট মার্কেটে সোনার দাম আউন্সপ্রতি প্রায় ২৯ ডলার বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম এখন প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৫৫ ডলার। শনিবার যখন শেষবার মূল্য বৃদ্ধি করা হয়, তখন দাম ছিল ৪ হাজার ৪৯৪ ডলার। অর্থাৎ, এর মধ্যে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৬১ ডলার বেড়েছে।

তবে গত ৩০ দিনে বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমেছে। এই সময় সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৭৬৯ ডলার কমেছে। সে কারণে ১২ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত সোনার দাম ভরিতে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার ৫৭৫ টাকা কমানো হয়েছে। এরপর বিশ্ববাজারে দাম আবার বাড়ার কারণে ২৮ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত তিন দফায় সোনার দাম ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বাড়ল।

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা ক্রয় বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ের অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে সোনার দামে অনেক দিন ধরেই ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

অর্থাৎ, সোনার দাম এখন ঐতিহাসিকভাবে অনেকটাই বেশি। সে কারণে দেখা যাচ্ছে, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সোনার দাম কমেছে। তার সঙ্গে আছে ডলারের শক্তিবৃদ্ধি। ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন।

সাধারণত সোনা ও ডলারের দাম একসঙ্গে বৃদ্ধি পায় না। এ দুটোর সম্পর্ক বিপরীতমুখী, তবে কখনো কখনো ব্যতিক্রম দেখা যায়। এখন সে রকম কিছু দেখা যাচ্ছে না।

গত জানুয়ারিতে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এর প্রভাবে দেশের বাজারে গত ২৯ জানুয়ারি সোনার দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায়। দেশের ইতিহাসে এটাই সোনার সর্বোচ্চ দাম।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের ব্যাংকঋণ অর্ধলক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত জুলাই-ডিসেম্বর শেষে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তার অর্ধেকের বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত রোববার রাতে সরকারের ব্যাংকঋণের সর্বশেষ এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের পরিমাণও প্রকাশ করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। এই খাত থেকে পুরো অর্থবছরে ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস সরকারের দায়িত্বে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে এই ছয় মাসে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নেওয়া ঋণের পুরোটাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে। ওই সময় সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি মন্থর ছিল। ফলে উন্নয়নের চেয়ে ঋণের বড় অংশই খরচ হয়েছে সরকারের পরিচালন ব্যয় বাবদ।

* সরকারের ব্যাংকঋণ আগের অর্থবছরের চেয়ে বেড়ে আট গুণ হয়েছে। * ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে ঋণ কমেছে সরকারের। * ব্যাংক ও আর্থিক খাত মিলিয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকার ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছে, তা আগের অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় প্রায় আট গুণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে যা আট গুণ বেড়ে অর্ধলক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ আট গুণ বাড়লেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে ঋণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আর্থিক খাত থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের ঋণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা কমেছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ এখন মূলত ব্যাংকনির্ভর। একসময় সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিত। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। এ কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে খুব বেশি ঋণ নিতে পারছে না সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের বদলে উচ্চ সুদে বিভিন্ন ধরনের বিল-বন্ড বিক্রি করে ঋণ নিচ্ছে সরকার। ভালো সুদ পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যক্তি শ্রেণির সাধারণ মানুষও সরকারি-বিল বন্ডে বিনিয়োগ করছেন।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এ কারণে সরকারি ব্যাংকঋণ বাড়লেও তাতে বেসরকারি খাত খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। কিন্তু বিনিয়োগে গতি ফিরলে সরকারের ব্যাংকঋণ বেসরকারি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করবে। কারণ, বেসরকারি খাত তখন চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকঋণ পাবে না।

চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক ও আর্থিক খাত মিলিয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। সেই হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বিশ্ববাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিমাসের মতো জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারিত হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ)। তবে উদ্ভুত পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী।

সোমবার (৩০ মার্চ) সচিবালয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি জানান, ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারের কাছে ১ লাখ ৩৩ হাজার আর এপ্রিলে আসছে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল। তাই এ নিয়ে এপ্রিলেও সংকট হবে না। অকটেন-পেট্রোলের ব্যবহার খুবই কম বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

জ্বালানি বিভাগের দাবি, দেশের মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশ ডিজেল। কৃষিতে সেচ ও গণপরিবহণে ব্যবহৃত হয় এই জ্বালানি।

জ্বালানি বিভাগের মূখপাত্র আরও জানান, সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, অফিস সময় কমানো, অনলাইন ক্লাসের মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী নানা কর্মসূচি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছে সরকার।

 

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালিতে অচল অবস্থা বিরাজ করায় তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। তবে, এমন পরিস্থিতিতেও এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভালোভাবেই সচল আছে বাংলাদেশে। একের পর এক জ্বালানিবাহী জাহাজ ভিড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। শুধু গত ২৫ দিনেই ভিড়েছে জ্বালানি তেল ভর্তি ৩০টি জাহাজ। 

শুধু তাই নয়, আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে এই বন্দরে ভিড়বে আরও ছয়টি জাহাজ; যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, গত এক মাসে ৩০টি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে ভিড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর গত ৩ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এসব জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে ২৭টি জাহাজ ইতোমধ্যে জ্বালানি খালাস করে ফিরে গেছে। বর্তমানে দুটি থেকে খালাস কার্যক্রম চলছে। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ছয়টি জাহাজ বন্দরে ভিড়বে। এসব জাহাজের মধ্যে তিনটিতে এলএনজি, দুটিতে গ্যাস অয়েল এবং একটিতে এলপিজি আসছে।

এদিকে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের জাহাজ চলাচলে অভয় দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এই জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এই বন্ধুতালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। 

বন্দর সূত্রে জানিয়েছে, ৩ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত আসা জাহাজগুলোর মধ্যে ছয়টিতে এলএনজি এসেছে। এর মধ্যে পাঁচটি এসেছে কাতার থেকে এবং একটি এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। এলপিজি নিয়ে এসেছে আটটি। এর মধ্যে তিনটি এসেছে মালয়েশিয়া, দুটি ওমান, দুটি এসেছে ভারত থেকে এবং একটি এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। বাকি ১৬টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটিতে গ্যাস অয়েল আনা হয়েছে। যার মধ্যে দুটি সিঙ্গাপুর, দুটি মালয়েশিয়া এবং একটি ভারত থেকে এসেছে। আরও চারটি জাহাজে হাই সালফার ফুয়েল এসেছে, যার সবগুলোই সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করা হয়েছে।

অবশ্য, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ক্রুড অয়েল আমদানি নিয়ে। দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১ থেকে দেড় লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়, যা দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কিন্তু, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চ মাসে নির্ধারিত দুটি জাহাজের একটিও এখনও বন্দরে পৌঁছায়নি। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাহাজে করে ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়েছিল। এরপর আর কোনও চালান দেশে আসেনি।

তবে, বাংলাদেশ অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।

 

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে এই শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

বিষয়টি হলো, উপসাগরীয় এলাকায় একাধিক দেশের ডেটা অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম অনেকটাই বিনষ্ট করে দিয়েছে তেহরান। ডেটা সেন্টারের প্রাত্যহিক কাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।

এক দিকে তেলের দাম বাড়তি, অপর দিকে তার জোগানও কম—এই দুই চাপে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হচ্ছে এআই–শিল্পকে। ডেটা সেন্টার চালানোর ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় কিছু সেন্টার হয় বন্ধ করে দিতে হয়েছে, না হয় এসব কেন্দ্রের কাজকর্মের রাশ টানতে হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর চিপের জন্য অতি প্রয়োজনীয় হিলিয়াম–অ্যালুমিনিয়াম, ব্রোমিনসহ একাধিক কাঁচামালের সরবরাহ সংকট। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বজুড়ে এর অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারী। কিন্তু গত এক মাসে হরমুজ প্রণালি একরকম বন্ধ থাকায় সরবরাহব্যবস্থা যেভাবে ধাক্কা খেয়েছে, তাতে আগামী বেশ কয়েক মাস এআই চিপ তৈরির পরিকল্পনা নতুন করে করতে হচ্ছে।

হিলিয়ামের ব্যবহার ও উৎপাদন

চিপ উৎপাদনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে, যেমন শীতলীকরণ, ছিদ্র শনাক্তকরণ ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া নিখুঁত করতে হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট শুরুর পর থেকে এই গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াকরণের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম উৎপাদিত হয়। এর উৎপাদন ভৌগোলিকভাবে খুবই সীমিত কয়েকটি অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় এক–তৃতীয়াংশই কাতার থেকে আসে।

সরবরাহব্যবস্থা–বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিডাল ওয়েভ সলিউশনসের জ্যেষ্ঠ অংশীদার ক্যামেরন জনসন রয়টার্সকে বলেন, ‘হিলিয়ামের ঘাটতি নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়।’ চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত শিল্প খাতের অন্যতম বৃহৎ বার্ষিক আয়োজন ‘সেমিকন চায়না’ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

ক্যামেরন আরও বলেন, আপাতত উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া কোম্পানিগুলোর উপায় নেই। অনেকেই আশা করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে।

জনসনের ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দেখা দিলে তাঁর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে অটোমোবাইল—বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর উপাদান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভিএটির চীন শাখার বিক্রয়প্রধান জেরি ঝ্যাং বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হিলিয়ামের সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁর প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য কোম্পানির উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তিনি জানান, পরিবহন বিলম্বে পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।

জেরি আরও বলেন, বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও সরবরাহ আনার উদ্যোগ রয়েছে।

সংবাদে বলা হয়েছে, এই বিঘ্ন কেবল হিলিয়ামেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক বিস্তৃত সরবরাহের শৃঙ্খলে তা ছড়িয়ে পড়ছে। মাইক্রোনিকের এমআরএসআই ইউনিটের ঝৌ লিমিন জানান, ইসরায়েল থেকে সংগ্রহ করা কিছু কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিয়েছে। ফলে সরবরাহের সময় বাড়ছে। শেষমেশ তার প্রভাব পড়ছে গ্রাহকদের ওপর।

ঝৌ বলেন, স্বল্প মেয়াদে যে এআই খাতে প্রভাব পড়েছে, তা পরিষ্কার। এদিকে ফরাসি শিল্প গ্যাস কোম্পানি এয়ার লিকুইডের এক শীর্ষ কর্মকর্তা গত বুধবার স্বল্প মেয়াদে হিলিয়ামের ঘাটতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

কোন খাতে হিলিয়ামের কত ব্যবহার

হিলিয়ামের খাতভিত্তিক ব্যবহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ—প্রায় ২২ শতাংশ ব্যয় হয় বিশ্লেষণাত্মক, প্রকৌশল, গবেষণাগার ও বৈজ্ঞানিক কাজে। অর্থাৎ এটি কেবল সাধারণ গ্যাস নয়; বরং আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তির জ্বালানি।

এরপরেই রয়েছে ফাইবার অপটিকস ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, যেখানে ব্যবহৃত হয় ১৭ শতাংশ। আরও ১৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গ্যাস উত্তোলনের কাজে। স্বাস্থ্য খাতেও হিলিয়ামের গুরুত্ব কম নয়। এমআরআই স্ক্যান পরিচালনায় ব্যবহৃত হয় মোট সরবরাহের ১৫ শতাংশ। এরপর মহাকাশ খাত। এই খাতে ব্যবহৃত হয় মোট হিলিয়ামের ৯ শতাংশ, বিশেষ করে রকেট প্রযুক্তিতে।

শিল্পকারখানায়ও এর ব্যবহার আছে, যদিও তুলনামূলকভাবে কম। ওয়েল্ডিংয়ে ব্যবহৃত হয় ৮ শতাংশ হিলিয়াম, ডাইভিং ও ছিদ্র শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয় ৫ শতাংশ করে। বাকি ২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় অন্যান্য খাতে।

চট্টগ্রাম

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব