এমবাপ্পের রেকর্ডের জাদু

ফ্রান্স ৩ : ১ সেনেগাল

নিউ জার্সিতে প্রথমার্ধে খুঁজে পাওয়া না যাওয়া ফ্রান্সকে দ্বিতীয়ার্ধে দারুণভাবে ম্যাচে ফেরালেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৬৬ মিনিটে ফ্রান্সের হয়ে এবারের বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন অধিনায়ক এমবাপ্পে। এর ফলে ফ্রান্সের হয়ে সর্বোচ্চ গোলে অলিভিয়ের জিরুর পাশে বসেন এই রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড। দুজনের গোল তখন ৫৭। তবে যোগ করা সময়ের ৬ মিনিটে জিরুকে পেছনে ফেলে এককভাবে শীর্ষে উঠেন এমবাপ্পে (৫৮ গোল)। বক্সের বাইরে থেকে অবিশ্বাস্য এক শটে গোল করেন ২০১৮ আসরে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোল এখন ১৪। এমবাপ্পের রেকর্ডের আগে ফ্রান্সের গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। আর সেনেগালের হয়ে এক গোল শোধ করেন ইব্রাহিমা এমবায়ে।

এমবাপ্পের রেকর্ড গড়া গোল

এমব্বাপের রেকর্ড গড়া গোলে সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্স এগিয়ে গেল ৩–১ গোলে। যোগ করা সময়ের ৫ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে অবিশ্বাস্য এক শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই ফরাসি তারকা। এই গোলে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ গোলদাতা মুকুটও পরলেন এমবাপ্পে। অলিভিয়ের জিরুর ৫৭ গোল ছাড়িয়ে এমবাপ্পের গোল এখন ৫৮। বিশ্বকাপে তাঁর গোল ১৪।

সেনেগালের গোল শোধ

এক গোল শোধ করেছে সেনেগাল। সেনেগালের হয়ে যোগ করা সময়ের ৫ম মিনিটে গোলটি করেছেন ইব্রাহিমা এমবায়ে।

মাঠে নামার আগেই মারামারি

বিশ্বকাপের মাঠের উত্তাপ এবার ছড়াল নিউইয়র্কের রাস্তায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার আগেই মারামারিতে জড়ালেন আর্জেন্টিনা ও আলজেরিয়ার সমর্থকেরা। আজ নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটনের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি পরা একদল সমর্থকের সঙ্গে আলজেরিয়ার জার্সি পরিহিত সমর্থকদের ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি হচ্ছে। ‘ব্রুট অফিশিয়াল’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রথম শেয়ার করা হয়, যা পরে দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়।

ম্যাচের সময় তখন ২৩ মিনিট, হুট করেই রেফারির লম্বা বাঁশি। ম্যাচ থামিয়ে দুই দলই বাধ্য ছেলের মতো হাঁটা ধরল নিজ নিজ ডাগআউটে।

বিশ্বকাপের প্রথম কয়েক ম্যাচে এই দৃশ্য একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে ধরা দিয়েছে। দুই অর্ধে দুবার ম্যাচ থামিয়ে দেওয়া হয় পানি খাওয়ার বিরতি। ফিফার আনুষ্ঠানিক ভাষায়, ‘হাইড্রেশন ব্রেক’।

মেক্সিকো-যুক্তরাস্ট্র-কানাডা বিশ্বকাপে অতিরিক্ত গরমে যাতে কোনো খেলোয়াড় অসুস্থ না হয়ে পড়েন, তাই দুই অর্ধের মাঝখানে ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে হাজির হয়েছে ফিফা।

আপাতদৃষ্টিতে হাইড্রেশন ব্রেকের বুদ্ধিটা বেশ জুতসই। কেনই–বা হবে না? বেশির ভাগ ইউরোপিয়ান দলই সাধারণত ম্যাচ খেলে ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে।

পুরো বছর খেলা চললেও গ্রীষ্মকালটা হয়ে থাকে খেলোয়াড়দের জন্য অফুরন্ত এক ছুটির সময়। ইউরোপের উষ্ণ দিনগুলোতে তাই ফুটবলারদের আরাম-আয়েশেই সময় কাটে।

কিন্তু বিশ্বকাপ তো ভিন্ন এক গল্প। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যেমন তাপমাত্রা এক নয়, তেমনি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতাও এক নয়। গ্রীষ্মের কড়া রোদে খেলোয়াড়দের সক্ষমতাও কমে আসে অনেকখানি।

যুক্তরাষ্ট্রে নরওয়ের প্রথম অনুশীলনের দিনই দেখা মিলেছে সেই দৃশ্যের। মাঠে ঠিকমতো অনুশীলনের আগেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন আর্লিং হলান্ড, মার্টিন ওডেগার্ডরা।

হাইড্রেশন ব্রেক হাজির হয়েছিল সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে। প্রতি অর্ধে দুই দলকে দেওয়া হবে তিন মিনিটের একটা ছোট্ট বিরতি। আর সেই বিরতিতে সবাই যেমন পানি পান করে একটু জিরিয়ে নিতে পারবে, তেমনি খেলাটা নতুন করে প্রাণও ফিরে পাবে।

ফুটবল মাঠে এমন ‘কুলিং ব্রেক’ বা ‘ড্রিংকস ব্রেক’ নতুন কিছু নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপেও দেখা গিয়েছে সেই নিয়ম। কিন্তু সেটা দেওয়া হতো ব্রাজিলের অতিরিক্ত গরম সামলাতে, শুধু দিনের বেলার খেলাগুলোতে। কাতারেও দিনের খেলায় দেখা গিয়েছে কুলিং ব্রেক।

কিন্তু এই বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ একেবারে বাধ্যতামূলক। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই দুই অর্ধ মিলিয়ে থাকবে ৩ মিনিট করে বাধ্যতামূলক ৬ মিনিটের বিরতি। সেটা দিনে হোক কিংবা রাতে। মাঠ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হোক কিংবা না হোক, বিরতি থাকবেই।

এই বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ একেবারে বাধ্যতামূলক
এই বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ একেবারে বাধ্যতামূলক, এএফপি
 

তবে সে বিরতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান ফুটবলাররা নন, বরং বিজ্ঞাপনদাতারাই হচ্ছে। কারণ, ম্যাচে রেফারির বাঁশি বাজতে দেরি, টিভি সম্প্রচার চলে যায় বিজ্ঞাপনে।
ফুটবল ম্যাচ এমনিতেই বিজ্ঞাপনহীন এক খেলা।

ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ একেবারে আসে মাত্র একবার। দুই অর্ধের মাঝখানে খুব একটা সময়ও পাওয়া যায় না, কারণ বিশ্লেষকদের চুলচেরা বিশ্লেষণের অপেক্ষায়ও থাকেন দর্শকেরা।

এই সময়টা নিয়েই অনেকটা সময় ধরে আপত্তি তুলেছিল আমেরিকান ব্রডকাস্টাররা। যেকোনোভাবেই হোক না কেন, ফুটবলকে একধরনের ‘আমেরিকানাইজেশন’-এর মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল অনেকের। আর সেটাই যেন পূর্ণতা পেয়েছে প্রতি অর্ধে ৩ মিনিটের ‘ছোট্ট’ হাইড্রেশন ব্রেকে।

মার্কিন মুকুলের খেলাগুলোতে বিরতি থাকে অনেক। ৮০ মিনিটের রাগবি ম্যাচ শেষ হয় না সাড়ে তিন ঘণ্টাতেও। বাস্কেটবল, বেসবলেও থাকে বিরতির ছড়াছড়ি। পুরো ম্যাচজুড়ে ব্রডকাস্টাররা চান দর্শকদের সঙ্গে থাকার। কারণ যত বেশি বিরতি, তত বেশি বাড়ে দর্শকদের বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ।

বিরতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান ফুটবলাররা নন, বরং বিজ্ঞাপনদাতারাই
বিরতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান ফুটবলাররা নন, বরং বিজ্ঞাপনদাতারাই, এএফপি
 

এক সুপার বোল ফাইনালে ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকায়। সেই পদ্ধতি যদি ফুটবলেও কোনোভাবে প্রবেশ করানো যায়, তাহলে তো অর্থের ছড়াছড়ি। কারণ, আমেরিকান খেলার তুলনায় ফুটবলের দর্শক অনেক গুণ বেশি।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচকে যদি চার ভাগে ভাগ করা হয়, ১০৪ ম্যাচে ২০৮টি ব্রেক এমনিতেই চলে আসে। গুঞ্জন আছে, এই বিরতির বিজ্ঞাপনের দাম ফাইনাল আসতে আসতে পৌঁছে যাবে কোটির ঘরে। সে জন্যই হয়তো ম্যাচে ছোট্ট করে বিরতি প্রবেশ করানো।

বিজ্ঞাপনদাতাদের চোখে যখন টাকার খেলা, তখন ফুটবল ভক্তদের মনে বিরক্তির শেষ নেই। কারণ, তিন মিনিটের বিরতি বদলে দেয় খেলার রেশ। ব্রাজিল-মরক্কো খেলাতেই যেমন। যেই না মরক্কো এক গোল দিয়ে ম্যাচের মোমেন্টাম হাতে পেয়েছে, অমনি একটা বিরতি বদলে দিল ম্যাচের চিত্র।

ব্রাজিলের দিশাহারা ডিফেন্স যেন পেল গুছিয়ে নেওয়ার সময়। জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচেও একই ঘটনা, বিশ্বকাপে প্রথমবার আসা সবচেয়ে ছোট্ট দেশটা প্রথম গোলের উদ্‌যাপন ঠিকঠাক করতেও পারেনি, টিভিতে দেখা দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞাপন। মিনিট দশেকের জন্য যেই না জার্মানির টুটি চেপে ধরেছিল কুরাসাও, সেটাও শেষ হয়ে গিয়েছিল হাইড্রেশন ব্রেকে।

কাতারেও দিনের খেলায় দেখা গিয়েছে কুলিং ব্রেক
কাতারেও দিনের খেলায় দেখা গিয়েছে কুলিং ব্রেক, বিবিসি
 

মজার ব্যাপার হলো, বিরতির দৈর্ঘ্য কিন্তু ঘড়িতে মাপা নয়, বরং বিরতি মাপা হয় টিভি ব্রডকাস্টারদের সৌজন্যে। যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচেই দেখা মিলেছে সেই দৃশ্যে। হাতে আইপ্যাড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ফক্স স্পোর্টসের কেউ একজন, সঙ্গে চতুর্থ রেফারি। মাঠে রেফারি আর খেলোয়াড়েরা তৈরি থাকলেও ম্যাচ শুরু হয়নি, কারণ টিভিতে তখনো বিজ্ঞাপনের বিরতি!

জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচেও জার্মানি মাঠে ফিরেছিল দেড় মিনিটের মাথায়। তাদের চিন্তা তখন ম্যাচে ফেরার। অথচ রেফারি সাফ জানিয়ে দিলেন ৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের বিরতি শেষ না হলে, ম্যাচ শুরু করার এখতিয়ার নেই তাঁর। হলোই তাই, তিন মিনিট শেষ করে টিভিতে শুরু হলো ম্যাচ। ততক্ষণে কুরাসাও হারিয়ে ফেলেছে পুরোনো ধার। জার্মানি ফিরে এসেছে খেলায়।

জার্মান কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের ব্যাখাটাই বোধ হয় সবচেয়ে মানানসই। ‘খেলোয়াড়দের ভালো থাকার কথা বলে বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। মাঝখান থেকে ফুটবল বন্দী হয়েছে এসি রুমে বসে থাকা কোট-টাই পরা এক্সিকিউটিভদের কাছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর কাছেও এই বিরতি কোনো কাজের বলে মনে হচ্ছে না, ‘যখন তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে, তখন এমন বিরতি মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই তো এমন বিরতির প্রয়োজন নেই।’

নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক বলেছেন, ‘টেলিভিশনে যাঁরা খেলা দেখছেন, সেই নিরপেক্ষ দর্শকদের জন্যও এটা সুখকর কিছু নয়। আমার মতে, প্রতিটি ম্যাচের আবহাওয়া আলাদাভাবে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

কোচ–খেলোয়াড়েরা তো বটেই, খোদ দর্শকদের কাছেও নেই বিরতির মূল্য। তাই তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ফিফাকে ধুয়ে ফেলার প্রতিযোগিতা। প্রতি ম্যাচেই বিরতি আসে আর দুই দফায় চলে ফিফার নিয়মের দফারফা।

ব্রডকাস্টাররাও তাই বেছে নিচ্ছেন অন্য উপায়। অনেক ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টাররা দেখাচ্ছে না কোনো বিজ্ঞাপন, ক্যামেরা থাকছে মাঠেই। খেলোয়াড়দের সঙ্গে, খেলার সঙ্গে। কারণ, ফুটবল মাঠে মুখ্য দিন শেষে ফুটবলই, ক্যামেরার চোখে ফুটবলারের কারিকুরির মূল্য দর্শকসারিতে হাজারও সেলিব্রিটির মুখ দেখিয়েও পূরণ করা সম্ভব না।

সম্ভব নয় কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বিক্রি করেও। সে কারণেই হয়তো ফিফার দর্শক বাড়ানোর ফন্দি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সত্যিকারের দর্শক।

বিশ্বকাপের পঞ্চম ম্যাচ ডেতে খেলেছে ৮টি দল। প্রায় প্রতিটি ম্যাচে দলগুলোর র‍্যাঙ্কিং পার্থক্য বড়সড় থাকলেও ফলে তা ফুটে ওঠেনি। সব ম্যাচই ড্র হয়েছে। এর মধ্যে নবাগত কেপ ভার্দের সঙ্গে স্পেন কোনো গোলই করতে পারেনি। ইরান–নিউজিল্যান্ড ম্যাচে আবার দুই দলই ২টি করে গোল করেছে। আর বেলজিয়াম–মিসর ও সৌদি আরব–উরুগুয়ে ম্যাচে প্রতিটি দলই করেছে ১টি করে গোল।

এসব ম্যাচ ঘিরে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান দেখে নিতে পারেন।

৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেক

পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসের হয়ে খেলা ভোজিনিয়ার বয়স ৩ জুন ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এত বয়সে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। এর চেয়ে বেশি বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন মিসরের গোলরক্ষক এসাম এল-হাদারি। ২০১৮ বিশ্বকাপে অভিষেকের সময় তাঁর বয়স ছিল ৪৫ বছর ১৬১ দিন।

বেশি বয়সে অভিষেকের রেকর্ডে ভোজিনিয়া
বেশি বয়সে অভিষেকের রেকর্ডে ভোজিনিয়া, এএফপি

মাত্র একটি ফাউল

কেপ ভার্দের শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় প্রমাণ, স্পেনের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে তারা মাত্র একটি ফাউল করেছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর কোনো ম্যাচে একটি দলের এত কম ফাউল করার নজির নেই। ৩টি করে ফাউল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে কোস্টারিকা (২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে) ও জার্মানি (১৯৭৪ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে)।

৩০ মিনিট বলই ছুঁতে পারেননি ওয়াইরসাবাল

২০২৪ ইউরোর ফাইনালে গোল করেছিলেন মিকেল ওয়াইরসাবাল। ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে একবারও বল স্পর্শ করতে পারেননি। পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান অপটার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে এমন ঘটনা আর দেখা যায়নি।

ম্যাচের প্রথম আধা ঘণ্টায় বলই পাননি ওয়াইরসাবাল
ম্যাচের প্রথম আধা ঘণ্টায় বলই পাননি ওয়াইরসাবালরয়টার্স

পাস আছে, গোল নেই

বিশ্বকাপে স্পেন সর্বশেষ গোল করেছিল কাতার বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে ১১ মিনিটে আলভারো মোরাতার হেড থেকে এসেছিল গোলটি। এর পর থেকে বিশ্বকাপে স্পেন ৪৯টি শট নিয়েছে, প্রায় আড়াই হাজার পাস সম্পন্ন করেছে, কিন্তু একটিও গোল করতে পারেনি। সেবার জাপানের ম্যাচের পর তারা মরক্কোর বিপক্ষে শেষ ষোলোতে গোলশূন্য ড্র করে টাইব্রেকারে হেরেছিল। আর এবার ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু করেছে আরেকটি ০-০ ড্র দিয়ে।

দিন যায়, জয় আসে না

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচ না জিতে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় মিসরের অবস্থান দ্বিতীয়। বেলজিয়ামের সঙ্গে ১–১ ড্র করা দলটি এখন পর্যন্ত খেলেছে ৮ ম্যাচ। তাদের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেও কখনো জয়ের দেখা পায়নি শুধু হন্ডুরাস (৯ ম্যাচ)। আবার আজই ইরানের সঙ্গে ২–২ ড্র করা নিউজিল্যান্ড ৭ ম্যাচ খেলে এখনো জিততে পারেনি।

মিসরের খেলোয়াড়দের গোলের এই উদ্‌যাপন ম্যাচ শেষে জয়হীনতায় কিছুটা ম্লানই হয়েছে
মিসরের খেলোয়াড়দের গোলের এই উদ্‌যাপন ম্যাচ শেষে জয়হীনতায় কিছুটা ম্লানই হয়েছেরয়টার্স

শটের রেকর্ডে উরুগুয়ে

সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে ২২টি শট নিয়েছে, যা বিশ্বকাপের কোনো এক অর্ধে একটি দলের সর্বোচ্চ শটের রেকর্ডগুলোর একটি। এর চেয়ে বেশি ২৪টি শট নিয়েছিল পূর্ব জার্মানি ১৯৭৪ সালে চিলির বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে।

সালাহ যেখানে প্রথম

আজ ৩৪ বছরে পা দেওয়া মোহাম্মদ সালাহ নিজের জন্মদিনেই বিশ্বকাপে একটি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন (অ্যাসিস্ট)। জন্মদিনে বিশ্বকাপে গোল বা গোলে সহায়তা করা প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার তিনি।

উরুগুয়ে ১–১ সৌদি আরব

উরুগুয়ে নদীর জল বোধ হয় বেশ বাড়বে! ভিজবে সৌদি আরবের উষর মরুভূমিও। মানুষের চোখের জলে পৃথিবীর দুটি আলাদা মহাদেশের ভূখণ্ডে এমন অল্পস্বল্প পরিবর্তনের জন্য ‘দায়ী’ আসলে বিশ্বকাপ!

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম থেকে সেই ভেজা চোখের শুরু। তার আবার দুই রকম ভাষা। উরুগুয়ে জিততে না পারায় দক্ষিণ আমেরিকার সেই নদীতে জমেছে কষ্টের ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। সৌদির তপ্ত বালু ভিজেছে আক্ষেপমেশানো আনন্দাশ্রুতে। উরুগুয়ের বিপক্ষে জিততে জিততেও যে সৌদি আরবের জেতা হলো না!

সেই না হওয়াতে উরুগুয়ে নদীর পানি যতটুকু বাড়ার শঙ্কা ছিল, ততটুকু না বাড়লেও কয়েক ফোঁটা অশ্রু তো পড়েছেই। উরুগুয়ে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। ফিফা আয়োজিত অলিম্পিকে দুটি ফুটবল ইভেন্ট জেতায় জার্সিতে অবশ্য চার তারকা। সেই উরুগুয়ে কিনা ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৪৮ ধাপ পিছিয়ে থাকা সৌদির বিপক্ষে ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্তও পিছিয়ে ছিল ১–০ গোলে!

মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো ৮০ মিনিটে গোল করেছিলেন বলে রক্ষা। নইলে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের সীমানাচিহ্ন এঁকে দেওয়া উরুগুয়ে নদীতে অশ্রুর বানও নামতে পারত! ওপার থেকে সহমর্মিতা জানাতেন আর্জেন্টাইনরা। তাদের কষ্ট তো আরও বেশি। কাতারে চার বছর আগের বিশ্বকাপে এই সৌদি আরবের বিপক্ষেই প্রথম ম্যাচে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। উরুগুয়ের কষ্ট সে তুলনায় একটু কম। অন্তত ১–১ গোলের ড্রয়ে পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপটা শুরু করতে পারল।

আরাউহোর গোলের পর উরুগুয়ের উদ্‌যাপন
আরাউহোর গোলের পর উরুগুয়ের উদ্‌যাপন, এএফপি
 

বিশ্বকাপে এই রাতটাই ছিল কেমন ভয় ধরানো। প্রথমে তুমুল ফেবারিট স্পেনকে গোলশূন্য ব্যবধানে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে। তারপর ইউরোপে আরেক বড় দল বেলজিয়ামের বিপক্ষে জিততে জিততে শেষ পর্যন্ত ড্র করতে বাধ্য হয়েছে মিসর। সেই ম্যাচের পর মায়ামিতে রীতিমতো ভূমিকম্প হওয়ার দশা।

শেষ পর্যন্ত সেই কম্পনে উরুগুয়ের খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ‘ওয়ার্নিং বেল’ পেয়ে গেলেন বিয়েলসা। আদাজল খেয়ে সৌদি বক্সের ভেতরে পড়ে থেকে মুহুর্মুহু আক্রমণে ফেদে ভালভের্দেদের অর্জন মাত্র ১টি গোল।

বিয়েলসার আক্রমণভাগকে খুব বেশি দোষারোপের সুযোগও নেই অবশ্য। সৌদির গোলকিপার মোহাম্মদ আল–ওয়াইস ৯টি সেভ করেন। মরিয়া উরুগুয়েকে ঠেকাতে আল–ওয়াইসকে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সেভ করতে হয়েছে। কিন্তু পারেননি শুধু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ১১ মিনিট আগে। উড়ে আসা ক্রসে উরুগুয়ে ফরোয়ার্ড ফেদেরিকো ভিনাসের হেড ঠেকান সৌদি গোলকিপার। ফিরতি বলে আরাউহোর বাঁ পায়ের শট ঠেকানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

গোলের পর সৌদি আরবের উদ্‌যাপন
গোলের পর সৌদি আরবের উদ্‌যাপন, এএফপি
 

মাঠের অন্য প্রান্তে উরুগুয়ের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ফার্নান্দো মুসলেরাকে অত পরীক্ষা দিতে হয়নি। তবে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়েও থাকেননি। দুটি দারুণ সেভ করতে হয় মুসলেরাকে। কিন্তু ৪১ মিনিটে সৌদি ডিফেন্ডার আবদুলেলাহ আল–আমরির শটের জবাব ছিল না তাঁর কাছে। কর্নার থেকে হাসান আল–তাম্বাকতির হেড ঠেকান মুসলেরা। ফিরতি বলে আল–আমরির শট পৌঁঁছেছে জালে। ২টি গোলই হয়েছে গোলকিপার ঠেকানোর পর ফিরতি বলে।

সৌদি আরব কতটা মরিয়া হয়ে খেলেছে, সেটার একটি প্রমাণ দেবে পরিসংখ্যান। উরুগুয়ের বিপক্ষে ২১ বার বাতাসে ভাসা বল (এরিয়াল ডুয়েল) দখল করেছে তারা। উরুগুয়ে সেখানে পিছিয়ে (২০)। দক্ষিণ আমেরিকান দেশটির অবস্থা হয়েছিল স্পেনের মতো। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল পেতে ২৭টি শট নিয়েও পারেনি স্পেন। ফেদে ভালভের্দেরাও সমান ২৭টি শটের পরিশ্রমে একটি গোল তুলে নিয়ে উরুগুয়ে নদীর জল আর বাড়তে দেননি। একটি শট পোস্টে লাগায় তারা দুষতে পারেন দুর্ভাগ্যকেও।

তাতে অবশ্য সৌদি আরবের লড়াইয়ের মানহানি ঘটে না এতটুকুও; বরং আবারও বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে অঘটন ঘটানোর খুব কাছে গিয়েও ড্রয়ের আক্ষেপে তপ্ত বালুতে দু–এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিতে পারেন দেশটির কেউ কেউ।

‘এইচ’ গ্রুপ এখন পুরো উন্মুক্ত। চারটি দলের সবারই সংগ্রহ ১ পয়েন্ট। জায়গাটা যুক্তরাষ্ট্র বলেই সম্ভবত এবার গ্রুপ পর্ব পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নটা আরও বেশি করে দেখছে সৌদি আরব। বিশ্বকাপে এর আগে ছয়বার খেলে তারা একবারই গ্রুপ পর্ব পেরোতে পেরেছে—১৯৯৪ বিশ্বকাপ এবং সেবারও আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এশিয়া মহাদেশের মান রাখায় আরও এক সাফল্যের পালক যোগ করতে পেরেছে সৌদি আরব। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) অধিভুক্ত দেশগুলো চলতি বিশ্বকাপে এখনো হারেনি। দুই জয় ও তিন ড্র। ওদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশনের (কনমেবল) অধিভুক্ত দেশগুলোর কেউ এখনো জয়ের দেখা পায়নি।

ফুটবল ইতিহাসে ধারে–ভারে এ দুই ভুখণ্ডের মধ্যে কোন মহাদেশ যেন এগিয়ে?

যাকগে সে কথা। বরং নদীর গল্প হোক। সৌদি আরবে কোনো প্রাকৃতিক নদী নেই। স্থায়ী কিংবা প্রাকৃতিক নদীহীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব। ওদিকে উরুগুয়ের নামকরণ উরুগুয়ে নদীর নামে। যে নদীর নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে সেই মহাদেশের আদিবাসী গুয়ারানিদের দেওয়া ‘উরু’ নামের এক কোয়েল পাখি। সেই নদীর জল বাড়ুক আর না বাড়ুক, জয় না পাওয়ায় সৌদির তপ্ত বালুতে যে একটু আক্ষেপ মিশে রইবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

যেমন সন্দেহ নেই, সৌদির ভীষণ শুষ্ক মাটিতে আজ আরেকটু হলেই আছাড় খেয়ে সেই ‘কোয়েল’ পাখির ‘প্রাণনাশ’ ঘটত!

ইরান ২:২ নিউজিল্যান্ড

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ইরানের অবস্থান ২৩-এ, নিউজিল্যান্ড ৮২-তে।

তবে বিশ্বকাপে আজ দুই দলের ম্যাচে র‍্যাঙ্কিংয়ের সেই ব্যবধান টেরই পাওয়া যায়নি। বরং দুই দফায় ম্যাচে এগিয়ে গিয়ে নিউজিল্যান্ডই জয়ের সম্ভাবনা বেশি জাগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইরানের মুহুর্মুহু আক্রমণের মুখে নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে পারেনি। ম্যাচ শেষ হয়েছে ২-২ সমতায়।

এবারের আগে ১৯৮২ ও ২০১০ বিশ্বকাপে খেলেছিল নিউজিল্যান্ড। প্রথমবার তিন ম্যাচে হারলেও পরেরবার তিনটিতেই ড্র করেছিল দলটি। এক যুগ পর বিশ্বমঞ্চে আবারও মাঠ ছাড়ল প্রথম জয়ের অপেক্ষা নিয়েই।

লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের ম্যাচটিতে প্রায় সব আলোচনা ছিল ইরান দলকে নিয়েই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা, ফেডারেশন সভাপতিসহ কয়েকজনের ভিসা না পাওয়া, বেজক্যাম্প মেক্সিকোয় সরিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচের আগের দিন পা রাখাসহ প্রায় সব আলোচনাই ছিল ফুটবলের বাইরের।

আজ ম্যাচের দিনও সোফাই স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন একদল ইরানি প্রবাসী, যাঁরা দেশটির বর্তমান শাসনকাঠামোর বিরোধী। এমনকি খেলা শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে ইরানের জাতীয় সংগীতের সময় দুয়োও দিয়েছে গ্যালারির একাংশ।
সব ছাপিয়ে খেলা যখন শুরু হলো, তখন ইরানের খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জ ছিল পারফরম্যান্স দিয়ে বাকি সবকিছুকে ভুলিয়ে দেওয়ার। তবে সেখানেও তাদের চাপেই রেখেছে র‍্যাঙ্কিংয়ে ৫৯ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ড।

ওশেনিয়া থেকে উঠে আসা দলটি ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই এগিয়ে যায়। ক্রিস উডের বাড়ানো বল জোরালো হাফ ভলিতে জালে পাঠান এলিজা জাস্ট। ইরান ম্যাচে গতি খুঁজে পায় ডিহাইড্রেশন বিরতির পর। ৩২ মিনিটে দলটিকে সমতায় ফেরান রামিন রেজাইয়ান।

এর আগে মেহদি তারেমির বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
দ্বিতীয়ার্ধেও প্রথম গোলটি নিউজিল্যান্ডই করে। এবারও উডের কাছ থেকে পাওয়া ইরানের গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে জালে পাঠান জাস্ট।

৫৪ মিনিটে ২-১ গোলে পিছিয়ে যাওয়ার ১০ মিনিট পর আবারও সমতায় ফেরে ইরান। এবার রেজাইয়ানের ক্রস থেকে নিখুঁত হেডে বল জালে পাঠান মোহাম্মদ মোহেবি।

কোনাকুনি হেডে বল পোস্টের ভেতরের অংশে লেগে জালে ঢোকে। ম্যাচের বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় ২-২ সমতা নিয়েই মাঠ ছাড়ে দুই দল।
গ্রুপ পর্বে ইরানের পরের ম্যাচ ২১ জুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে। পরদিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিপক্ষ মিসর।

বেলজিয়ামকে রুখে দিল মিসর

সিয়াটল স্টেডিয়ামে বেলজিয়াম–মিসর ম্যাচ ১–১ গোলে ড্র হয়েছে। ১৯ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে মোহাম্মদ সালাহর সহায়তায় মিসরকে এগিয়ে দেন ইমাম আশুর। ৬৬ মিনিটে মিসর ডিফেন্ডার মোহাম্মদ হানির আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। ‘জি’ গ্রুপে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ১ পয়েন্ট করে পেল দুই দল।

মিসরের বিপক্ষে অবশেষে সমতা ফেরাল বেলজিয়াম

মাঠে নেমেই বেলজিয়ামের সমতাসূচক গোলের উপলক্ষ হলেন রোমেলু লুকাকু। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে লুকাকুকে ঠেকাতে গিয়ে নিজেদের জালে বল জড়ান মিসরীয় ডিফেন্ডার মোহাম্মদ হানি। এটি চলতি বিশ্বকাপের তৃতীয় আত্মঘাতী গোল।

অবিশ্বাস্য, বিখ্যাত এক ড্র কেপ ভার্দের!

এটাই কি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ড্র? স্পেনের খেলোয়াড়দের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না! কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের চোখে অশ্রু। আহা! বিশ্বকাপের এই তো মজা!

এবার বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ব্যবধানে রুখে দিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসে জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ (৫ লাখ ২৫ হাজার) কেপ ভার্দে! সেটাও বিশ্বকাপে তাদের অভিষেক ম্যাচে!

কেপ ভার্দে গোলকিপার ভোজিনিয়ার চোখে অশ্রুর বান। দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা উৎসবের এই লগ্ন নেমেছে তাঁর হাতে ভর করে। ৭টি দারুণ সেভ করেছেন ম্যাচে।

তারকাখচিত স্পেন, সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন—৮০১টি পাস খেলেও ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৪ তম কেপ ভার্দের জালে বল পাঠাতে পারেনি!

কেপ ভার্দে ৬টি শট নিতে পেরেছে। পোস্টে রাখতে পেরেছে মাত্র একটি। বেশির ভাগ সময়ই পাঁচজনের ব্যাকলাইন নিয়ে রক্ষণ সামলেছে। কখনো কখনো একজন মিডফিল্ডার নিচে নামিয়েও ছয়জন মিলে ডিফেন্স করেছে।

স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট কাড়ার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন
স্পেনের কাছ থেকে পয়েন্ট কাড়ার পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন, এএফপি
 

স্পেন যে চেষ্টা করেনি তা নয়, মরিয়া হয়েই খেলেছে। চোট থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে না ওঠা লামিনে ইয়ামালকে বাধ্য হয়ে বদলি নামিয়েছে। ২৭টি শট নিয়ে পোস্টে রাখতে পেরেছে ৭টি। কিন্তু গোলটা আর পাওয়া হয়নি। বল পোস্টেও লেগেছে।

পুরো ম্যাচে গোলের সুযোগ কম বের করেনি স্পেন। কিন্তু প্রায় সময়ই কেপ ভার্দের বক্সে ঢুকে কিংবা তার সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে ফেরান তোরেস, দানি ওলমো, ইয়ামালদের আক্রমণভাগ। কারণ? বুক চিতিয়ে লড়েছে কেপ ভার্দে। স্পেনের বেশির ভাগ শটের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন কেপ ভার্দের ডিফেন্ডাররা। তখন মনে হয়নি দুই দলের মধ্যে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬১ ধাপের ব্যবধান!

ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বল ধরে রেখেছে স্পেন।

গোলকিপার ভোজিনিয়ার বীরত্ব। কেপ ভার্দের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন
গোলকিপার ভোজিনিয়ার বীরত্ব। কেপ ভার্দের ইতিহাসে স্মরণীয় দিনওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ এক্স হ্যান্ডল

ইয়ামালকে ছাড়াই নামছে স্পেন

কেপ ভার্দের বিপক্ষে বিশ্বকাপে স্পেনের প্রথম ম্যাচের একাদশে নেই লামিনে ইয়ামাল। গত এপ্রিলে বার্সেলোনার হয়ে সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে ম্যাচের সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান। এরপর গত কয়েক সপ্তাহ মাঠের বাইরেই ছিলেন ইয়ামাল। তাঁর পুর্নবাসন প্রক্রিয়া এখনও শেষ না হওয়ায় এই ম্যাচের শুরু থেকে নেই ইয়ামাল।

স্পেনের প্রথম একাদশ গোলরক্ষক: ২৩–উনাই সিমন। ডিফেন্ডার: মার্কোস ইয়োরেন্তে, ১৪–এমেরিক লাপোর্ত ,২২–পাউ কুবারসি, ২৪–মার্ক কুকুরেয়া। মিডফিল্ডার: ৮– ফাবিয়ান রুইজ, ৯–গাভি, ১৬–রদ্রি, ২০–পেদ্রি। ফরোয়ার্ড: ৭–ফেরান তোরেস, ২১– মিকেল ওইয়ারসাবাল

আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৫৭০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে আছে ১০টি আগ্নেয় দ্বীপ। এই দ্বীপগুলোর সমন্বয়ে গঠিত কেপ ভার্দে, যার সরকারি নাম রিপাবলিক অব কাবো ভার্দে। ১৯৭৫ সালে পাঁচ শতাব্দীর বেশি সময়ের পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা পায় দেশটি। জনসংখ্যা ছয় লাখের কম।

আজ সেই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রই বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছে স্পেনের বিপক্ষে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা দলটিকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল আছে অনেকের। কেমন এই দল, কারা আছেন স্কোয়াডে, কী তাদের ফুটবল-ঐতিহ্য—চলুন জেনে নেওয়া যাক।

যেভাবে বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে

কেপ ভার্দে বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে। বাছাইপর্বের ‘ডি’ গ্রুপে ৮ ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে তারা।

তাদের চেয়ে ৪ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল ক্যামেরুন। জেনে রাখা ভালো, আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটবার বিশ্বকাপ খেলেছে ক্যামেরুনই। তাদের টপকে কেপ ভার্দে এখন বিশ্বকাপে।

[caption id="attachment_276476" align="alignnone" width="700"] তাদের জাতীয় দল অনেকটাই প্রবাসী ফুটবলার–নির্ভরএক্স[/caption]

দলটি আসলে কেমন

কেপ ভার্দের জাতীয় দল অনেকটাই প্রবাসী ফুটবলার–নির্ভর। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যার চেয়েও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা বেশি। সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় ফুটবল দলেও।

দেশের ঘরোয়া লিগে ১২টি ক্লাব থাকলেও বিশ্বকাপ স্কোয়াডে স্থানীয় লিগের একজন খেলোয়াড়ও নেই। ২৬ সদস্যের দলে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা ফুটবলার আছেন মাত্র একজন—ডিফেন্ডার লোগান কস্তা, যিনি স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালের হয়ে খেলেন।

বাকি খেলোয়াড়েরা ছড়িয়ে আছেন ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের লিগে। স্কোয়াডের সর্বোচ্চ ৭ জন খেলেন পর্তুগিজ ক্লাবে।

[caption id="attachment_276475" align="alignnone" width="705"] বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাদের অভিষেক ২০০৩ সালেএক্স[/caption]

দলের অধিনায়ক ও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রায়ান মেন্দেস। ১৬ বছর আগে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া ৩৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখনো আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা। আর ৩৯ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এখনো দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন।

কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো সাধারণত ৪-২-৩-১ কিংবা ৪-১-৪-১ ফরমেশনে দলকে খেলান। তাঁর কৌশলের মূল ভিত্তি হাই প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন এবং শারীরিক শক্তিনির্ভর ফুটবল।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা

কেপ ভার্দে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১৯৭৮ সালের ২৯ মে, গিনির বিপক্ষে। সেই ম্যাচে তারা ১–০ গোলে হেরে যায়। ১৯৮২ সালে গঠিত হয় কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন এবং ১৯৮৬ সালে দেশটি ফিফার সদস্যপদ পায়।

১৯৯২ সালে প্রথমবার আফ্রিকান নেশনস কাপের বাছাইপর্বে অংশ নেয় কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাদের অভিষেক ২০০৩ সালে।

 

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় ২০১৩ সালে, যখন আফ্রিকান নেশনস কাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০২৩ সালেও তারা একই কীর্তি গড়ে।

বর্তমানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে কেপ ভার্দের অবস্থান ৭০তম। তবে র‍্যাঙ্কিংয়ের চেয়ে বড় পরিচয়, তারা এখন বিশ্বকাপের নবাগত দল—যারা নিজেদের প্রথম উপস্থিতিতেই সবাইকে চমকে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

শুরুটা করেছিলেন ইয়াসিন আয়ারি, শেষটাও করলেন তিনিই।

২২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের জোড়া গোলের ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৫–১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে সুইডেন। অন্য তিনটি গোল করেছেন ভিক্টর ইয়োকেরেস, আলেকসান্দার ইসাক ও মাটিয়াস সভানবার্গ।

গোল উদ্‌যাপন
গোল উদ্‌যাপনএএফপি

জাপান যে কখনো হাল ছাড়ে না সেটা দেখা গেল আবারও!

ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও ৮৮ মিনিটে কামাদার গোলে শেষ পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২–২ গোলে ড্র করেছে জাপান।

প্রথমার্ধ গোলশূন্য ব্যবধানে শেষ হওয়ার পর চারটি গোলই হয়েছে পরের অর্ধে। ৫১ মিনিটে ডাচ অধিনায়ক ভার্জিন ফন ডাইকের গোল শোধ করেন জাপানের কেইতো নাকামুরা। ৬৪ মিনিটে সামারভিলের গোলে ডাচরা আবারও এগিয়ে গেলেও কামাদোর গোলে শেষ পর্যন্ত ১ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছেড়েছে এশিয়ার দলটি।

নেদারল্যান্ডস ২ : ২ জাপান 

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৮৯ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছে জাপান। জয়ের স্বপ্ন দেখা ডাচদের থমকে দিয়ে গোলটি করেছেন দাইচি কামাদা।