বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তেলের দাম একফোঁটাও বাড়ার সম্ভাবনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সোমবার (৯ মার্চ) ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। এরপর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কয়েকদিন বাজারে যে সংকট হয়েছে, এর কারণ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটা করেছে অনেকে। যে কারণে সাময়িকভাবে কিছু জায়গায় সরবরাহের চাপ তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, গত কয়েকদিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের সংকট বা লিটারে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রির খবর প্রকাশ হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য বসেছিলাম। বৈঠকে আমরা জানতে পেরেছি বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার প্রবণতার কারণে সাময়িকভাবে কিছু দোকানে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

বাণিজ্যমন্ত্রী নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরে বলেন, রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে দেখেছি রাস্তার পাশে বড় দোকানগুলোতে ভোজ্যতেল পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বোতলের গায়ে নির্ধারিত দামই লেখা আছে। তবে বাজারের ভেতরের একটি দোকানে সীমিত তেল মজুত রেখে প্রতি লিটারে দুই থেকে তিন টাকা বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল।

ভোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। বাজারে যেহেতু পণ্য আছে, তাই অযথা প্রতিযোগিতা করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে।

এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মতো ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও কোনো সংকট নেই। জ্বালানি তেল, গ্যাস বা ভোজ্যতেল- কোনোটিতেই সংকট নেই। তাই এসব পণ্যের সঙ্গে ‘সংকট’ শব্দটি যুক্ত করে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি না করার আহ্বান জানাচ্ছি।

মন্ত্রী আরও বলেন, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তেলের দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না প্রশ্নের জবাবে বলেন, তেলের দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না। ভোক্তারা নিশ্চিন্তে বাজার করতে পারেন।

বাজারে অনিয়ম হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার তদারকি করছে এবং জেলা প্রশাসনও নিয়মিত অভিযান চালাবে।

 

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার সাধারণ নাগরিকদের জন্য টাকার নতুন নোট ছাড়বে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এবার নতুন নোট ছাড়াই ঈদ করতে হবে বেশির ভাগ মানুষকে। শিশু–কিশোরদের হাতেও উঠবে না নতুন টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ঠিকই নতুন টাকার নোটের ব্যবস্থা করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক অভ্যন্তরীণ আদেশও জারি করেছে। গতকাল রোববার থেকে কর্মকর্তা–কর্মচারীরা নতুন নোট পেতে শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন উদ্যোগের সমালোচনা করছেন অনেক কর্মকর্তারা।

প্রতিবছর ঈদের সময় টাকার নতুন নোটের বেশ চাহিদা থাকে। ঈদ সালামি হিসেবে নতুন নোট বেশ জনপ্রিয়। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার বেচাকেনার অস্থায়ী দোকান আছে। মূলত ফুটপাতেই এ ব্যবসা বেশি চলে। ঈদের সময় ফুটপাতের এই ব্যবসা বেশ জমজমাট থাকে। কিন্তু কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ঈদের সময় নতুন নোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। অথচ এখন নিজেদের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য নতুন নোটের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন নোট দেওয়ার নির্দেশনা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন নোট দেওয়ার নির্দেশনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঈদের আগে নতুন টাকার নোট বাজারে ছাড়া থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরে এসেছে। তাই এবার ঈদের আগে নতুন টাকা ছাড়া হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কিছু কর্মকর্তা ব্যাংক খাতের সংস্কার চান, কিন্তু নিজেদের সংস্কার চান না। বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে সবাই একযোগে এর প্রতিবাদ করেন। নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে চান, কিন্তু নিজেরা ঠিকই নগদ টাকার ব্যবস্থা করে নেন।

কর্মকর্তা–কর্মচারীরা কে কত নিতে পারবেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা কে কত টাকার নতুন নোট নিতে পারবেন, তা নিয়ে ৩ মার্চ অফিস আদেশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস আদেশ অনুসারে, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রত্যেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ নতুন নোট নিতে পারবেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ৬৮ হাজার টাকার নতুন নোট নিতে পারবেন। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত চাহিদা অনুসারে নতুন নোট নিতে পারবেন কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।

প্রশ্ন উঠেছে, অনেক কর্মকর্তা–কর্মচারী বেতন–ভাতার চেয়ে বেশি নতুন নোট নিতে পারবেন। অনেকে মনে করেন, এই নতুন নোট অবৈধ উপায়ে লেনদেনের মাধ্যমে ফুটপাতের নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এলপি গ্যাসের সাড়ে ১২ কেজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড। তারা ৪১০ টাকা দাম বাড়িয়ে ১২৩৫ টাকা করার আবেদন করেছে। কারণ হিসেবে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি এলপিজির তুলনায় দাম কম থাকায় ক্রসফিলিং হচ্ছে।

বিষয়টি গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভুঁইয়া। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মূল্য নির্ধারণ কমিটির প্রস্তাবনার আলোকে আবেদন করা হয়েছে।

বিপিসির মালিকানাধীন বাংলাদেশ এলপি গ্যাস লিমিটেডের আগে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ১২.৫ কেজির দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা প্রস্তাব করেছিল। তখনো ক্রসফিলিং বন্ধ, ডিলার পর্যায়ে স্থানীয় পরিবহন, অপারেশন খরচ ও চার্জ বৃদ্ধির জন্য দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম বেড়ে ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলারে পৌঁছেছে।

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর পর এক দিনে এটিই তেলের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। এর আগে গত সপ্তাহে দাম ২৮ শতাংশ বেড়েছিল।

ইরানে যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরান পাল্টা জবাব দিচ্ছে। চলমান যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি ঘটল।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা জ্বালানি তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম বেড়ে ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলারে পৌঁছেছে।

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর পর এক দিনে এটিই তেলের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। এর আগে গত সপ্তাহে দাম ২৮ শতাংশ বেড়েছিল।

ইরানে যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরান পাল্টা জবাব দিচ্ছে। চলমান যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি ঘটল।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

দেশে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে সব ধরনের কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ১৪৩ শতাংশ। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল ২০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকার, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।

কার্ডের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার, লেনদেনের প্রবণতা ও বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়।

বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংক ও ১টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফসি) কার্ড সেবা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যাংক ডেবিট কার্ড সেবা দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি শেষে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে ৫ কোটি ১৮ লাখ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১১৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের আগস্ট শেষে দেশে সব ধরনের কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২২ লাখ, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বেড়ে হয় ৫ কোটি ৬৯ লাখ।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ব্যাংকের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা খরচ করেন গ্রাহকেরা। এর মধ্যে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট স্টোরেই লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা।

গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, এক-চতুর্থাংশের বেশি অর্থ খরচ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। এরপর বিদেশিদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ভারত, মোজাম্বিক, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও সৌদি আরবের নাগরিকেরা বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন ক্রেডিট কার্ডে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের পথে রয়েছে তেল ও গ্যাসবাহী একাধিক জাহাজ।

রোববার (৮ মার্চ) সকালে জ্বালানিবাহী ৮টি জাহাজ এসে নোঙর করে বন্দরে। জাহাজগুলো গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আগেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম এ তথ্য জানান।

এদিকে, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত শুক্রবার জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রওনা দেওয়া জাহাজ দেশে এলেও এর পরবর্তী জাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, দুবাইসহ বিভিন্ন বন্দরে আটকা পড়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আট অর্থনীতিবিদেরা। তাঁরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে তা এখনো পরিষ্কার না। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে। এ জন্য রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আজ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদেরা এই পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই তা গ্রাহক পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যোগ দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে এক সদস্যের পদত্যাগ ও অর্থনীতিবিদদের বিরোধিতার মুখে সেই সভাটি ভেস্তে যায়। এর মধ্যে ইরানে আমেরিকার হামলা ও পাল্টা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা বুঝতে দেশের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সভা করার উদ্যোগ নেন গভর্নর।

সভায় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে গভর্নরের পাশাপাশি চার ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়া হয় একটি কমিটি গঠন করতে, যারা সময়ে সময়ে দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত জানাবে। যাতে কোনো আতঙ্ক তৈরি না হয়।

সভায় আলোচনা হয় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে ডলার ও রিজার্ভের ওপর আবারও চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও ধাক্কা আসতে পারে। এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে সরকারের নীতি হলো দেশের বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা। এমন পরিস্থিতিতে কী ধরনের নীতি নেওয়া যায় ও সরকার কী ধরনের নীতি পারে, তা জানতে চাওয়া হয় অর্থনীতিবিদদের কাছে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, গভর্নর জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি সততার সঙ্গে কাজ করবেন। কোনো রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে বলেছেন।

সভায় উপস্থিত অর্থনীতিবিদেরা জানান, এখন যে বৈশ্বিক চাপের আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা এড়ানোর সুযোগ কম। কীভাবে কম ক্ষতি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বর্তমানে যে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) আছে, তা ধরে রাখতে হবে। রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করে আমদানি করা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আনা কঠিন হওয়া ব্রুনেই ও সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখনই তা ভোক্তা পর্যায়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।

তাঁরা আরও পরামর্শ দেন বিশ্বব্যাংকসহ যত বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নিতে হবে। তেলের আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বাড়তি ঋণের উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের যাতায়াতে সমস্যার কারণে প্রবাসী আয়ে ধাক্কা আসতে পারে। তবে যারা আয় পাঠাতে চায়, তাদের আনার ব্যবস্থাটা আরও মসৃণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদেরা পরামর্শ দেন, এখনো মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। আরও বেড়ে যাক এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সুদের হার কমাতে এখনই নীতি সুদহার কমানো ঠিক হবে না। এ জন্য যুদ্ধের পর পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যাতে চাহিদামতো ঋণ পায়, সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।

মধ‍্যপ্রাচ‍্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে গেছে। এতে দেশেও জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছে এবং বেশি বেশি তেল কিনছে। তাই ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

আজ শুক্রবার বিপিসির এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল।

স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ হতে আমদানি করতে হয়। বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যবস্থাপনা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্ত/বিলম্বিত হয়। চলমান বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হওয়ায় ভোক্তা/গ্রাহকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদার প্রবণতা লক্ষ্যে করা যাচ্ছে। অতিরিক্ত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ডিলারেরা বিগত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কিছু কিছু ভোক্তা ও ডিলার ফিলিং স্টেশন হতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন মর্মে খবর প্রকাশ হচ্ছে, যা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

জনগণের আতঙ্ক কমানোর লক্ষ্যের কথা জানিয়ে নির্দেশনায় বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য বিদেশ হতে আমদানি কার্যক্রম/সূচি নির্ধারিত রয়েছে। নিয়মিতভাবে চালান দেশে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিলারদের সাময়িকভাবে প্রধান স্থাপনা হতে সারা দেশের সব ডিপোতে নিয়মিতভাবে রেল ওয়াগন/ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল পাঠানো হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের বাফার স্টক (পর্যাপ্ত মজুত) গড়ে উঠবে।

 যানবাহনে নির্ধারিত তেলের পরিমাণ

রসিদ দেখিয়ে তেল নিতে হবে

ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তাকে তেলের ধরন, পরিমাণ ও দাম উল্লেখ করে রসিদ দিতে হবে এবং প্রতিবার তেল কেনার সময় আগের রসিদ দেখাতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়।

বিপিসি আরও বলেছে, ডিলারেরা বরাদ্দ ও ভোক্তার ক্রয় রসিদ গ্রহণ করে তেল সরবরাহ করবে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ‍্য ডিপোতে প্রদান করে জ্বালানি তেল গ্রহণ করবে।

ডিলারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের আগে বর্তমান বরাদ্দ ও মজুতের তথ‍্য পর্যালোচনা করে সরবরাহ করা হবে এবং কোনো অবস্থায় বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে বিপিসি।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আজ ছুটির দিনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

যেমন পরিবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে মোটরসাইকেল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বেশ কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হতে দেখা যায়। কে কার আগে যাবেন, এ নিয়ে কেউ কেউ হাতাহাতিতে লিপ্ত হন।

৫০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছেন উবারচালক নাজমুল হাসান। তিনি শাহবাগ মেট্রোরেলের স্টেশনের নিচ থেকে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান। প্রায় ৫০ মিনিট পর তেল নিতে পেরেছেন। এ সময়ে দুই থেকে তিনটি ভাড়া পেতেন বলে জানান এই চালক। বলেন, প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল লাগে। অন্যদের মানুষদের অল্প হলেও চলে, কিন্তু এই তেল ছাড়া তাঁদের চলবে না।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চলছে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে যায়নি। তবে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তেল কিনছেন।

দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) কারওয়ান বাজারে বিপিসি ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ মজুদ রয়েছে, তাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কোনো শঙ্কা নেই।

নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গতকাল পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুদ রয়েছে।
জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদের তালিকা
পণ্য মোট মজুদ ব্যবহারযোগ্য মজুদ মজুদকাল
ডিজেল ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন ১ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন ১৪ দিন
অকটেন ৩৭ হাজার মেট্রিক টন ৩৪ হাজার মেট্রিক টন ২৮ দিন
পেট্রোল ২১ হাজার মেট্রিক টন ১৯ হাজার মেট্রিক টন ১৫ দিন
ফার্নেস অয়েল ৮৫ হাজার মেট্রিক টন ৭৬ হাজার মেট্রিক টন ৯৩ দিন
জেট এ–১ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ৫৫ হাজার মেট্রিক টন ৩০ দিন

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে ডলারের উত্থান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সংকটকালে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ডলার এখনো কার্যকর।

সংবাদে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে গ্রিনব্যাক আবারও ঐতিহ্যগত ‘ক্রাইসিস কারেন্সি’ বা সংকটকালীন মুদ্রার পরিচয় ফিরে পেয়েছে। খবর রয়টার্সের

কয়েক মাস ধরেই ডলার নিয়ে বাজারে সংশয় ছিল। বিশেষ করে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বিক্রির ধুম পড়লেও ডলার প্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছিল, চাপের সময়ে ডলারের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ কি ফিকে হয়ে যাচ্ছে?

কানাডার বহুজাতিক স্কশিয়াব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ এরিক থিওরেট বলেন, ‘আজকের দিনটি ডলারের দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে ধ্রুপদি দিন। কেননা এদিন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ না করে নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ডলারের আশ্রয় নিয়েছেন।’

এরিকের ভাষায়, ‘লিবারেশন ডে’ আমাদের চিরপরিচিত ঐতিহাসিক ধারা থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। বিষয়টি হলো, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন, সেই দিনটিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিবারেশন ডে’ বা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে আখ্যা দেন। ওই ঘোষণার পর ডলারসহ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা যায়। অর্থাৎ তখন ডলার নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারেনি।

গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্যানুসারে, সোমবার বিশ্ববাজারের সোনার দাম বেড়েছে আউন্সপ্রতি ৮৮ ডলারের বেশি। ফলে সোনার দাম এখন ৫ হাজার ৩৬৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শিগগরিই তা আবার সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই সোনার দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৮৯ ডলারে উঠেছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজারের গভীরতা ও শক্ত ভিত ডলারের জন্য সহায়ক। এরিক থিওরেটের ভাষায়, ‘আপনি যদি বড় পরিসরে ঝুঁকি কমাতে চান, মার্কিন ট্রেজারি বাজারই একমাত্র বাজার, যে বাজার আপনার ঝুঁকির মাত্রা সামলাতে পারে।’ সংকটের সময় বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের চাহিদা বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের মার্সার অ্যাডভাইজার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ডন ক্যালকাগনি বলেন, ‘ডলারের বিকল্প নেই, এটাও বড় কারণ। অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার থেকে দূরে থাকা কঠিন। তাই নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের নৈপুণ্যে আমি তেমন একটা অবাক নই।’

ঝুঁকির উৎস যখন যুক্তরাষ্ট্র

গত বছর বাজারের অস্থিরতায় ডলার কেন নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে আকর্ষণীয় হতে পারেনি, এর ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, তখন ঝুঁকির উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। ওয়াশিংটনের শুল্ক–ঝড় বিশ্ববাজারে তোলপাড় সৃষ্টি করে। যে দেশ অনিশ্চয়তার উৎস, তার মুদ্রায় আশ্রয় নিতে বিনিয়োগকারীদের অনীহা থাকা স্বাভাবিক।

ম্যাক্রো গবেষণা ও কৌশল প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো হাইভের গবেষক বেঞ্জামিন ফোর্ড বলেন, ট্রাম্পের তথাকথিত ‘স্বাধীনতা দিবসের’ ঘোষণায় ডলারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বের অন্য অঞ্চলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এখন তেলের দামও বাড়ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা আগের অবস্থান থেকে মুখ ফিরিয়ে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।

বিএনওয়াইয়ের আমেরিকাস ম্যাক্রো কৌশলবিদ জন ভেলিস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে ধাক্কা এলে ডলারের আবেদন ক্ষুণ্ন হতে পারে। কিন্তু যখন সংকট আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক, তখন ডলারের আবেদন অটুট থাকে। এখনকার বাজারে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে সবাই এতটা নিশ্চিত নন। রাবোব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশল প্রধান জেন ফোলি বলেন, এবারের সংকটের সময় ডলারের অবস্থান দেখে মনে হতে পারে, সে তার পুরোনো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু বিতর্ক শেষ হয়ে যায়নি।

সোমবার ডলার শুধু নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবেই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র যে নিট জ্বালানি রপ্তানিকারক, সে কারণেও পালে হাওয়া পেয়েছে। তেলের দাম বাড়লে সাধারণত আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে।

স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক অ্যারন হার্ড মনে করেন, জ্বালানি বা তারল্যসংকটের বাইরে অন্য কোনো ধরনের ধাক্কায় ডলার একইভাবে শক্তিশালী না–ও থাকতে পারে। তাঁর কথায়, বিষয়টি যদি সাধারণ অর্থনৈতিক ভীতি হয়, তখন ডলার এতটা কার্যকর না–ও হতে পারে।

হার্ডের বক্তব্য হলো, আগে বড় সংকটের সময় শেয়ারবাজার পড়ে গেলেও ডলার সাধারণত শক্তিশালী হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন, ভবিষ্যতে বড় ধাক্কার সময় ডলার ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ একই সঙ্গে অস্থির হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ ডলার সব পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা আগের মতো নেই।

ম্যাক্রো হাইভের ফোর্ড মনে করেন, স্বল্প মেয়াদে ডলারের ভবিষ্যৎ তেলের দামের গতিপথের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়তে থাকবে আর বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমবে—এমন পরিবেশে ডলারের চাহিদা বাড়বে।

তবে তেলের দাম কমে গেলে প্রচলিত নিরাপদ মুদ্রা, যেমন সুইস ফ্রাঁ ও জাপানি ইয়েন আবার শক্তিশালী হতে পারে। তেমন পরিস্থিতিতে এই দুটি মুদ্রাই বিনিয়োগের জন্য লাভজনক মাধ্যম হবে বলে মনে করছেন ফোর্ড।

ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা হামলার জেরে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব জায়গায় শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়েছে।

সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে আজ সোমবার সংকটগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’র উল্লেখ করে আজ কুয়েতের শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সৌদি আরবের প্রধান সূচক টিএএসআই সূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ, মিসরের ইজিএক্স ৩০ সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ, বাহরাইনের বিএএক্স সূচক ১ শতাংশ, ওমানের এমএসএক্স সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।

পাকিস্তানের প্রধান সূচক কেএসই ১০০ আজ ১৬ হাজার পয়েন্ট কমেছে, যা এক দিনে এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ পতন। এ জন্য পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ (পিএসএক্স) শেয়ারবাজারের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ভারতের নিফটি ৫০ সূচক ১ দশমিক ২৪ শতাংশ, জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, হংকংয়ের হেংসেং সূচক ২ দশমিক ১৪ শতাংশ, চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক দশমিক ৪৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার মূল সূচক কোসপি ১ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধান সূচক কেএলসিআই দশমিক ৯৬ শতাংশ ও তাইওয়ানের প্রধান সূচক দশমিক ৯০ শতাংশ পড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের পতন ঘটতে শুরু করে। আজ রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত পৌনে ৯টা) পাওয়া খবর অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ডাউ জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ সূচক ৫৪৩ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকও ১ দশমিক ১ শতাংশ ও নাসড্যাক সমম্বিত সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকগুলোরও পতন ঘটে। ওয়ালস্ট্রিটের এসঅ্যান্ডপি ৫০০, নাসড্যাক কম্পোজিট, ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ফিউচার—সব কটিই প্রায় ১ শতাংশ করে কমেছে।

ফিউচার (ভবিষ্যৎ চুক্তি) হলো এমন ধরনের আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা আগাম নির্ধারিত দামে ভবিষ্যতের কোনো তারিখে শেয়ার, পণ্য বা সূচক কেনাবেচার অঙ্গীকার করেন। বাজার খোলার আগেই ফিউচার লেনদেন দেখে বিনিয়োগকারীরা দিনটি সম্পর্কে আগাম ধারণা পান।

ইউরোপীয় শেয়ারবাজারগুলোতেও আজ বড় পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়। লন্ডনের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটার কিছু পর প্যান-ইউরোপীয় সূচক স্টক্স ৬০০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও লন্ডনের প্রধান শেয়ারসূচক এফটিএসই ১০০ সূচক প্রায় ১ শতাংশ পড়ে যায়। ইউরোপের অন্য বাজারগুলোতে পতন আরও বেশি ছিল। ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক ১ দশমিক ৮ শতাংশ ও জার্মানির ড্যাক্স সূচক ২ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ইউরোপে তেল, গ্যাস ও প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়া প্রায় সব প্রধান খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

ইউরোপের প্রতিরক্ষা তথা সামরিক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারও আজ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ইতালির মহাকাশ ও প্রতিরক্ষাপ্রতিষ্ঠান অ্যাভিওর শেয়ার প্রায় ২ শতাংশ বাড়ে। যুক্তরাজ্যের বিএই সিস্টেমসের শেয়ারমূল্য প্রায় ৫ শতাংশ ও সুইডেনের যুদ্ধবিমান নির্মাতা এসএএবির শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ইতালির লিওনার্দো ও জার্মানির রেঙ্ক—এ দুটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ করে বাড়ে।

ইউরোপের শেয়ারবাজারে ভ্রমণ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা যায়।

অন্যদিকে ভ্রমণ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন দেখা যায়। অ্যাংলো-আমেরিকান ক্রুজ অপারেটর কার্নিভ্যাল ও এয়ারলাইনস গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল কনসোলিডেটেড এয়ারলাইনস গ্রুপের শেয়ারমূল্য ৩ শতাংশ কমে যায়। জার্মান পর্যটন কোম্পানি টুই এজির শেয়ার প্রায় ৯ শতাংশ ও লুফথানসার শেয়ারের দাম ৩ শতাংশ কমেছে।

সূত্র: সিএনএন, সিএনবিসি, বিবিসি, দ্য ডন, রয়টার্স