• Colors: Purple Color

মূল্যস্ফীতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না আসায় নীতি সুদহার (পলিসি রেট) অপরিবর্তিত রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত এই সংকোচনমূলক অবস্থান বজায় রাখা হবে।

আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ও মুদ্রা সরবরাহ

নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। জুন নাগাদ এই প্রাক্কলন ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ৮ শতাংশ। তবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

একনজরে মুদ্রানীতি

• নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। • মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য: ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক নীতি চলবে। • বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ। • মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ সাড়ে ১১ শতাংশ।

অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি বৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। মূলত বাজার থেকে ৪৩০ কোটি ডলার কেনার বিপরীতে ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছাড়ায় মুদ্রা সরবরাহ কিছুটা বাড়তির দিকে রয়েছে বলে জানানো হয়।

আক্ষেপ ও সংস্কারের প্রশ্ন

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, গভর্নর হিসেবে এই সরকারের আমলে আমি পূর্ণ পেশাদার স্বাধীনতা ভোগ করেছি, কোনো চাপ ছিল না। তবে কিছু আইন সংশোধন না হওয়ায় আমার আক্ষেপ রয়ে গেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।

পরবর্তী সরকারের সময় সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে না পারলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর হেসেই বলেন, সেটা তখন বোঝা যাবে। সেতুর কাছে গিয়ে বলা যাবে সেতু পার হব কি না। তবে যে সরকারই আসুক, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ পরিস্থিতি

দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ২০২৪ সালের আগস্টের পর তিন দফায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছিল। গত নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশে উঠলেও পরে তা কিছুটা কমে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়বে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রয়েছে এবং সংস্থাটির সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।

একনজরে মুদ্রানীতি

• নীতি সুদহার ১০ শতাংশ।

• মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য: ৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক নীতি চলবে।

• বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে সাড়ে ৮ শতাংশ।

• মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা জুন নাগাদ সাড়ে ১১ শতাংশ।

চট্টগ্রাম

বাজারে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে কাঁচা মরিচের দাম। তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচে ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি লেবু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, লাউয়ের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। বাজারে শাকসবজির জোগানও তুলনামূলক কম। আবার ক্রেতাও কম।

আজ রাত পার হলেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে ভোট দিতে বিপুলসংখ্যক লোক ঢাকা ছেড়েছেন। এ সময়ে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকামুখী যানবাহন চলাচলেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় মরিচসহ বিভিন্ন সবজির সরবরাহ কমেছে। এ কারণে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আজ বুধবার রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কারওয়ান বাজার— এই তিন জায়গায় খোঁজ নিয়ে ও ক্রেতা–বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহাখালী কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, ওই সময় বাজারটিতে সবজির সব দোকান খোলা ছিল। তবে প্রায় অর্ধেকসংখ্যক মাছের দোকান ও কয়েকটি মুদির দোকান বন্ধ দেখা যায়। জানা গেছে, বন্ধ থাকা দোকানের বিক্রেতারা ভোট দিতে বাড়িতে গেছেন।

নির্বাচনের সময়ে পণ্যের দরদামে কোনো পরিবর্তন আছে কি না, জানতে চাইলে বাজারের সবজি বিক্রেতা আবু বকর বলেন, ‘বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি কম। এক–দুই দিন আগে যেসব সবজি এনেছিলাম, সেগুলোই এখনো বিক্রি করছি।’

ওই সময় মহাখালী কাঁচাবাজারে হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তি পণ্য কিনতে গেছেন। এঁদের একজন সামিউল আলম। তিনি মহাখালীতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সামিউল বলেন, ‘আমি এ আসনেরই (ঢাকা–১৭) ভোটার। জরুরি কিছু বাজার করার প্রয়োজন ছিল। পাড়ার দোকান বন্ধ পেয়েছি। এ কারণে বাজারে এলাম।’

মহাখালী কাঁচা বাজারে সবজির বিক্রেতা সবজি নিয়ে বসে আছেন, ক্রেতা নেই বললেই চলে
মহাখালী কাঁচা বাজারে সবজির বিক্রেতা সবজি নিয়ে বসে আছেন, ক্রেতা নেই বললেই চলে
 

মহাখালী থেকে গেলাম মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে। সেখানে গিয়ে অবশ্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্রেতার উপস্থিতি দেখা গেল। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আশপাশের এলাকায় স্থানীয় ভোটার অনেক বেশি। তাঁরা ভোটের আগের দিন বাজার করতে আসছেন। এ জন্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতা উপস্থিতি তেমন একটা কমেনি। তবে আগামীকাল ভোটের দিন বাজারের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

অবশ্য কারওয়ান বাজারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। অন্যান্য দিনের তুলনায় এখানে কমসংখ্যক সবজির দোকান খোলা দেখা গেছে। কম ছিল ক্রেতাদের উপস্থিতিও। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মাহবুব আলম বলেন, ‘মানুষজন তো বেশির ভাগই বাড়ি গেছে। নতুন কোনো সবজিও বাজারে আসেনি। আগে যা কেনা ছিল, সেগুলো বিক্রি করছি।’

দাম বাড়তি যেসব পণ্যের

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত তিন দিনের ব্যবধানে কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ৬০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে। তাতে এক কেজি কাঁচা মরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়। তিনদিন আগে প্রতি কেজি মরিচ ১০০–১২০ টাকায় কেনা যেত।

কয়েক দিন ধরেই বাজারে লেবুর দাম চড়া। বিক্রেতারা জানান, লেবুর মৌসুম শেষ হওয়ায় সরবরাহ কমেছে এবং দাম বেড়েছে। পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই বাজারে লেবুর দাম চড়া রয়েছে। ফলে রোজায় লেবুর দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানান বিক্রেতারা।

কয়েক দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ৮০ টাকার নিচে কোনো লেবু (হালি) বিক্রি হচ্ছে না। ধরনভেদে প্রতি হালি লেবু ৮০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। তিন সপ্তাহ আগে লেবুর হালি ছিল ৩০–৫০ টাকা।

এ ছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁপে, লাউয়ের দামও আগের তুলনায় ১০–১৫ টাকার মতো বেড়েছে। অন্যান্য সবজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।

ভারতে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি (সিপিআই) এখন ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয় গতকাল বৃহস্পতিবার জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির এ তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, দেশটিতে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর সর্বভারতীয় ভোক্তা খাদ্য মূল্যসূচক (সিএফপিআই) অনুযায়ী জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি গ্রামে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ ও শহরে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। খবর দ্য বিজনেস লাইন–এর।

এদিকে বাংলাদেশে একই মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত রোববার এই তথ্য প্রকাশ করে, যা ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে ভারতের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। জানুয়ারির আগের দুই মাস ডিসেম্বর আর নভেম্বরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যেমন জানুয়ারি মাসে ভারতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এক বছর আগেও এই দুটি দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি ছিল। এ ছাড়া নেপাল ও মালদ্বীপে যথাক্রমে ২ দশমিক ৪২ শতাংশ ও দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি চলছে।

বর্তমান বছরের একটি নির্দিষ্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জিনিসপত্রের দাম কত বাড়ল সেটাই হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, যা শতকরা হারে প্রকাশ করা হয়। একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাজার থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে আপনার খরচ হলো ১০০ টাকা। এক বছর পর, অর্থাৎ এ বছরের একই মাসে একই পণ্য ও সেবা কিনতে আপনার খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা। এর মানে এক বছরে আপনার ১০০ টাকায় ৮ টাকা ৫৮ পয়সা বেশি খরচ হয়েছে। আর এটাই, মানে ৮ দশমিক ৫৮ পয়সা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি।

বিজনেস লাইন–এর খবর অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ভারতের আবাসন খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২ দশমিক ০৫ শতাংশ।

ভারতের ৪৩৪টি শহর, ১ হাজার ৪৬৫টি গ্রামীণ বাজার ও ১ হাজার ৩৯৫টি শহুরে বাজার থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে দামের ওঠানামা ধরতে ২৫ লাখের বেশি জনসংখ্যার ১২টি অনলাইন বাজার/শহরকে নতুন ভোক্তা মূল্যসূচকে (সিপিআই) হিসাবে যুক্ত করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্যের দাম সংগ্রহ করা হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, তা করতে পারেনি বাংলাদেশ। আট মাসে ধরেই মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। এতে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ বিপাকে আছেন। কারণ, প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তাঁদের বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনতে কষ্ট হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ সময়ের ব্যাপার। এই সরকারকে সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। যদিও তা কঠিনই বৈকি।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে মূল্যস্ফীতি কখনো সাড়ে ৭ শতাংশ, কখনো–বা ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা সেই লক্ষ্যে কখনোই পৌঁছাতে পারেননি।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। স্পট মার্কেটে আউন্সপ্রতি সোনার দাম ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪১ দশমিক ৮০ ডলার।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী শুক্রবার) সোনার দাম আউন্সপ্রতি বেড়েছে ১১৪ দশমিক ৮৩ ডলার। গত এক মাসে সোনার দাম বেড়েছে ৩০৭ দশমিক ৫৯ ডলার।

এপ্রিল মাসে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সোনার আগাম দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৪৬ দশমিক ৩০ ডলারে উঠেছে।

তবে বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারের চিত্র ছিল ভিন্ন। মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় পতনের পর বিক্রির চাপ বাড়ায় সোনার দর প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। ফলে সোনার দাম এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। খবর ইকোনমিক টাইমস।

এদিকে রুপাও অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ৭৮ দশমিক ৫৯ ডলারে পৌঁছায়। যদিও তার আগের দিন রুপার দরপতন হয় ১১ শতাংশ। এত বড় দরপতনের পর রুপার এই ঘুরে দাঁড়ানো উল্লেখযোগ্য। তার পরও দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহ শেষে রুপার মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ।

রুপার সঙ্গে প্লাটিনামের দামও শুক্রবার বেড়েছে। পশ্চিমা পৃথিবীর সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শুক্রবার প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে আউন্সপ্রতি ২ হাজার ৩৩ দশমিক ৯৯ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬৬১ দশমিক ৯৭ ডলারে দাঁড়ায়। তবে সাপ্তাহিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহে উভয় ধাতুর দামই কমেছে।

এদিকে গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গতি ফিরেছে। প্রতাশ্যার চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। এতে বেকারত্বের হার কমেছে। সেই সঙ্গে জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির হারও কমেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শ্রমবাজার শক্তিশালী ও মূল্যস্ফীতি কমছে—উভয়ই ইতিবাচক। তবে নীতি সুদহার দ্রুত কমানো হলে চাহিদা বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা নীতি সুদহার কমানোর আশা করলেও ফেড সম্ভবত আরও ধৈর্য ধরবে।

তবে বাজারে ধারণা, চলতি বছর ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট করে দুই দফায় সুদহার কমানো হতে পারে। প্রথমবার কমানো হবে জুন মাসে। সাধারণত সুদের হার কম থাকলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়ে যায়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার একধরনের ‘মানসিক সীমা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সীমা ভেঙে গেলে দামের দ্রুত উত্থান–পতন হয়, বিশেষ করে যখন অস্থিরতা বেশি থাকে। সম্প্রতি শেয়ারবাজারের পতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সোনার দাম কমেছে, তেমন কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রণোদনা তখন ছিল না।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, চলতি বছরে সোনার দাম ছয় হাজার ডলার স্পর্শ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কোন দিকে যায়, মূল্যস্ফীতির গতি কেমন থাকে বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কতটা অনিশ্চয়তা থাকে—এসবের ওপর নির্ভর করছে সোনার দাম কতটা দ্রুত ছয় হাজার ডলার স্পর্শ করবে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সোনা কেবল মুনাফাভিত্তিক সম্পদ নয়; অনেক দেশের জন্য এটি কৌশলগত রিজার্ভ। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে সোনা ক্রয় অব্যাহত রাখে, তাহলে সোনার দাম ছয় হাজার ডলার পেরিয়ে যেতেই পারে।

এদিকে লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (এলএমবিএ) বার্ষিক পূর্বাভাস জরিপে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

নতুন সরকারের সামনে সব সময়ই কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকে। এবার তো অবস্থা আগের চেয়ে অনেক সঙ্গিন। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে আর্থিক খাতে চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের দেওয়া মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। তাই নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে হবে, যাতে নতুন করে আর কোনো অনিয়ম না হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক কোম্পানি ও অর্থ ঋণ আদালত আইন পাস করে যাওয়া। কিন্তু তারা সেটা করতে পারল না। নতুন সরকারের উচিত হবে, শুরুতেই আইনি ভিত্তির মাধ্যমে খাতটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে আর কোনো আর্থিক অপরাধ না ঘটে। যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা আর্থিক অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

নতুন সরকারের উচিত হবে, শুরুতেই আইনি ভিত্তির মাধ্যমে খাতটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া, যাতে আর কোনো আর্থিক অপরাধ না ঘটে। যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখতে হবে। এ ছাড়া যাঁরা আর্থিক অপরাধ করেছেন, তাঁদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সরকারের কাজ শুরু করতে হবে।মইনুল ইসলাম, সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে দেশের আর্থিক খাতে চরম বিপর্যয় ঘটে। দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে লুটপাট চালান আওয়ামী লীগ–সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করেন। ফলে দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন অচল হয়ে পড়েছে, তেমনি অনেক আমানতকারী তাঁদের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সে জন্য এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

এস আলম, বেক্সিমকো গ্রুপসহ যারা খাতটিকে দুর্বল করে দিয়েছে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরই নির্ভর করবে খাতটির যে সংস্কার শুরু হয়েছে, তা টেকসই হবে কি না। এ ছাড়া আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে একাধিক আইন পাস করতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভঙ্গুর ব্যাংক খাত ও খেলাপি ঋণের রেকর্ড

এখন অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যাংকিং খাত। নাজুক পরিস্থিতিতে পড়া দেশের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হচ্ছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা নানা দাবিতে আন্দোলন করছেন। চাকরি হারানো কর্মকর্তারাও আন্দোলনে রয়েছেন। ব্যাংক পাঁচটিতে রয়েছেন ৭৫ লাখ হিসাবধারী ও ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংককে অধিগ্রহণ গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’–এর কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া চলছে।

এ ছাড়া ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হচ্ছে। এই দুই উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাটা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংক একীভূতকরণ ও পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, এমডি, এমটিবি ও সাবেক চেয়ারম্যান, এবিবি

এদিকে গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। তাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ে তৎপরতা জোরদার করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কারণ, নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো সময়সাপেক্ষ বিষয়।

ব্যাংকাররা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম করে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ঋণ খারাপ হয়ে গেছে। ফলে কোন উপায়ে এসব ঋণ আদায় হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ভিত্তি

অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোকে নিয়মের মধ্যে পরিচালনা করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালকদের লাগাম টানা ও জবাবদিহির আওতার আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খেলাপিদের বিচারের আওতায় আনতে ও অর্থ উদ্ধারে নেওয়া হয় অর্থ ঋণ আদালত আইন সংস্কারের উদ্যোগ। তবে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এসব আইন পাস করে সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সহায়তা করাই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া ব্যবসা–বাণিজ্য চাঙা করতে সুদহার কমানো, ঋণ প্রাপ্তি সহজ করাসহ নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যের সূচকগুলোর উন্নতি হয়েছে। এ জন্য বিএনপি সরকারকে অবশ্য ডলার নিয়ে চাপে পড়তে হবে না।

আরও যত সমস্যা

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নতুন সরকারের উদ্দেশে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন সরকারের প্রধান কাজ হবে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি সাধন। মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি, কর্মসংস্থানও হচ্ছে না। এ জন্য ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি করতে হবে। কর আদায় বাড়িয়ে ঋণ কমাতে হবে। তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ ও পাচার করা অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। এটা নির্ভর করবে কারা আর্থিক খাতের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তাঁদের ওপর।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব