অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের শুরুর সময়টিকে কাজে লাগানো উচিত বিএনপির। দলটির উচিত হবে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।

‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)।

শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে সংঘাত নিরসন ও সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী কাজ করা অলাভজনক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা আইসিজি নিজেদের ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেড় দশকের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধ্যায় শেষ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় একটি বড় পদক্ষেপ ছিল নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর। নতুন সরকারের প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট জনরায় থাকলেও তারা সেই জনরায়কে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

আইসিজি মনে করে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, রাজনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নের মোকাবিলাসহ আগামী বছরগুলোতে বিএনপিকে কয়েকটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,ফাইল ছবি: বাসস
 

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণে বিএনপি ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ আবার অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন কর্মকর্তা যেমনটি উল্লেখ করেছিলেন, ‘হাসিনা-পরবর্তী সময়ে মানুষ আত্মবিশ্বাসী যে প্রয়োজনে তারা রাজপথে নেমে যে কাউকে ক্ষমতা থেকে নামাতে পারে। তাই এই সরকারকে কাজের ফলাফল দেখাতে হবে।’

আইসিজি বলছে, বাংলাদেশের সরকারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস ইঙ্গিত দেয়, দৃঢ় পদক্ষেপ ছাড়া বিএনপির পক্ষে তাদের বর্তমান জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হবে। দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়।

আইসিজি মনে করে, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, রাজনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে প্রশ্নের মোকাবিলাসহ আগামী বছরগুলোতে বিএনপিকে কয়েকটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

বড় ইস্যু হতে পারে সংস্কার

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী মাসগুলোতে রাজনৈতিক সংস্কার একটি উত্তপ্ত বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যদিও বিএনপি ‘জুলাই সনদে’ থাকা বেশির ভাগ সংস্কার প্রস্তাব সমর্থন করেছে এবং তা বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে, এরপরও তাদের সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি দলটি যদি তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে সংবিধান সংশোধনী পাস করার সিদ্ধান্তও নেয়, তবে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন তারা গ্রহণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) প্রবর্তনের প্রস্তাবসহ জুলাই সনদের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি দ্বিমত পোষণ করেছিল। এগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হলে সনদে প্রস্তাবিত নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। এটি বিরোধী দলগুলোর জন্য আন্দোলনের একটি বড় ইস্যুও হয়ে উঠতে পারে।
আইসিজি মনে করে, জুলাই সনদের বিষয়ে বিএনপিকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হবে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলটি যুক্তি দেখাতে পারে যে জনগণ তাদের তুলনামূলক রক্ষণশীল সংস্কার এজেন্ডাকেই সমর্থন দিয়েছে। তবে দলটির মনে রাখা উচিত, গণভোটে জুলাই সনদের প্রতি জোরালো সমর্থন মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক জনদাবিরই প্রতিফলন, যার মধ্যে বিএনপির সম্মত না হওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বিএনপি যদি অর্থবহ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে বলে মনে হয়, তাহলে জুলাই সনদের কট্টর সমর্থক জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হতে পারে। তাদের সমর্থকদের রাজপথেও নামাতে পারে। সংস্কার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ বিএনপির রাজনৈতিক পুঁজি ক্ষয় করতে পারে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডার অন্যান্য দিক বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন। এটি জনমনে এমন ধারণাকেও বদ্ধমূল করবে যে প্রকৃত পরিবর্তনের চেয়ে সংস্কারের পরিধি সীমিত রেখে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাতেই দলটির আগ্রহ বেশি।

আইসিজি মনে করে, জুলাই সনদের বিষয়ে বিএনপিকে সতর্ক ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হবে। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে দলটি যুক্তি দেখাতে পারে যে জনগণ তাদের তুলনামূলক রক্ষণশীল সংস্কার এজেন্ডাকেই সমর্থন দিয়েছে। তবে দলটির মনে রাখা উচিত, গণভোটে জুলাই সনদের প্রতি জোরালো সমর্থন মূলত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক জনদাবিরই প্রতিফলন, যার মধ্যে বিএনপির সম্মত না হওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন

আইসিজি
আইসিজি

প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সরকারের সামনে থাকা অন্যতম জটিল রাজনৈতিক প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দলটির কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে এই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপি সরকারকে।

আইসিজি মনে করে, এই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত করা লোভনীয় হতে পারে; কারণ, বিএনপির প্রতিপক্ষদের মধ্যে আওয়ামী লীগই যে বৃহত্তম বিরোধী দল, তা স্পষ্ট। এ ছাড়া হাসিনা সরকার যেভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ করেছে, তাতে দলের অনেক নেতার মনে গভীর ক্ষোভ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের বিশাল সমর্থনগোষ্ঠী থাকায় দলটিকে স্থায়ীভাবে রাজনীতির বাইরে রাখা টেকসই হবে না বলেই মনে হয়। এটি অস্থিরতা ও সহিংসতার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বে বহাল থাকায় তাঁর প্রতি জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর দণ্ডাদেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া কঠিন হবে।

আইসিজি মনে করে, আপাতত শেখ হাসিনা দলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নন। দলের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে অনেক কর্মী দলের বিকল্প নেতৃত্ব কল্পনা করা কঠিন মনে করতে পারেন। আত্মগোপনে থাকা এক আওয়ামী লীগ কর্মী ক্রাইসিস গ্রুপকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ছাড়া অনেক সমর্থক আওয়ামী লীগকে দল হিসেবেই দেখবেন না। এ রকম কিছু করতে সময় লাগবে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি বিএনপির জন্য আওয়ামী লীগের আইনি বৈধতা ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ করত। তাঁর উত্তরাধিকারী যদি পরিবারের অন্য কেউ হন—যেমন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন; তাহলে সমর্থকেরা বিষয়টি আরও সহজে গ্রহণ করতে পারেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। হাসিনা এখনো দলের নেতৃত্বে বহাল থাকায় তাঁর প্রতি জনগণের তীব্র ক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর দণ্ডাদেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া কঠিন হবে।

আইসিজি মনে করে, শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট হবে না; দলটিকে ভুলও শুধরে নিতে হবে। এখন পর্যন্ত হাসিনার আমলে প্রতিবাদ দমনে প্রাণহানি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো দায় নিতে অস্বীকার করে আসছে আওয়ামী লীগ; বরং তারা আপসকামী মনোভাবের বদলে উদ্ধত ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। তিনি ও দলের অন্য নেতাদের ওপর দিল্লির প্রভাব রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে স্থিতিশীল বাংলাদেশ থেকে ভারতের অনেক লাভ আছে। তাই অন্ততপক্ষে নয়াদিল্লিকে তাদের প্রভাব ব্যবহার করে নিশ্চিত করতে হবে যেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এমন কোনো বিবৃতি বা কাজ না করেন, যা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে। বিনিময়ে দেশটিতে তাঁদের বসবাসের সুযোগ অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএনপি সরকারের উচিত আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া। শেখ হাসিনার পতনের পর অনেককে ভিত্তিহীন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচার অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় মাসের পর মাস—কোনো ক্ষেত্রে ১৮ মাসের বেশি তাঁদের আটক রাখা হয়েছে; কারাগারে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রতিবাদে অংশ নেওয়ায় কিংবা পুলিশের অভিযানে আরও কয়েক হাজার সাধারণ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।

আইসিজি মনে করে, আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং যাঁদের বিরুদ্ধে (অপরাধ সংঘটিত করার) কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই বা যাঁরা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নন, তাঁদের জামিন দেওয়া। বিচারিক প্রক্রিয়ার বৈধ দাবিগুলোর প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা থেকে বিএনপিকে অবশ্যই বিরত রাখতে হবে। এটি করতে গিয়ে তাদের ডানপন্থী, মূলত ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর চাপ; সেই সঙ্গে নিজ দলের ভেতরের (যারা আওয়ামী লীগের আবার উত্থান রোধে বদ্ধপরিকর) চাপ মোকাবিলায় দৃঢ় থাকতে হবে।

হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাঁর পতনের কারণে কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলো পুনর্মূল্যায়নের একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিনটি দেশই নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে।

সামাজিক পরিবর্তন ও সংখ্যালঘুর অধিকার

প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসিনার পতন বাংলাদেশে রক্ষণশীল সামাজিক শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, যা মূলত বিভিন্ন ধর্মীয় দল ও গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এই পরিবর্তনটি বেশ কয়েক বছর ধরেই সুপ্ত অবস্থায় ছিল, তবে অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামপন্থী দলগুলোর ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩৫ বছরের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনো অত্যন্ত নগণ্য। বিগত নির্বাচনে মোট প্রার্থীদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশ। বর্তমানে ৩০০ আসনের সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন মাত্র ৭ জন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই সাবেক (পুরুষ) আইনপ্রণেতাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এ ছাড়া মন্ত্রিসভাতেও মাত্র ৩ জন নারী স্থান পেয়েছেন।

ধর্মীয়, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুসহ অনেক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এখন আশঙ্কা করছেন যে চলমান এই প্রবণতাগুলো শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীল সামাজিক নীতি প্রণয়নের জন্য একটি রাজনৈতিক চাপে পরিণত হতে পারে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি এখন নিজেকে দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক হিসেবে তুলে ধরছে। এই পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায় কিংবা লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের মতো গোষ্ঠীগুলোর ওপর আসা যেকোনো হুমকির বিষয়ে বিএনপিকে বিশেষভাবে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

ভূরাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, যা একই সঙ্গে ঝুঁকি এবং সম্ভাবনা তৈরি করেছে। হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাঁর পতনের কারণে কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি ভারসাম্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলো পুনর্মূল্যায়নের একটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিনটি দেশই নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটন এখন বাণিজ্য এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যার একটি প্রতিফলন হলো ফেব্রুয়ারির শুরুতে ঢাকা–ওয়াশিংটন স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি (রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট)। অন্যদিকে চীন রাজনৈতিক মহলের সব পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘হস্তক্ষেপ না করার’ নীতি বজায় রাখার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়নে নিজেদের একটি প্রধান সহযোগী হিসেবে তুলে ধরছে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারকে তার প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। এই অংশীদারদের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, পাকিস্তান, তুরস্ক, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং রাশিয়াও অন্তর্ভুক্ত। ভারত–মহাসাগরীয় অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার কথা মাথায় রেখে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জোটের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া বাংলাদেশের এড়িয়ে চলতে হবে। তবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট বাংলাদেশের জন্য অন্যতম কঠিন পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে। মিয়ানমারে, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের অর্থ হলো কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসরত ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অদূর ভবিষ্যতে স্বদেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে (যেখান থেকে শরণার্থীরা এসেছে), তাই ঢাকাকে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরু করতে হবে; যদিও এ বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচেষ্টা খুব একটা এগোতে পারেনি।

আইসিজি মনে করে, পুলিশের হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ—এ জন্য বিএনপিকে একই সঙ্গে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে।

জননিরাপত্তা, পুলিশ সংস্কার

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে তাদের দৃশ্যমান অসামর্থ্য। তবে মূল চ্যালেঞ্জটি প্রথাগত পুলিশিং ব্যবস্থার চেয়েও বেশি ছিল বারবার ঘটে যাওয়া রাজপথের আন্দোলন এবং মব ভায়োলেন্সের (বিশৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ) মতো ঘটনাগুলো সামাল দেওয়া। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশের বহিঃপ্রকাশ ছিল, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; বিশেষ করে পুলিশের দুর্বল হয়ে পড়ারও প্রতিফলন ছিল। কারণ, অনেক বাংলাদেশিই পুলিশকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং হাসিনার আওয়ামী লীগের অনুগত হিসেবে মনে করেন।

একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে মব ভায়োলেন্সের মতো ঘটনাগুলো মোকাবিলা করার জন্য বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা উচিত। বিএনপির উচিত, তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ব্যবহার করে পুলিশকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া, যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ না করেন।

আইসিজি মনে করে, পুলিশের হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জ—এ জন্য বিএনপিকে একই সঙ্গে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত করতে হবে।

তবে এই সরকার যদি তরুণ বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয় বা স্বচ্ছ শাসন নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়, তাহলে দেশটিকে আবারও অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইসিজি।

এ ছাড়া পুলিশ বাহিনীকে দলীয় লোক দিয়ে পূর্ণ করার প্রবণতা বিএনপিকে পরিহার করতে হবে—যা আওয়ামী লীগ আমলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। এর পরিবর্তে পুলিশের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।

জননিরাপত্তা রক্ষার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি নতুন সরকারকে উগ্রবাদী সহিংসতার ঝুঁকির বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সরকার কঠিন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এগুলো বিএনপি কীভাবে সামাল দেবে, সেটিই আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, তা ঠিক করে দেবে। যদি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, তবে সরকার তাদের উচ্চাভিলাষী এজেন্ডার বাকি বিষয়গুলো, যেমন জনসেবার উন্নয়ন ও আইনের শাসন শক্তিশালী করার পথে এগোতে পারবে।

তবে এই সরকার যদি তরুণ বাংলাদেশিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থ হয় বা স্বচ্ছ শাসন নিশ্চিত করতে হিমশিম খায়, তাহলে দেশটিকে আবারও অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইসিজি।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব