বরিশালে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) মারধর ও শরীরের সংবেদনশীল স্থান চেপে ধরে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ রোববার বিকেলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ এ তথ্য জানান।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন প্রধান আসামি মোস্তাফিজুর রহমান (লিটু) এবং তাঁর এক সহযোগী আবুল কালাম আজাদ। মামলাটি করেছেন মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার বরিশাল নগরের সদর রোডের অগ্রণী হাউজিং কোম্পানি লিমিটেডের এমডি আবদুল আজিজ হাওলাদার।
ঘটনার ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, ভুক্তভোগী ও পুলিশের বরাতে জানা যায়, ২৭ জুন সন্ধ্যায় কর্মস্থলে নিজ কক্ষে বসে আজিজ হাওলাদার চা পান করছিলেন। এ সময় আকস্মিক চারজন ব্যক্তি ভেতরে ঢোকেন। তাঁরা সবাইকে বের করে দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান আজিজ হাওলাদারকে জাপটে ধরেন এবং তাঁকে চড়থাপ্পড় মারাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে দুটি চেকে ও দুটি ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আজিজ হাওলাদারের সই নেওয়া হয়।
এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মোস্তাফিজুর নগরের কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, তিনি বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে সংগঠনে তাঁর কোনো পদ–পদবি নেই। তাঁর বড় ভাই মাহবুবুর রহমান (পিন্টু) বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
ভুক্তভোগী আজিজ হাওলাদার বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান আমার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ওই অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ২৭ জুন তিনি সহযোগীদের নিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চালিয়ে চেক ও স্ট্যাম্পে সই নেন।’

এ ঘটনায় আজিজ হাওলাদার গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। বিচারক মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। রোববার আদালতের আদেশ থানায় পৌঁছালে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বিষয়টি অবগত হয়। এরপর এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের জন্য মাঠে নামে পুলিশ। আজ বেলা দুইটার দিকে নগরের সদর রোডের একটি বিপণিবিতানের সামনে থেকে মূল আসামি মোস্তাফিজুর রহমান ও তাঁর সহযোগী আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বরিশালের কোতোয়ালি থানায় রাখা হয়েছে।
থানায় বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন গ্রেপ্তার মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে সব ঠিক আছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই কাজটি করতে হয়েছে। আবদুল আজিজ হাওলাদার আমাদের সঙ্গে হাউজিং ব্যবসায় প্রতারণা করেছেন।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি অগ্রণী হাউজিংয়ের একজন পরিচালক। আমার হিসাব অনুযায়ী এমডির কাছে ৫৪ লাখ টাকা পাব; কিন্তু তিনি দাবি করেছেন, ৩৬ লাখ টাকা পাব। এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই ঝামেলা চলছে। বিগত আমলে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করিয়েছে। এ ছাড়া হাউজিংয়ের আরেকজন পরিচালক মিজানুর রহমান ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। এর পেছনেও এমডির হাত রয়েছে।’
টাকা লেনদেনের বিষয়ে কোনো মামলা বা থানায় অভিযোগ করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর জানান, স্বাভাবিকভাবে তিনি বিষয়টি সমাধান করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে আজিজ হাওলাদারের সঙ্গে আজ দুপুরে কথা হয়। তিনিও জানান, একসময় তাঁদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে তাঁর মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি তাঁকে হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনো পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেন মোস্তাফিজুর।
যুবদলের সংবাদ সম্মেলন
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান বিএনপি, যুবদল বা অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেছেন যুবদল বরিশাল জেলা, মহানগর ও কেন্দ্রীয় নেতারা। রোববার বেলা একটায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এ দাবি করেন।
লিখিত বক্তব্যে মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান (মামুন) বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কেউ কেউ যুবদল নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কেননা মোস্তাফিজুর রহমান নামে ওই ব্যক্তি যুবদলের কোনো কমিটিতেই নেই। তিনি যুবদল, বিএনপি, এমনকি দলের অন্য কোনো সহযোগী সংগঠনের কর্মীও নন তিনি, আগেও ছিলেন না।দলের মিছিল-সভায় তাঁর অংশ নেওয়ার ছবিও পাওয়া যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক এইচ এম তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘যত দূর জেনেছি ঘটনাটি কয়েক দিন আগের। এখন সেই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে অভিযুক্তকে যুবদল নেতা আখ্যা দিয়ে বিএনপির নামে বদনাম করার চেষ্টা করছে কোনো একটি চক্র। আমরা দাবি করছে, সাংবাদিকেরা সত্য ঘটনা প্রচার করবেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’