সারাদেশে প্রায় ১৫০ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি চলছে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বর্তমানে ৫ প্রকার খাবার দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। তালিকায় রয়েছে, ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট। তবে অভিযোগ উঠেছে এই প্রকল্পে শিশুদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। ১১ উপজেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সপ্তাহে কলা ও ডিম-বানরুটি থেকেই লোপাট হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা। নিম্নমানের এসব খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।

স্কুল ফিডিং প্রকল্পের খাবার খেয়ে দুই দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল শিশু রাইসা মুনতাহা। সে জানায়, তার পেট ব্যথা করছিল। এছাড়াও তার ভাষ্যমতে, ওসব খাবার সব কেমিক্যাল।

রাইসার মিডডে মিল খাবারের ভয় এখনও কাটেনি। তেমনি তার মা জান্নাতুল সন্তানকে নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, বিষাক্ত খাবার দিয়ে আমার লাভ কী? লাভ নেই। আর বাচ্চাদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে কী করবো? কে দেবে আমাকে বাচ্চা?

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপশাড়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, মিডডে মিলের বানরুটিতে ফাঙ্গাস জমেছে। এর ফলে খাবার থেকে গন্ধ বের হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক জানান, এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

একই চিত্র দেখা যায়, জেলার কালাই উপজেলার তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়টির শিক্ষক জানান, এই রুটি খেলে পেটে ব্যথা হবে।

১২০ গ্রাম ওজনের বান রুটির দাম ধরা হয়েছে ২৪ টাকা পর্যন্ত। এমনকি ওজন ঠিক রাখতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে রুটি।

আশেপাশের আরও কয়েকটি জেলা ঘুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুটির ভেতরের বাতাস থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধ বের হয়, যা খাওয়ার অযোগ্য করে তোলে। তাই শিশুরা অনেক সময়ই সেটা ফেলে দেয়।

তবে নিয়ম অনুযায়ী ডিম দিতে হবে ন্যূনতম ৬০ গ্রাম ওজনের। প্রতি পিসের দাম ১৪ টাকা পর্যন্ত। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একেকটি ডিমের ওজন ৩৫ কিংবা ৪০ গ্রামের বেশি নয়।

৬০ গ্রাম না দিয়ে কম ওজনের ডিম দেওয়া হচ্ছে, জানতে পাবনার একটি খামারে গেলে একজন জানান, ছোট ডিমে এক টাকা কম লাগে। তিনি আরও জানান, ৫৫ গ্রামের ডিমগুলো বড় ক্যাটাগরিতে পড়ে, দামও বেশি।

এসব কারণেই প্রতিদিন ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর বাজেটে এক টাকা কম করেও দেওয়া হলে সারা বাংলাদেশে প্রতিদিন নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকবে লাখ টাকা, সপ্তাহে কোটি টাকা।

শুধু কম ওজন আর দামে সস্তা নয়, ঠিকঠাক সিদ্ধ না করা আর পচা ডিম সরবরাহের অভিযোগও আছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, এই ডিম খাওয়া যায় না, তেমনি পচাও থাকে।

এদিকে, শিক্ষার্থীরা জানায়, কলার মাঝের অংশ অনেক সময় খারাপ থাকে। এ বিষয়ে এক শিক্ষক বলেন, অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন, এই কলা যদি খাওয়ানো হয়, তাহলে আগে বাচ্চার কাশির ওষুধ কিনে দিতে হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এসব কলা খেতে পারছে না। তাদের ভাষ্যমতে, কলা শক্ত, এটি না পাকায় তাদের কাছে কস লাগে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গিয়ে এক স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, কলার ওজন ৯০ গ্রাম। তবে সেখানে ১০০ গ্রাম ওজনের কলা দেওয়ার কথা ছিল সরবরাহকারীদের। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা পর্যন্ত।

দাম যাচাইয়ে উত্তরাঞ্চলের কলার অন্যতম হাট দুর্গাদহ বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একেকটি কলার দাম পড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা। এমনকি ওজনভেদেও দামের তারতম্য দেখা যায়।

কলার বাজেটে শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি কলায় ৭ টাকা বরাদ্দ থাকলে, সেই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে প্রায় দুই কোটি টাকা ঢুকছে।

এসব নিম্নমানের কলা, রুটি, ডিম খেয়ে বিভিন্ন স্থানে অসুস্থ হয়েছেন তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েন ২০ জন শিক্ষার্থী। তারা জানান, পাউরুটি খেয়ে পেট ব্যথা এবং বমি হয়েছিল।

শুধু রাজশাহী বিভাগের ১২ উপজেলায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর জন্য কলা, রুটি, ডিম সরবরাহ করে গণউন্নয়ন সংস্থা গাক। একজন বলেন, গণনায় ধরলে ২২ হাজার ডিম আসে। এত ডিম কি চেক করে দেওয়া সম্ভব?

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন আমাদের নিতে হবে। কারণ আসলে কোমলমতি বাচ্চাদের এই খাবারের বিষয়ে আমরা কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, উপাদানগুলো যদি ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা শিশুদের লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর যদি তা বাসি বা পচা হয়, তবে ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস-এ ও ই হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অবহিত করলে তিনি বলেন, এখন থেকে প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজমেন্ট কমিটি খাবার কমিটিতে থাকবে, তারা বিষয়টি বুঝে নেবে, এমনই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, স্কুল ফিডিং প্রকল্পে আগামীতে দেশের সরকারি সব প্রাথমিকে খাবার দিতে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চায় সরকার।

 

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব