বানিজ্য

বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বিওয়াইডি সিল বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। আর তাই বাংলাদেশেও সিল মডেলের বৈদ্যুতিক গাড়ি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিওয়াইডি। গাড়িগুলোর দাম কোটি টাকার কাছাকাছি হওয়ায় এবার কম দামে ‘বিওয়াইডি সিল ৬’ মডেলের নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি আনতে যাচ্ছে বিওয়াইডি বাংলাদেশ। নতুন মডেলের গাড়িটি একবার চার্জে ৪১০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। শুধু তাই নয়, ৩০ মিনিটেই পুরো চার্জ হয়। আর তাই বাজারে আসার আগে হাতে–কলমে চালিয়ে দেখার পাশাপাশি পুরো গাড়ি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বিওয়াইডি প্রদর্শনী কেন্দ্রে আমরা গিয়েছিলাম। এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ৩০০ ফুট রাস্তায় পূর্বাচল ক্লাব পর্যন্ত আমরা গাড়িটি চালিয়েছি। গাড়িটি চালিয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের এই টেস্ট ড্রাইভ প্রতিবেদন।

সামনেও মালামাল রাখার জায়গা রয়েছে গাড়িটিতে
সামনেও মালামাল রাখার জায়গা রয়েছে গাড়িটিতে
 

প্রদর্শনী কেন্দ্রে ঢুকেই দেখা মিলল সাদা রঙের বিওয়াইডি সিল ৬ গাড়ির। গাড়ির বনেটের নকশার কারণে প্রথম দর্শনেই মনে হলো চালকের আসন থেকে সহজে গাড়ির সামনের মাপ নেওয়া যাবে। দুই পাশে এলইডি হেডলাইট ও বাম্পারের ভেতরে বাতাস চলাচলের সরু দুটি ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে ফগলাইট হাউজিং। নম্বর প্লেটের নিচে বড় আকারে এয়ার ইনটেক্ট সিস্টেম বা বাতাস যাওয়া–আসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাঝখানে বিওয়াইডির লোগো। এটি যেহেতু সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেহেতু এটার বনেটের নিচেও মালামাল রাখার জন্য ৬৫ লিটার স্পেস রয়েছে। এর ফলে সামনে ও পেছনে দুটি মালামাল রাখার জায়গা রয়েছে গাড়িটিতে।

চালকের আসনে বসে এক্সপ্রেসওয়ে অভিমুখে যাত্রা শুরু করি আমরা। প্রায় নিঃশব্দে চলা গাড়িটির ভেতরের নয়েস ক্যানসেলেশন সিস্টেম সত্যিই প্রশংসনীয়। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের সঙ্গে রয়েছে ২.৫ পিএম বাতাস বিশুদ্ধকরণের সুবিধা। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে মাল্টিমিডিয়া নিয়ন্ত্রণসহ ক্রুজ কন্ট্রোল রয়েছে। স্টিয়ারিংয়ের পেছনে ডান পাশে রয়েছে গিয়ার হাতল। গাড়ির স্টার্ট বাটনটা চালকের বাঁ পাশে রয়েছে। এখানে দুটি মুঠোফোন রাখার অপশন আছে। এর নিচে রয়েছে কিছু বাটন। তারপর আছে দুটি গ্লাস হোল্ডার। কফি খেতে খেতে গাড়িটি আরামসে চালানো যাবে। স্টিয়ারিংটিকে সামনে–পেছনে ও ওপর–নিচ করে সেট করার অপশন রয়েছে। চালকের প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্যের জন্য ৮.৮ ইঞ্চি ও মাল্টিমিডিয়ার জন্য ১২.৮ ইঞ্চির প্রশস্ত পর্দা (ডিসপ্লে) রয়েছে। চালকের সামনের ডিসপ্লেতে গাড়ির গতি, ব্যাটারি কতটুকু খরচ হচ্ছে, কতটুকু চার্জ রয়েছে এবং এই চার্জে কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া যাবে, তা দেখা যায়। অ্যাপল কার প্লে বা অ্যান্ড্রয়েডের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ডিসপ্লেটি ব্যবহার করা যাবে। ডিসপ্লের পেছনে পুরো গাড়ির সামনের অংশে একটি উজ্জ্বল কালো রঙের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রথম দেখাতে ডিসপ্লে মনে হতে পারে। মুঠোফোন চার্জ দেওয়ার জন্য গাড়িটির সামনে দ্রুতগতির চার্জ ক্ষমতাসম্পন্ন ইউএসবি ও টাইপ সি পোর্ট রয়েছে।

পাশ থেকে বিওয়াইডি সিল ৬
পাশ থেকে বিওয়াইডি সিল ৬
 

গাড়ির আসনগুলো চামড়ায় মোড়ানো হওয়ায় বেশ আরামদায়ক। চালক ও প্রথম সারির যাত্রীর জন্য স্বয়ংক্রিয় আসন ব্যবস্থাপনা রয়েছে। পেছনের সারিতেও যথেষ্ট হেড ও লেগ রুম রয়েছে। সামনের যাত্রীর পাশাপাশি পেছনের যাত্রীর জন্য এসি ভেন্ট ও মুঠোফোন চার্জ দেওয়ার জন্য ফাস্ট চার্জিং অপশনসহ ইউএসবি ও টাইপ সি পোর্ট রয়েছে। পেছনের আসনগুলো নির্দিষ্ট। ড্রাইভ ট্রেইন না থাকার কারণে মাঝখানের যাত্রীও স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারবেন।

এক্সপ্রেসওয়ে অতিক্রম করে পূর্বাচল সড়কে যাওয়ার পর আমরা গাড়িটির গতি পরীক্ষা শুরু করি। যাত্রা শুরুর সময় গাড়িটির চার্জিং লেভেল ছিল ৬৭। সাধারণ গতিতে চালিয়ে পূর্বাচল আসার পর চার্জিং লেভেল কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। ৫ জন যাত্রীসহ গাড়িটিতে সর্বোচ্চ ১৩৪ কিলোমিটার গতিবেগে চালিয়েছি আমরা। গাড়িটির শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে সময় লাগে মাত্র ১২.৭ সেকেন্ড। নরমাল মোড ছাড়াও গাড়িটিতে আরও তিনটি মোড রয়েছে। ইকো, স্পোর্টস ও স্নো। ইকো মোডে গাড়িটিকে চালানো হলে সর্বোচ্চ মাইলেজ পাওয়া যাবে। আমরা স্পোর্টস মোডে দিয়েও গাড়িটির গতি পরীক্ষা করেছি। নিঃশব্দে গতি তোলার এই মেশিন আমাদের হতাশ করেনি। আশপাশের চালকেরা বেশ অবাক দৃষ্টিতেই গাড়িটির দিকে তাকাচ্ছিলেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি হওয়ার কারণে এতে তাৎক্ষণিক টর্ক উৎপন্ন হয়। গাড়িটির সর্বোচ্চ শক্তি ৯৫ কিলোওয়াট, যা জ্বালানিনির্ভর গাড়ির ১২৮ অর্শ্ব শক্তির সমান। গাড়িটি ২২০ নিউটন মিটার টর্ক উৎপন্ন করতে পারে। শুনতে কম মনে হলেও বৈদ্যুতিক গাড়িতে টর্ক লস না থাকার কারণে এই শক্তিতেই গাড়িটি দুরন্ত গতিতে ছুটে চলতে পারে।

পেছন থেকে বিওয়াইডি সিল ৬
পেছন থেকে বিওয়াইডি সিল ৬
 

বিওয়াইডি সিল ৬ পেছনের চাকার শক্তিতে চলে থাকে। গাড়িটির দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ৪ হাজার ৭২০, ১ হাজার ৮৬০ ও ১ হাজার ৪৯৫ মিলিমিটার। ভূমি থেকে উচ্চতা ১ হাজার ৬১০ মিলিমিটার। চাকার পরিধি ২ হাজার ৮২০ মিলিমিটার। ওজন ১ হাজার ৬৭০ কেজি। এতে বিওয়াইডি ব্লেড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে, যার ক্ষমতা ৪৬ দশমিক ০৮ কিলোওয়াট/ঘণ্টা। দুই ধরনের চার্জিং পোর্ট রয়েছে। ফাস্ট চার্জিং সুবিধায় (সিসিএস ২, ৮০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা) মাত্র ৩০ মিনিটে গাড়িটি পূর্ণ চার্জ করা যায়, যেখানে সাধারণ চার্জারে (৭ কিলোওয়াট/ঘণ্টা) ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। রিজেনারেটিভ ব্রেকিং অপশন থাকার কারণে গাড়িটি চাকার ঘূর্ণনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যাটারি চার্জ করতে পারে।

৫ আসনের গাড়িটিতে ২২৫/৫৫ আর ১৭ চাকা ব্যবহার করা হয়েছে। সামনে ম্যাকপার্সন স্টার্ট ও পেছনে মাল্টি লিংক সাসপেনশন রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য গাড়িটির চার চাকায় ডিস্ক ব্রেক রয়েছে। ছয়টি এয়ারব্যাগ ও গান শোনার জন্য ছয়টি স্পিকার রয়েছে। মালামাল বহন করার জন্য গাড়ির পেছনে রয়েছে ৪৬০ লিটারের বুট স্পেস। অন্যান্য বিওয়াইডি গাড়ির মতো এই গাড়ির পেছনে দেখার ক্যামেরা বেশ স্বচ্ছ ও চালকের সহায়ক। গাড়িটির পেছনের দিকেও নান্দনিক উপস্থাপনা রয়েছে। পেছনের অংশজুড়ে রয়েছে এলইডি ব্যাকলাইট। তার নিচে বিওয়াইডির লোগো। ডান পাশে গাড়ির মডেলের নাম ও বাঁ পাশে ইভির লোগো। একদম নিচের অংশে দুই পাশে রয়েছে রিফ্লেক্টর। মাঝখানে গাড়ির নম্বর প্লেট।

এবার ফেরার পালা। ৩০০ ফিট রাস্তার প্রশস্ত লেনে আমরা ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে চলেছি। থ্রটলে আলতো চাপেই গাড়ি দ্রুততার সঙ্গে ছুটে চলেছে। গাড়িটির সাসপেনশন বেশ উন্নত হওয়ায় রাস্তার ছোটখাটো খানাখন্দ কেবিনের ভেতরে টেরই পাওয়া যায়নি। সাউন্ড কোয়ালিটি মুগ্ধ করার মতো। দূরের যাত্রায় বৃষ্টির সঙ্গে হালকা গানের শব্দ রোমাঞ্চকর অনুভূতি দিবে। সড়কের মধ্যে হঠাৎ নেমে যাওয়া রাস্তায় আমরা গতির সঙ্গে গাড়ির সমন্বয়ের ক্ষমতা পরীক্ষা করলাম। উচ্চগতিতেও গাড়ির ব্যালেন্স ছিল চমৎকার। বিশেষ করে কর্নারিংয়ের সময় এর গ্রিপ আত্মবিশ্বাস জোগায়। আমরা যেহেতু হুটহাট থ্রটল আর ব্রেকের ব্যবহার করছিলাম, সেহেতু গাড়ির চার্জও কমেছে বেশ। ৬৭ শতাংশ থেকে ফেরার পথে গাড়ির চার্জ দেখাচ্ছিল ৩২ শতাংশ। তবে সাধারণভাবে থ্রটল চাপলে আমরা এর দ্বিগুণ মাইলেজ পেতাম।

বিওয়াইডি সিল ৬ সেডান বিভাগে অন্যতম সাশ্রয়ী গাড়ি হলেও একটি সানরুফ থাকলে গাড়িটিকে আরও সুন্দর লাগত। এ ছাড়া এতে নেই কোনো তারবিহীন চার্জ দেওয়ার সুবিধা। গিয়ারের হাতলটি অন্যান্য গাড়ির সংকেত প্রদানের হাতলের জায়গায় থাকার কারণে মনের ভুলে সংকেতবাতি জ্বালাতে গিয়ে গিয়ার হাতলে চাপ পড়ে। এতে কোনো ক্ষতি নেই, তবে চালকের কিছু সময়ের জন্য অস্বস্তি লাগতে পারে। লুকিং গ্লাসে রিয়ার ব্লাইন্ড মনিটরিং সিস্টেম ও ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা নেই। এলইডি লাইটে যদিও রাতের সড়ক বেশ স্বচ্ছ দেখা যায়, তবে শীতকালে বা ঘন কুয়াশায় ফগলাইটের অভাব অনুভূত হতে পারে।

গাড়িতে আমাদের যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন বিওয়াইডির পণ্য উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী নাকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, শহরে নিত্যনৈমিত্তিক চলাচলের জন্য গাড়িটিতে সপ্তাহে একবার চার্জ দেওয়াই যথেষ্ট। আরামদায়ক যাত্রা ও চলাচলের খরচকে কমিয়ে দিতে সেডান ক্যাটাগরিতে বিওয়াইডি সিল ৬ তুলনাহীন। গাড়িটিতে ৬ বছর বা ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার (যেটা আগে আসে) পর্যন্ত বিক্রয়োত্তর সেবা পাওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, গাড়িটি চার্জ দেওয়ার জন্য ক্রেতাদের বাসায় বিনা মূল্যে একটি চার্জার স্থাপন করে দেবে বিওয়াইডি বাংলাদেশ। এ ছাড়া গাড়িকে যেকোনো স্থানে চার্জ দেওয়ার জন্য আরেকটি চার্জার দেওয়া হবে। গাড়িটির দাম ৫০ লাখ টাকার বেশি হবে না।

এস এম আলাউদ্দিন আল আজাদ

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব