‘বাংলার জয়যাত্রা’ ১১৫ দিন পর হরমুজ পার হলো
অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের এই জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে। ইরান...
অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের এই জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে। ইরান...
টানা ৭ দিন বন্ধ থাকার পর বেনাপোল বন্দর দিয়ে আজ সকাল থেকে দু'দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে। সোমবার (১ জুন)...
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে এল আরও একটি জাহাজ। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ‘এমটি শান গাং ফা জিয়ান’ নামের...
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা ২০২২ সালে কোনো নভোচারীকে ছাড়াই শুধু মহাকাশযান পাঠিয়ে আর্টেমিস–১ চন্দ্রাভিযান পরিচালনা করেছিল। ওই মহাকাশযান অভিযান শেষে...
চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে মালয়েশিয়া থেকে ২৬ হাজার টন অকটেন নিয়ে আসা হংকংয়ের পতাকাবাহী জাহাজ কিউচি। এপ্রিল মাসে আসা এটি অকটেনের তৃতীয় চালান। বুধবার...
চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৪ দিনে ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে। এর মাধ্যমে একক মাস হিসেবে রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে...
কেউ না বললেও মার্তার ১৭ গোলের রেকর্ড ভেঙেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন মেসি, যা যেকোনো জেন্ডারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। কে এই ''পেলে উইথ স্কার্টস'' জানেন কি?
নাম তাঁর মার্তা ভিয়েইরা দা সিলভা। ব্রাজিলিয়ান এই নারী ফুটবলারকে সবাই মার্তা নামেই চেনে। সবাই বলছে, জার্মানির বিখ্যাত ফুটবলার মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙেছেন মেসি কাল তাঁর ১৮তম বিশ্বকাপ গোল দিয়ে। কিন্তু কেউ না বললেও মার্তার ১৭ গোলের রেকর্ড ভেঙেই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন মেসি, যা যেকোনো জেন্ডারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিশেকাপ গোল। কে এই ''পেলে উইথ স্কার্টস'' জানেন কি?

তিনি সর্বকালের সেরা নারী ফুটবলার হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। ব্রাজিলে তাঁকে ভালোবেসে ডাকা হয় "রাইন্যা" (Rainha), যার অর্থ রানি। তবে মার্তার গল্প শুধু একজন ফুটবলারের গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে বিশ্বের শীর্ষে পৌঁছেছেন।
শৈশব ও পারিবারিক জীবন
মার্তার জন্ম হয় একটি দরিদ্র পরিবারে। তিনি যখন খুব ছোট, তখন তাঁর বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। মার্তা ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আলাগোয়াসের ছোট ও দরিদ্র শহর দোইস রিয়াশোসে জন্মগ্রহণ করেন। এটি ব্রাজিলের অন্যতম অনুন্নত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। তাঁর মা তেরেজা একাই মার্তা এবং তাঁর তিন ভাইবোন—হোসে, ভালদির ও অ্যাঞ্জেলাকে বড় করে তোলেন।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। অনেক সময় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। তাঁর মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন, যাতে সন্তানদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা যায়। শৈশবে মার্তা প্রায়ই খালি পায়ে ফুটবল খেলতেন। পরে যখন ব্যবহৃত পুরোনো বুট পেতেন, তখন সেগুলো বড় হওয়ায় ভেতরে সংবাদপত্র গুঁজে পায়ে ফিট করিয়ে খেলতেন। ফুটবল কেনার সামর্থ্য না থাকায় অনেক সময় ফেলে দেওয়া চুপসে যাওয়া বল কিংবা প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে বানানো বল নিয়ে খেলতেন।
তাঁর সময়ে মেয়েদের ফুটবল খেলাই ছিল অপরাধের পর্যায়ে
আজকের দিনে বিষয়টি কল্পনা করা কঠিন, কিন্তু মার্তার জন্মের মাত্র কয়েক বছর আগেও ব্রাজিলে নারীদের ফুটবল খেলা আইনত নিষিদ্ধ ছিল। যখন মার্তা ফুটবল খেলতে শুরু করেন, তখন তাঁর শহরে মেয়েদের কোনো ফুটবল দলই ছিল না। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলেও তাঁকে নানা কটূক্তি শুনতে হতো। অনেকেই মনে করতেন, ফুটবল মেয়েদের খেলা নয়।

তাঁর নিজের পরিবারের কিছু সদস্যও চাইতেন না যে তিনি ফুটবল খেলুক। বাবাহীন শৈশবের পাশাপাশি মার্তাকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং সামাজিক কুসংস্কারের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের ভাইয়েরাও ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য তাঁকে নিরুৎসাহিত করতেন। তাঁদের মতে, 'একটি মেয়ের বল নিয়ে খেলার চেয়ে পুতুল নিয়ে খেলা উচিত।' কিন্তু তাঁর মা সবসময় তাঁকে সমর্থন করেছেন। সেই সমর্থনই মার্তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
এক বাসযাত্রা বদলে দেয় জীবন
১৪ বছর বয়সে মার্তা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাড়ি ছেড়ে তিন দিনের দীর্ঘ বাসযাত্রায় রিও ডি জেনেইরো যান ভাস্কো দা গামা ক্লাবের ট্রায়াল দিতে।বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তিনি ভীষণ নার্ভাস ছিলেন। বাস আসার পর কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত উঠে পড়েন সেই বাসে—আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় তাঁর জীবন।

রিওতে পৌঁছে প্রথমেই তাঁর সাক্ষাৎকার নেন ভাস্কোর নারী ফুটবল সমন্বয়কারী হেলেনা পাচেকো। তিনি জানতে চান, মার্তা আগে কখনও সেভাবে ফুটবল খেলেছেন কি না। মার্তা জানান, তিনি কেবল ছোট মাঠে খেলেছেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় ফুটবল সরঞ্জাম আছে কি না, তিনি মাথা নেড়ে ‘না’ বলেন। তবে তাঁর চোখ যা বলেছিল, তা মুখের ভাষার চেয়েও শক্তিশালী ছিল। পুরো সাক্ষাৎকারজুড়ে তাঁর দৃষ্টি পাশের একটি ম্যাচে থাকা ফুটবলের ওপর স্থির ছিল। সেই চোখের প্রত্যয়ই তাঁর অসাধারণ প্রতিভার ইঙ্গিত দিয়েছিল। একজন দরিদ্র কিশোরীর জন্য এটি ছিল বিশাল ঝুঁকি। কিন্তু সেই যাত্রাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কোচরা দ্রুত বুঝতে পারেন যে এই মেয়েটির মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা আছে।
বিশ্বজয়ী হয়ে ওঠার গল্প
ব্রাজিলে শুরু হলেও মার্তার ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্রে। নিজের প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং অদম্য মানসিকতার মাধ্যমে তিনি নারী ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন। তিনি ছয়বার ফিফা বর্ষসেরা নারী ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন, যা এখনো একটি রেকর্ড। তাঁর মতো এতবার এই পুরস্কার আর কোনো নারী ফুটবলার জিততে পারেননি।

অবিশ্বাস্য রেকর্ড ও অর্জন
মার্তার নামের পাশে রয়েছে অসংখ্য রেকর্ড। পুরুষ ও নারী মিলিয়ে সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা ছিলেন তিনি কাল রাতে মেসির ১৮ গোলের রেকর্ড করার আগ পর্যন্ত। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নারী বা পুরুষ উভয় বিভাগের মধ্যে সর্বাধিক গোলের রেকর্ডধারী প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা পাঁচটি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন মার্তা। টানা পাঁচটি অলিম্পিক গেমসেও গোল করেছেন তিনি। ছয়বার ফিফা বর্ষসেরা নারী খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন।

তবে নারী হওয়ায় তিনি আসলে প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পান নি জীবনে। কিছুদিন আগে ব্রাজিলে পেলের পর দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলার নির্বাচনের আলোচনা হয়েছিল। সেখানে গ্যারিঞ্চা, রিভেলিনো, জিকো ও নেইমারের মতো নাম উঠে এলেও একবারও মার্তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। অথচ তিনি ছয়বারের বিশ্বসেরা নারী ফুটবলার এবং ব্রাজিলের পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। এই উপেক্ষাই প্রমাণ করে, স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তাঁকে কত দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে।
পেলে উইথ স্কার্টস উপাধি পাওয়া
"পেলে উইথ স্কার্টস" (Pelé with Skirts) মার্তার একটি বিখ্যাত ডাকনাম। ২০০৭ সালে ব্রাজিলের হয়ে পান আমেরিকান গেমসে অসাধারণ পারফরম্যান্স করার পর, দর্শক ও গণমাধ্যম তাঁর অসাধারণ দক্ষতা দেখে তাঁকে "Pelé de Saias" (পর্তুগিজ ভাষায় "স্কার্ট পরা পেলে") বলতে শুরু করে।


এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছিল যে নারী ফুটবলে মার্তার প্রভাব ও প্রতিভা পেলের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এই তুলনা শুনে পেলে নিজেও মার্তাকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন যে তিনি এই তুলনার অত্যন্ত যোগ্য। পরবর্তীতে মার্তার পায়ের ছাপ ব্রাজিলের বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামের হল অব ফেমে সংরক্ষণ করা হয়। প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে তিনি এই সম্মান অর্জন করেন।
মাঠের বাইরে মার্তার জীবন ও ফ্যাশন
মার্তার ব্যক্তিত্বে আছে আত্মবিশ্বাস, সরলতা এবং ব্রাজিলিয়ান প্রাণচাঞ্চল্যের মিশেল।
মাঠে তিনি সবসময় বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি পরেছেন, যে নম্বরটি পেলে, রোনালদিনহো, মেসি, ম্যারাডোনা ও জিনেদিন জিদানের মতো কিংবদন্তিরা পরেন ও পরেছেন।


মাঠের বাইরে তিনি সাধারণত আরামদায়ক পোশাক পরতে পছন্দ করেন। তাঁর ফ্যাশনে প্রায়ই উজ্জ্বল রঙ এবং আধুনিক স্ট্রিটওয়্যারের ছাপ দেখা যায়। আবার এলিগ্যান্ট স্যুটেও দেখা দেন তিনি। তবে অতিরিক্ত জাঁকজমকের চেয়ে তিনি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচারণায় তিনি অংশ নিয়েছেন।
সংগ্রাম, চোট ও ফিরে আসা
মার্তার ক্যারিয়ার শুধুই সাফল্যের গল্প নয়। তাঁকে একাধিক বড় চোটের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে। ২০২২ সালে তিনি গুরুতর হাঁটুর ইনজুরিতে আক্রান্ত হন। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁর ক্যারিয়ার শেষের পথে। কিন্তু মার্তা হার মানেননি। দীর্ঘ পুনর্বাসনের পর আবার মাঠে ফিরে আসেন এবং প্রমাণ করেন যে বয়স বা চোট তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারে না।

মানবিক কাজ ও সামাজিক প্রভাব
মার্তা শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একজন বৈশ্বিক অনুপ্রেরণাও। তিনি জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নারী অধিকার, শিক্ষা এবং লিঙ্গসমতার পক্ষে কাজ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর জন্যও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

কেন মার্তা এত বিশেষ?
মার্তার গল্প আসলে অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। যে মেয়েটি একসময় খালি পায়ে খেলত, ব্যবহৃত বুটে সংবাদপত্র গুঁজে মাঠে নামত, সমাজের অবহেলা সহ্য করত এবং এমন এক দেশে বড় হয়েছিল যেখানে একসময় নারীদের ফুটবল খেলাই নিষিদ্ধ ছিল—সেই মেয়েটিই পরবর্তীতে নারী ফুটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এই কারণেই মার্তা শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন; তিনি অধ্যবসায়, সাহস এবং স্বপ্নের শক্তির জীবন্ত প্রতীক।
সূত্র: উইকিপিডিয়া, ইনসাইড ফিফা
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
নাদিমা জাহান