যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত ইরানকে সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আবারও বলেছেন, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পর্যন্ত বিভিন্ন ইস্যুতে তেহরান যদি তাঁর শর্ত মেনে না নেয়, তবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না হলে আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘হয় আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নয়তো আমাদের খুব কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।’

ট্রাম্প এমন সময়ে নতুন হুমকি দিলেন, যখন কিনা ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি ওমানের সুলতান হাইতাম বিন তারিক আল সাইদের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা দুজন গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে হওয়া বৈঠকের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করছেন।

সাম্প্রতিক সময়গুলোয় ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বারবার বলেছেন। তিনি ইরানের কাছাকাছি অবস্থিত জরসীমায় বড় নৌবহর পাঠিয়েছেন। এ নৌবহরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের একটি বিমানবাহী জাহাজও আছে।

ইসরায়েলি চ্যানেল টুয়েলভ এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দ্বিতীয় আরেকটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর কথাও ভাবছেন। এমন অবস্থায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে। সমালোচকেরা বলছেন, এমন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে যেতে পারে।

গত সোমবার মার্কিন কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালনাধীন বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যেন ইরানের সামুদ্রিক সীমান্ত থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে।

গত জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প ইরানের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা যেকোনো সময় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আছে।

ট্রাম্প ইরানের পরিস্থিতিকে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

আল–জাজিরা

এ বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই ডেনমার্কের কাছে এক অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক দাবি তুলতে শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। শুধু দাবি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ছিল স্পষ্ট হুমকি। প্রয়োজনে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। তারা চাক বা না চাক, আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কিছু একটা করব।

ট্রাম্পের যুক্তি ছিল একটাই। চীন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডের দখল না নেয়, তাহলে রাশিয়া বা চীন তা দখল করে নেবে। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই রাশিয়া বা চীনকে প্রতিবেশী হিসেবে মেনে নেবে না। পরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাবিত গোল্ডেন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাটোর উচিত এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে না গেলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও এক ধাপ এগিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে রুশ ও চীনা যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু না করলে রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেবে। কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাস্তবে চীনের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডে কোনো সামরিক হুমকিই নেই। বিষয়টি মূলত কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নরওয়ের আর্কটিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং চীনের আর্কটিক কৌশল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মার্ক ল্যান্টিন স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে কোনো চীনা বা রুশ যুদ্ধজাহাজ নেই। সেখানে চীনের কোনো উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতিও নেই। খনিশিল্পে চীনের অবস্থান প্রায় শূন্য। চীনের উপস্থিতি বলতে মূলত গ্রিনল্যান্ডের সামুদ্রিক খাবার কেনা এবং সীমিত পর্যটন কার্যক্রমকেই বোঝায়।

বাস্তবে গ্রিনল্যান্ডে বড় ধরনের কোনো চীনা বিনিয়োগ নেই। অবকাঠামো কিংবা খনিশিল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যকর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। বিরল খনিজ নিয়ে আলোচিত কুয়ানারসুইট প্রকল্পে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অংশীদারত্ব ছিল। সেটিও ২০২১ সালে গ্রিনল্যান্ড সরকার ইউরেনিয়াম খনন নিষিদ্ধ করার পর বন্ধ হয়ে যায়।

একসময় অবশ্য গ্রিনল্যান্ড নিজেই চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল। ২০০৯ সালে স্বায়ত্তশাসন আইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব চীনকে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখেছিল। স্বাধীনতার পথে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন অর্জনের আশায় তাঁরা নিয়মিত চীনের খনি সম্মেলনে অংশ নিতেন। কিন্তু সেটি ছিল ২০১০–এর দশকের শুরুতে। সময়ের সঙ্গে চীন বদলেছে, আর বদলেছে গ্রিনল্যান্ডের দৃষ্টিভঙ্গিও।

গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক আচরণ বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গ্রিনল্যান্ডও বুঝতে পেরেছে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে এখন তারা অনেক বেশি সতর্ক।

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি।

ডেনমার্কও এই বিষয়টি গভীরভাবে নজরে রেখেছে। ২০১৮ সালে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডে বিমানবন্দর নির্মাণের একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। এর আগেই একটি পরিত্যক্ত নৌঘাঁটি চীনা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বন্ধ করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ পুরোপুরি উপেক্ষা করেনি।

গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। খনিশিল্পে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ করা হয়। ইউরেনিয়াম খনন আবার নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে চীনের সবচেয়ে আলোচিত খনি প্রকল্প কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে চীনের জন্য গ্রিনল্যান্ডে কাজ করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও চীনের আগ্রহ কমিয়েছে। বরফাচ্ছন্ন পরিবেশ, অবকাঠামোর অভাব এবং বছরের অর্ধেক সময় জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতা গ্রিনল্যান্ডে খনিশিল্পকে লাভজনক করে তোলে না। ফলে অনেক চীনা কোম্পানি লাইসেন্স নিয়েও প্রকৃত বিনিয়োগ করেনি এবং পরে সেই লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে।

চীন অবশ্য আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ হারায়নি। তারা নিজেদের নিকট আর্কটিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয় এবং ২০১৮ সালে পোলার সিল্ক রোডের ঘোষণা দেয়। বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নৌপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা তাদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এই কৌশলের বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আর্কটিকে চীনের প্রধান অংশীদার কেবল রাশিয়া এবং সেখানেও তাদের ভূমিকা সীমিত।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি উল্টো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। ১৯৫১ সাল থেকেই ন্যাটোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তাকাঠামো কার্যকর রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডে কোনো আগ্রাসন মানেই ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি। এ কারণেই রাশিয়া বা চীন কখনোই সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবেনি।

কিন্তু ট্রাম্প যখন ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধেই সামরিক শক্তির ইঙ্গিত দেন, তখন জোটের ভেতর ফাটল তৈরি হয়। এই বিভক্তি যদি গভীর হয়, তাহলে সেটিই চীন বা রাশিয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ যে পরিস্থিতি ট্রাম্প এড়াতে চান, তাঁর আচরণই সেটির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ন্যাটো মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প একটি কথিত সমঝোতার কথা জানান। সেখানে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানো, গ্রিনল্যান্ডে গোল্ডেন ডোম ব্যবস্থার ব্যবহার, খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং ন্যাটোর বাইরে থাকা দেশগুলোর প্রবেশ ঠেকানোর বিষয় থাকার কথা বলা হয়। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড স্পষ্ট করে জানায়, এটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়। এটি কেবল আলোচনার সূচনা।

গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব তাদের কাছে অচল সীমারেখা। ট্রাম্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি সেখানে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে এই উত্তেজনা ভবিষ্যতে আবারও ফিরে আসতে পারে।

আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোর কাছে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর সংকট হলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে অস্বীকার করেছেন। এর ফলে আর্কটিক কাউন্সিল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতায় চীন বিকল্প কাঠামো দাঁড় করানোর সুযোগ পেতে পারে এবং নিজেকে বিজ্ঞান ও জলবায়ু সচেতন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী অবস্থান কোনো বাস্তব চীনা হুমকির প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি এমন এক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে সত্যিকারের চীনা উপস্থিতির পথ খুলে দেবে। যে আশঙ্কা তিনি দেখাচ্ছেন, তাঁর নীতিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সেটিকে বাস্তবে রূপ দেবে।

*দ্য ডিপ্লোম্যাটের ভিডিও বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

কানাডার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একটি হাইস্কুলে ভয়াবহ এক বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ স্কুলে ঢুকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছেন এক বন্দুকধারী। 

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেইসঙ্গে আহত হয়েছেন অনেকে।

কানাডার স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ২০ মিনিটে এ হামলা ঘটনাটি ঘটেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে আল জাজিরা।

কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি)-এর বরাতে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওই হাইস্কুলটির নাম টাম্বলার রিজ সেকেন্ডারি স্কুল। হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে ৬ জনকে নিহত এবং আরও প্রায় ৩০ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেছে আরসিএমপি। 

আহতদের উদ্ধারের পর হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া, ২ জনের জীবন সংকটাপন্ন। বাকি ২৫ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

হামলাকারীকেও ঘটনাস্থল থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। হামলাকারী নিজেই নিজেকে ‘শেষ করে দিয়েছেন’ বলে ধারণা করছে আরসিএমপি।

 

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের প্রতিকৃতি উন্মোচন করা হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেডি মার্গারেট হলে শোভা পাচ্ছে প্রতিকৃতিটি। এ নিয়ে দ্বিতীয় কোনো পাকিস্তানির প্রতিকৃতি সেখানে স্থান পেল। মার্গারেট হলে এর আগে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছিল।

মালালার প্রতিকৃতিটি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী ইসাবেলা ওয়াটলিং। শুক্রবার অক্সফোর্ডে প্রতিকৃতি উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ২০০ জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অক্সফোর্ডের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ এবং মালালার পরিবারের সদস্যরা। উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্বামী আসার মালিকও। অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কথা বলেন মালালা।

ভাষণে মালালা বলেন, ‘পাকিস্তানের সাংলা থেকে তানজানিয়ার মিয়নকংগো স্কুল অথবা উত্তর লন্ডনের হ্যারো হাইস্কুল—যেখানেরই মেয়ে হোক না কেন, আমি আশা করি এই স্বীকৃতি সব জায়গার শিক্ষার্থীদের একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে। বার্তাটি হলো তারা এখানকারই অংশ এবং এই হলগুলোর ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নিজেদেরই দেখতে পাবে।’

পরে জিও নিউজের সঙ্গে আলাপচারিতায় মালালা বলেন, পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো তাঁর জন্য একটি অনুপ্রেরণা। বেনজিরের মতো তাঁর প্রতিকৃতিও মার্গারেট হলে স্থান পাওয়াটা সম্মানের। বেনজির শুধু পাকিস্তান নয় বরং পুরো বিশ্বের নারীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। তিনি বেনজিরকে সব সময় শ্রদ্ধা করে এসেছেন।

অক্সফোর্ড পাকিস্তান প্রোগ্রামের সহপ্রতিষ্ঠাতা তালহা জে পিরজাদা বলেন, ‘মালালা ইউসুফজাই শুরু থেকেই অক্সফোর্ড পাকিস্তান প্রোগ্রামের দৃঢ় সমর্থক। শিক্ষা ও সমতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকারের মাধ্যমে পাঁচজন অসাধারণ পাকিস্তানি নারীর জন্য অক্সফোর্ডের দরজা খুলে দিতে সহায়তা করেছেন তিনি। ওই নারীদের সবাই লেডি মার্গারেট হলে পড়াশোনা করেছেন।’

মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্ম ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই—উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সোয়াত জেলায়। পশতুন জাতিগোষ্ঠীর এক সুন্নি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তালেবানের বাধার পরও নারী শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাওয়ায় ২০১২ সালে তাঁকে গুলি করা হয়; কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

নারীশিক্ষা বিস্তারের পক্ষে কাজ করার জন্য মালালা ইউসুফজাই সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হন। তারই স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৪ সালে সবচেয়ে কম বয়সী হিসেবে ভারতের কৈলাস সত্যার্থীর সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান মালালা। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ তাঁকে শান্তির দূত হিসেবে নিয়োগ করে। ২০১৩ সালের ১২ জুলাই তাঁর ১৬তম জন্মদিনে ‘মালালা দিবস’ ঘোষণা করে জাতিসংঘ।

জিও নিউজ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য গতকাল সোমবার নতুন নির্দেশনা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিল দেশটি।

ইরান অতীতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। হরমুজ প্রণালির একটি অংশ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া ইরান বিভিন্ন সময় ওই পথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার আটক করেছে। তাদের অভিযোগ ছিল, এসব জাহাজ চোরাচালানে জড়িত।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গতকাল তাদের নির্দেশনায় মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে যতটা সম্ভব ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা থেকে দূরে থাকতে বলেছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ইরানি বাহিনী যদি জাহাজে ওঠার অনুমতি চায়, তবে তা মৌখিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

মেরিটাইম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তাদের ওয়েবসাইটে এ নির্দেশনা পোস্ট করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে যতটা সম্ভব ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

ইরানি বাহিনী যদি জাহাজে ওঠে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা ক্রুদের উচিত হবে না বলেও বলা হয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে বিমানবাহী রণতরির নেতৃত্বে একটি মার্কিন নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মোতায়েন করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন অনেকে।

তবে অতিসম্প্রতি ওমানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী মাসকাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকেরা এক পরোক্ষ আলোচনা করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত শুক্রবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের পারমাণবিক আলোচনা ভালোভাবে শুরু হয়েছে এবং তা চলবে।

ওমানে ওই আলোচনায় উভয় পক্ষই তেহরানের দীর্ঘস্থায়ী পারমাণবিক বিরোধ নিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ওয়াশিংটন বলেছে, তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন এবং মানবাধিকার–সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

ওমানে ওই আলোচনা শেষ হওয়ার পরপরই একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে ট্রাম্প ইরান থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পণ্য আমদানি করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

রয়টার্স

আরটি

কয়েক সপ্তাহ ধরে থাইল্যান্ডের শহর ও গ্রামগুলোতে বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’র কমলা রঙের প্রচার বাসগুলো সবার নজর কেড়েছে। ‘ভবিষ্যৎকে বেছে নিন’ শিরোনামে এ সফরে অংশ নিয়েছেন দলটির সংস্কারপন্থী রাজনীতিকেরা।

দলটির নির্বাচনী জনসভাগুলোয় পরিবর্তনের অঙ্গীকার শুনতে ভিড় করছেন হাজার হাজার মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধী দলের প্রার্থীদের ভিডিওগুলোও লাখ লাখবার দেখা হচ্ছে।

আজ রোববারের (৮ ফেব্রুয়ারি) সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের এ ব্যাপক জনসমর্থন অনেকের মনেই আশার সঞ্চার করেছে। তাঁরা মনে করছেন, পিপলস পার্টি যে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা হয়তো এবার হাতের নাগালে আসতে পারে।

আমাদের সৈনিকদের সংখ্যা (বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন) হয়তো বেড়েছে, কিন্তু রক্ষণশীলদের অস্ত্রভান্ডার এখনো বিধ্বংসী রকমের শক্তিশালী

তবে থাইল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানেই রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার পাওয়া নয়।

নিজেদের পরিচিতিমূলক রঙের কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘কমলা দল’ হিসেবে পরিচিত পিপলস পার্টি মূলত একটি প্রগতিশীল আন্দোলনের সর্বশেষ রূপ। থাইল্যান্ডের রাজতন্ত্রপন্থী রক্ষণশীল শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে এ আন্দোলন বারবার সংঘাতে জড়িয়েছে। দলটির পূর্বসূরি ২০২৩ সালের নির্বাচনে ৫০০ আসনের প্রতিনিধি সভায় ১৫১ আসন পেয়ে জয়ী হয়েছিল। তবে সামরিক বাহিনীর নিয়োগ দেওয়া সিনেট তাদের ক্ষমতায় যেতে বাধা দেয়। পরে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করার আহ্বানের দায়ে দেশটির সাংবিধানিক আদালত দলটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলছবি: রয়টার্স

‘ব্রেকিং দ্য সাইকেল’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্রের সহপরিচালক থানক্রিত দুয়াংমানিপর্ন বলেন, ‘আমাদের সৈনিকদের সংখ্যা (বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন) হয়তো বেড়েছে, কিন্তু রক্ষণশীলদের অস্ত্রভান্ডার এখনো বিধ্বংসী রকমের শক্তিশালী।’ তিনি আরও বলেন, এ প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ‘কমলা আন্দোলন’ (অরেঞ্জ মুভমেন্ট) নিয়ে তৈরি। তবে থানক্রিত আশা প্রকাশ করেন, ভোটে বিপুল জনসমর্থন দেখিয়ে দলটি হয়তো শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাধর ওই গোষ্ঠীকে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করতে পারবে।

থানক্রিত বলেন, ‘আমরা রোববারের ব্যালট যুদ্ধে লড়াই করব। আমাদের পক্ষে শুধু এটাই করা সম্ভব।’

পাল্টে দেওয়া জনমত

প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ থাইল্যান্ড গত দুই দশকের বেশি সময় (সিকি শতাব্দী) ধরে এক হতাশাজনক বৃত্তে আটকা পড়ে আছে। দেশটিতে বারবারই দেখা গেছে, সংস্কারপন্থী দলগুলো নির্বাচনে জয়লাভ করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালত, অভ্যুত্থান কিংবা রাজতন্ত্রের অনুগত বিচারক, জেনারেল ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

অনেকের আশঙ্কা, এবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে।

জনমত জরিপগুলোর আভাস অনুযায়ী, রোববারের নির্বাচনে আবারও সবচেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে ‘পিপলস পার্টি’। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের দৌড়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল দল ‘ভুমজাইথাই পার্টি’।

পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাফাইল ছবি: রয়টার্স

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের গত ৩০ জানুয়ারির এক জরিপ বলছে, প্রধানমন্ত্রী পদে পছন্দের তালিকায় ২৯ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন পিপলস পার্টির নেতা নাথাফং রুয়েংপানিয়াউত। ২২ দশমিক ৪ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তাঁর পরেই রয়েছেন অনুতিন। অন্যদিকে দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ নিয়ে এগিয়ে আছে পিপলস পার্টি এবং ২২ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভুমজাইথাই। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল ‘ফিউ থাই’ ১৬ দশমিক ২ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

থাইল্যান্ডে শীর্ষ পদের (প্রধানমন্ত্রী) জন্য একজন প্রার্থীকে অবশ্যই ২৫১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন পেতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, পিপলস পার্টি যদি এককভাবে এ সংখ্যা নিশ্চিত করতে না পারে; তবে রক্ষণশীল শক্তি, ফিউ থাই ও ছোট দলগুলোর সহায়তায় তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর ভুমজাইথাই পরবর্তী সরকার গঠন করতে পারে।

পিপলস পার্টির যাত্রার মূলে রয়েছে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টি’। অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমানোর অঙ্গীকার নিয়ে দলটি যাত্রা শুরু করেছিল। থাইল্যান্ডের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অভিজাত শ্রেণির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক প্রজন্মের সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ। ২০১৯ সালে নিজেদের প্রথম নির্বাচনেই দলটি ৮১টি আসন জিতেছিল।

তবে থাইল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানেই রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার পাওয়া নয়।

কিন্তু পরের বছরই আদালতের নির্দেশে দলটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে ‘মুভ ফরোয়ার্ড’ নামে নতুনভাবে গঠিত হয়ে ফিউচার ফরোয়ার্ড পার্টি ২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরের বছর আবারও আদালতের আদেশে বিলুপ্তির শিকার হয় তারা।

‘আমরা টাকা দিয়ে ক্ষমতা কিনি না’

পুনর্গঠিত পিপলস পার্টির (২০২৪ সাল) ৩২ বছর বয়সী আইনপ্রণেতা রুকচানোক শ্রিনর্ক মনে করেন, অতীতের পরাজয়গুলো যেন মানুষের আশা কেড়ে না নেয়। থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শহর চিয়াং মাইয়ে এক নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দল এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের রাজনীতি বদলে দিয়েছে।

রুকচানোক শ্রিনর্ক রাজনৈতিক মহলে ‘আইস’ নামে পরিচিত। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দল; যারা ভোট কেনায় একটি বাথও (থাইল্যান্ডের মুদ্রা) খরচ না করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছি।’ থাইল্যান্ডের বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ভোট কেনাবেচার যে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে তিনি এ মন্তব্য করেন।

থাকসিন সিনাওয়াত্রা
থাকসিন সিনাওয়াত্রাছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

রুকচানোক জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা ক্ষমতা কেনার জন্য টাকা ব্যবহার করি না।’

রুকচানোকের রাজনীতিতে উঠে আসার গল্পও দলের জনসমর্থনের প্রতিফলন। একসময় অনলাইনে পণ্য বিক্রেতা রুকচানোক দুর্নীতি ও সামরিক বাহিনীর বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। সেই জনসমর্থনে ভর করেই তিনি জাতীয় পরিষদে পা রাখেন। তিনি মনে করেন, তাঁর এ যাত্রা প্রমাণ করে, একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব।

রুকচানোক বলেন, ‘জনগণ যখন বুঝতে পারবে যে রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা আছে এবং তাদের কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ; তখন তারা রাজনীতির ওপর আশা হারাবে না।’

থাইল্যান্ড দুই দশকের বেশি সময় ধরে এক হতাশাজনক বৃত্তে আটকা পড়ে আছে। দেশটিতে বারবারই দেখা গেছে, সংস্কারপন্থী দলগুলো নির্বাচনে জয়লাভ করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদালত, অভ্যুত্থান কিংবা রাজতন্ত্রের অনুগত বিচারক, জেনারেল ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের হস্তক্ষেপে তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে এ আদর্শবাদই হয়তো শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হবে না। থম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিশেষজ্ঞ প্রিনিয়া থায়ওয়ানারুমিতকুল সতর্ক করে বলেন, গ্রামাঞ্চলে এখনো ‘টাকার রাজনীতি’ নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে; যদিও বর্তমানে ভোটারদের মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে তারা ‘টাকা নিলেও ভোট দেয় নিজের পছন্দ অনুযায়ী’।

প্রিনিয়া আরও বলেন, পিপলস পার্টির জন্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা তখনই বাস্তব হয়ে উঠবে, যদি তারা অন্তত ২০০ বা এর বেশি আসন নিশ্চিত করতে পারবে।

রক্ষণশীলদের পাল্টা প্রতিরোধ

জরিপগুলোতে যখন পিপলস পার্টির জয়জয়কার, ঠিক তখনই রাজতন্ত্রপন্থী রক্ষণশীল গোষ্ঠীর পছন্দের প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল।

নির্মাণ খাতের এক বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী এবং থাইল্যান্ডে গাঁজা বৈধকরণের অন্যতম কারিগর অনুতিন গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্তসংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায়ে দেশটির সাংবিধানিক আদালত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে পদ থেকে সরিয়ে দিলে তিনি এ সুযোগ পান।

(বিরোধী দল) পিপলস পার্টির জন্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা তখনই বাস্তব হয়ে উঠবে, যদি তারা অন্তত ২০০ বা এর বেশি আসন নিশ্চিত করতে পারবে
প্রিনিয়া থায়ওয়ানারুমিতকুল, থম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনুতিন সুকৌশলে সীমান্ত সংঘাত ঘিরে দেশপ্রেমের আবেগ কাজে লাগাচ্ছেন। গত ডিসেম্বরে যুদ্ধবিরতির আগে ওই সংঘাতে দুই দেশের অন্তত ১৪৯ জন নিহত হয়েছেন।

এ সপ্তাহে কম্বোডিয়া সীমান্তের কাছে এক জনসভায় অনুতিন বলেন, ‘যে কেউ বলতে পারেন, “আমাকে বেছে নিন এবং আপনারা পস্তাবেন না”। কিন্তু ভুমজাইথাই বলছে, সামরিক বাহিনী আমাদের পাশে আছে, আমরা কখনো পরাজিত হব না।’

 

অনুতিন তাঁর দলে ব্যবসায়ী ও কূটনীতিক মহলের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করেছেন। পাশাপাশি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর সমর্থনও আদায় করেছেন; যারা সাধারণত মন্ত্রিসভায় পদ পাওয়ার বিনিময়ে সমর্থন দিয়ে থাকে। তাঁর দল কিছু জনবান্ধব নীতিও হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যের অর্ধেক খরচ ভর্তুকি দেওয়ার কর্মসূচি সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

থাইল্যান্ডের পার্লামেন্ট ভবন
থাইল্যান্ডের পার্লামেন্ট ভবনফাইল ছবি: রয়টার্স

ব্যাংককে ভুমজাইথাইয়ের এক জনসভায় ৫৬ বছর বয়সী বুয়াপান আনুসাক বলেন, ‘আমি অন্য নীতিগুলো তেমন জানি না। তবে সীমান্ত পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে একজন দেশপ্রেমিক প্রধানমন্ত্রী হওয়া জরুরি।’

ভুমজাইথাই এখন ‘ফিউ থাই’ দলের আধিপত্য থাকা এলাকাগুলোতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। উল্লেখ্য, ২০০১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সালে পিপলস পার্টির উত্থানের আগপর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে ফিউ থাই জয়ী হয়েছিল।

ফিউ থাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ৭৬ বছর বয়সী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এখনো থাইল্যান্ডে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো জনহিতকর কাজের জন্য অনেকের কাছে নায়ক। তবে গত নির্বাচনে দ্বিতীয় হওয়ার পর সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করায় সংস্কারপন্থীদের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের অবস্থান হারিয়েছে দলটি (এখন সংস্কারপন্থীদের প্রধান কণ্ঠস্বরবিরোধী পিপলস পার্টি)। এর পর থেকে ফিউ থাইয়ের দুটি সরকার পতন হয়েছে এবং থাকসিনের মেয়ে পেতংতার্নসহ দুজন প্রধানমন্ত্রী আদালতের আদেশে পদ হারিয়েছেন।

থাকসিন বর্তমানে কারাগারে আছেন। মে মাসে তাঁর প্যারোলে মুক্তির আবেদন নিয়ে শুনানির কথা রয়েছে। ওই সময়ে থাইল্যান্ডে নতুন সরকার গঠন হতে পারে।

থম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক প্রিনিয়া বলেন, ‘থাকসিন এখনো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে ওস্তাদ।’ তিনি মনে করেন, থাকসিনের আইনি জটিলতা এবং তাঁর মেয়ের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর কারণে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বজায় রাখতে তিনি বড় ধরনের চাপে রয়েছেন।

এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সপ্তাহজুড়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার পর আজ শুক্রবার ওমানে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা শেষ হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই আলোচনার জন্য ওমানের রাজধানী মাসকটে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনায় অংশ নেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এই ইতিবাচক পথে এগিয়ে যেতে পারলে আমি বলতে পারি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা সংক্রান্ত ইতিবাচক এক কাঠামোতে পৌঁছাতে পারব।’

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও যোগ করেন, মাসকটে পরোক্ষভাবে ‘একাধিক বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আরাগচি বলেন, আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তবে বিস্তারিত বিষয়গুলো দুই দেশের রাজধানীতে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় হয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগগুলো যেমন জানানো হয়েছে, তেমনি আমাদের স্বার্থ এবং ইরানের জনগণের অধিকারের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশে আলোচনা শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে অন্য পক্ষের মতামতও শোনা হয়েছে।’

আল–জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্টের কয়েক শ কর্মীকে আকস্মিকভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে।

বুধবার(৪ ফেব্রুয়ারি) একদিনেই প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মীকে বিদায় করে দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩০০ জনেরও বেশি নিউজরুম বা সংবাদকক্ষের সাংবাদিক ও কর্মী রয়েছেন। খবর সিএনএনের।

ওয়াশিংটন পোস্টের মালিক জেফ বেজোস বর্তমানে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা বিভাগকে বার্ষিক লোকসান কমিয়ে এটিকে লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার টেকসই পথ খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছেন।

বুধবারের এই বড় ছাঁটাইকে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে একটি ‘নতুন দিনের সূচনা’ বলে অভিহিত করেছেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মারে বলেন, জেফ বেজোস এখনো প্রকাশনাটির প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তিনি চান প্রতিষ্ঠানটি আরও বড় ও আধুনিক হয়ে উঠুক।

তবে মারে বেজোসের প্রতি আস্থা প্রকাশ করলেও সংবাদমাধ্যমটির অধিকাংশ সাংবাদিক এই দর্শনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন। তাদের মতে, বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করে বা খরচ কমিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব নয়। অনেক সাংবাদিক উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চেয়েছেন, বেজোস কি শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বিক্রি করে দেবেন? কেউ কেউ পত্রিকাটির ঐতিহ্যের স্বার্থে একজন নতুন অভিভাবক বা মালিকের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন।

দ্য পোস্ট গিল্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যদি জেফ বেজোস এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক না হন, তবে নতুন অভিভাবক খোঁজা প্রয়োজন। কারণ প্রজন্ম ধরে ওয়াশিংটন পোস্ট লাখ লাখ মানুষের সেবা দিয়ে আসছে।

২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফরি পি বেজোস ওয়াশিংটন পোস্টের মালিকানা কিনেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক লোকসান ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনায় পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

 

ট্রাম্প প্রশাসন এবং চীন ও রাশিয়ার নেতাদের কারণে হুমকির মুখে পড়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষায় মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একটি কৌশলগত জোট গঠন করা উচিত। আজ বুধবার প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

৫২৯ পৃষ্ঠার বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০২৬-এর ৩৬তম সংস্করণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিশ্বজুড়ে ১০০টির বেশি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। প্রতিবেদনের শুরুতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ লিখেছেন, বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে প্রতিরোধ করা এই প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ থেকে শুরু করে মানুষকে তৃতীয় দেশে বহিষ্কার করাসহ সাম্প্রতিক মার্কিন সরকারের অপব্যবহার আইনের শাসনের ওপর প্রশাসনের আক্রমণকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। চীন ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলিত হয়ে; যার লক্ষ্য নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা—ট্রাম্প প্রশাসনের এসব কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে গভীর ও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ বলছেন, ‘বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থা গুরুতর ঝুঁকির মুখে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যাহত চাপ এবং চীন ও রাশিয়ার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের ফলে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার রক্ষাকারীরা যে কাঠামোর ওপর ভর করে মানদণ্ড এগিয়ে নেওয়া ও স্বাধীনতা সুরক্ষার কাজ করছিলেন, সেটিও ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে মানবাধিকারকে এখনো মূল্য দেয়—এমন সরকারগুলোকে সামাজিক আন্দোলন, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে একটি কৌশলগত জোট গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

বোলোপিওঁ বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পবিত্রতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন করেছেন। তিনি সরকারের জবাবদিহি কমিয়ে দিয়েছেন।

ট্রাম্প বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ করেছেন, আদালতের আদেশ অমান্য করেছেন, খাদ্যসহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি কাটছাঁট করেছেন, নারীর অধিকার খর্ব করেছেন, গর্ভপাতসেবা পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেছেন, বর্ণগত বৈষম্যের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলো দুর্বল করেছেন, ট্রান্স ও ইন্টারসেক্স মানুষের সুরক্ষা প্রত্যাহার করেছেন এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার তোয়াক্কা করছেন না।

ট্রাম্প সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, গণমাধ্যম, আইনজীবী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ এমনকি কৌতুকশিল্পীদেরও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন।

বোলোপিওঁ বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি উল্টে দিয়েছে। ট্রাম্প নিজেই গর্ব করে বলেছেন, কোনো ‘আন্তর্জাতিক আইন’ তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। তাঁকে থামানোর জন্য তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ যথেষ্ট।’

প্রশাসন হঠাৎ প্রায় সব মার্কিন বিদেশি সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন এমন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করেছে, যা বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধেও বড় ধাক্কা দিয়েছে। হলোকাস্টের ভয়াবহতা থেকে জন্ম নেওয়া এবং রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যার মাধ্যমে আবার উদ্দীপিত হওয়া ‘নেভার এগেইন’ আন্দোলন ২০০৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ গ্রহণের দিকে প্ররোচিত করেছিল।

আজ ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ প্রায় ব্যবহার হয় না এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

২০ বছর আগে মার্কিন সরকার এবং নাগরিক সমাজ দারফুরে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সুদানে আবারও অগ্নিসংযোগ চলছে। কিন্তু এবার ট্রাম্পের নেতৃত্বে তা তুলনামূলকভাবে বিনা বাধায় ঘটছে।

অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী জাতিগত নিধন এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা ঘটিয়ে চলছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে তারা ৭১ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করেছে। তাদের নির্বিচার হামলায় গাজার অধিকাংশ মানুষকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

এসব অপরাধকে বিশ্বব্যাপী অসমভাবে নিন্দা করা হয়েছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি অনুযায়ী ইসরায়েলের প্রতি প্রায় শর্তহীন সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন, এমন সময় যখন আন্তর্জাতিক আদালত জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো বিচারাধীন।

ইউক্রেনে ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগগুলো ক্রমাগত রাশিয়ার গুরুতর লঙ্ঘনের দায়কে কমিয়ে দেখিয়েছে। এই অপরাধ বন্ধ করতে পুতিনের ওপর যথাযথ চাপ প্রয়োগ করার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে তিরস্কার করেছেন, শোষণমূলক খনিজ চুক্তি দাবি করেছেন, ইউক্রেনকে ব্যাপক ভূখণ্ড ছাড়তে চাপ দিয়েছেন এবং যুদ্ধাপরাধের জন্য ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তির’ প্রস্তাব করেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ্পে বোলোপিওঁ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে মানবাধিকারকে উপেক্ষা করায় মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতৃত্ব উদারপন্থাবিরোধী অভ্যন্তরীণ শক্তির কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

নির্বাহী পরিচালক বলেন, যদি এসব দেশ একত্র হয়, তবে তারা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ব্লক হিসেবে উদ্ভূত হতে পারে। মানবাধিকারকে সমর্থন কখনই কেবল শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ বা নিখুঁত অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার রেকর্ড থাকা দেশগুলো থেকে আসেনি।

এই বৈশ্বিক জোট, যা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত—ট্রাম্পের নীতি মোকাবিলায় অন্যান্য প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের নীতি বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ও মানবাধিকার সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোকে দুর্বল করেছে।

এই নতুন মানবাধিকারভিত্তিক জোট জাতিসংঘে শক্তিশালী ভোটদানকারী ব্লক হিসেবেও কাজ করতে পারবে। এটি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামোর স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন দিতে পারে এবং এমন জোট তৈরি করতে পারে যা গণতান্ত্রিক মানদণ্ড এগিয়ে নিতে সক্ষম—এমনকি সুপারপাওয়ারের বিরোধিতা থাকলেও।

বোলোপিওঁ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এটি স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, যার বিস্তৃত প্রভাব বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর পড়বে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দরকার হবে ভোটার, নাগরিক সমাজ, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সরকারগুলোর দৃঢ়, কৌশলগত ও সমন্বিত উদ্যোগ।

ইসলামাবাদ