সাবমেরিনে (ডুবোজাহাজ) ব্যবহার করা হয়, এমন দুটি পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে যাওয়ার সময় একটি রুশ পণ্যবাহী জাহাজ রহস্যজনকভাবে ডুবে গেছে। চুল্লিগুলো সম্ভবত উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হচ্ছিল। স্পেনের উপকূল থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর জাহাজটি ডুবে যায়। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘উরসা মেজর’ নামে এ রুশ জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর থেকেই পুরো ঘটনা কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকা ছিল। তবে সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার মতো একটি প্রধান মিত্রদেশের কাছে রাশিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তর ঠেকানোর জন্য এটি কোনো পশ্চিমা সামরিক বাহিনীর এক বিরল ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গোপন অভিযান হতে পারে।

ইউক্রেন আক্রমণে মস্কোকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উন সেনা পাঠানোর ঠিক দুই মাসের মাথায় জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। সম্প্রতি জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের চারপাশে আকস্মিক সামরিক তৎপরতা এর মালামাল ও গন্তব্য নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।

জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ফ্লাইটের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু শনাক্তকারী বিশেষ ‘স্নিফার’ বিমান ডুবে যাওয়া জাহাজটির ওপর দিয়ে দুবার উড়ে গেছে। স্পেনের তদন্তপ্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানায়, জাহাজটি ডুবে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর একটি সন্দেহভাজন রুশ গুপ্তচর জাহাজ ধ্বংসাবশেষের স্থানটি পরিদর্শন করে। এরপর সেখানে আরও চারটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনা নিয়ে স্পেন সরকার খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের চাপের মুখে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তারা একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয় যে জাহাজটির রুশ ক্যাপ্টেন স্প্যানিশ তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ‘উরসা মেজর’ জাহাজে সাবমেরিনে ব্যবহৃত চুল্লির মতো ‘দুটি পারমাণবিক চুল্লির যন্ত্রাংশ’ ছিল। তবে সেগুলোয় পারমাণবিক জ্বালানি ভরা ছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।

কী কারণে ‘উরসা মেজর’ ভূমধ্যসাগরের তলদেশে তলিয়ে গেল, সেই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো এখনো অস্পষ্ট। স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, একটি সূত্রের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, জাহাজটির মূল কাঠামো বা খোল ছিদ্র করতে একধরনের বিরল টর্পেডো ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

ঘটনাটি ঘটেছিল জো বাইডেনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ সপ্তাহগুলোয়। সে সময় ইউক্রেন যুদ্ধ মস্কোর অনুকূলে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রেরও তীব্র ইচ্ছা কাজ করছিল।

উরসা মেজর জাহাজটি ‘স্পার্টা ৩’ নামেও পরিচিত। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক অভিযানে এ জাহাজটির দীর্ঘ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেখানে রুশ সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইউক্রেন আক্রমণে মস্কোকে সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উন সেনা পাঠানোর ঠিক দুই মাসের মাথায় জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। সম্প্রতি জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের চারপাশে আকস্মিক সামরিক তৎপরতা এর মালামাল ও গন্তব্য নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
 

২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর জাহাজটি ফিনল্যান্ড উপসাগরের উস্ত-লুগা জ্বালানি বন্দরে নোঙর করে। এরপর এটি সেন্ট পিটার্সবার্গের কনটেইনার টার্মিনালে চলে যায়। ১১ ডিসেম্বর যখন জাহাজটি রওনা দেয়, তখন এর প্রকাশ্য নথিপত্রে গন্তব্য হিসেবে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের বন্দর ভ্লাদিভোস্টকের নাম উল্লেখ করা ছিল।

নথিতে মালামাল হিসেবে দুটি বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’, ১২৯টি খালি শিপিং কনটেইনার ও ২টি বড় লিবহের ক্রেন বহনের কথা বলা হয়েছিল।

ওই বছরের অক্টোবর মাসে জাহাজটির মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, তাদের জাহাজগুলো পারমাণবিক সামগ্রী পরিবহনের অনুমতি পেয়েছে। উস্ত-লুগা বন্দরে উরসা মেজর জাহাজে মালামাল তোলার একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছে সিএনএন।

ফুটেজে দেখা যায়, জাহাজের খোলের ভেতর কনটেইনারগুলো এমনভাবে রাখা হচ্ছে, যাতে নিচে একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। পরে ওই ফাঁকা জায়গার ওপর বসানো হয় বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’ দুটি।

পর্তুগিজ নৌবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, জাহাজটি ফ্রান্সের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ার সময় তাদের যুদ্ধবিমান ও জাহাজগুলো এটি অনুসরণ (ট্র্যাক) করছিল। ‘ইভান গ্রেন’ ও ‘আলেকসান্দর ওত্রাকোভস্কি’ নামে রাশিয়ার দুটি যুদ্ধজাহাজ উরসা মেজরকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ২২ ডিসেম্বর সকালে পর্তুগিজ নৌবাহিনী জাহাজটির পিছু নেওয়া বন্ধ করে।

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্টাগেনা বন্দরের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর স্পেনের জলসীমায় জাহাজটির গতি নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এতে স্প্যানিশ উদ্ধারকারীরা রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করে জাহাজটি কোনো বিপদে পড়েছে কি না, জানতে চান। জাহাজের ক্রু বা নাবিকেরা উত্তর দেন, তাঁরা ভালো আছেন।

তবে তদন্তে দেখা যায়, এর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর জাহাজটি হঠাৎই এর নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়। ২৩ ডিসেম্বর ইউটিসি (কো-অর্ডিনেটেড ইউনিভার্সাল টাইম) সময় বেলা ১১টা ৫৩ মিনিটে জরুরি সহায়তার জন্য বার্তা পাঠানো হয় জাহাজটি থেকে।

কেউ যখন আপনার চাওয়া তথ্য পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয় যে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।হুয়ান আন্তোনিও রোহাস মানরিকে, স্পেনের সংসদ সদস্য
 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জাহাজটির ডান দিকে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণগুলো সম্ভবত এর ইঞ্জিন রুমের কাছাকাছি হয়েছিল। ফলে দুজন ক্রু নিহত হন। এ ঘটনায় জাহাজটি এক পাশে কাত হয়ে যায় ও পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। বেঁচে যাওয়া ১৪ জন ক্রু একটি লাইফবোটে করে জাহাজ থেকে নেমে আসেন।

পরে স্পেনের উদ্ধারকারী নৌযান ‘সালভামার ড্রাকো’ ক্রুদের উদ্ধার করে। সন্ধ্যা ৭টা ২৭ মিনিটে স্পেনের একটি সামরিক জাহাজ সহায়তার জন্য পৌঁছায় সেখানে। কিন্তু আধা ঘণ্টা পর, উরসা মেজরকে পাহারা দিয়ে আনা রাশিয়ার অন্যতম যুদ্ধজাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ কাছাকাছি থাকা অন্যান্য নৌযানকে দুই নটিক্যাল মাইল দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। পরে উদ্ধার করা ক্রুদের অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানায় তারা।

স্পেনের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান নেয়। জাহাজে কোনো জীবিত ব্যক্তি আটকে আছেন কি না, তা পরীক্ষা করতে তারা একটি হেলিকপ্টার পাঠায়। সিএনএনের দেখা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, স্পেনের একজন উদ্ধারকর্মী জাহাজের ইঞ্জিন রুমে প্রবেশের চেষ্টা করছেন; কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ সিলগালা বা অবরুদ্ধ অবস্থায় পান।

ভিডিও অনুযায়ী, ওই উদ্ধারকর্মী ক্রুদের থাকার জায়গায় কোনো জীবিত মানুষ আছে কি না, তা খোঁজেন এবং কনটেইনারগুলোর ভেতরে উঁকি দেন। সেখানে দুটি কনটেইনারের ভেতর ময়লা-আবর্জনা, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভরা ছিল। তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানিয়েছে, সে সময় উরসা মেজর জাহাজটি বেশ স্থিতিশীল ছিল এবং এটি দ্রুত ডুবে যাওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না।

রুশ পণ্যবাহী জাহাজ উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা স্পেনের কার্টাগেনা বন্দরে পৌঁছানোর পর একটি স্প্যানিশ উদ্ধারকারী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪
রুশ পণ্যবাহী জাহাজ উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা স্পেনের কার্টাগেনা বন্দরে পৌঁছানোর পর একটি স্প্যানিশ উদ্ধারকারী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ছবি: রয়টার্স
 

কিন্তু রাত ৯টা ৫০ মিনিটে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ‘ইভান গ্রেন’ দুর্ঘটনাস্থলের ওপর পরপর কয়েকটি লাল ফ্লেয়ার বা আলোকরশ্মি নিক্ষেপ করে। এর ঠিক পরপরই সেখানে চারটি বিস্ফোরণ ঘটে।

স্পেনের জাতীয় ভূকম্পন নেটওয়ার্ক সিএনএনকে জানিয়েছে, ঠিক ওই সময়ে এবং ওই এলাকার কাছাকাছি একই ধরনের চারটি ভূকম্পন তরঙ্গ বা সংকেত রেকর্ড করা হয়। সংকেতগুলোর ধরন পানির নিচের মাইন বিস্ফোরণ অথবা মাটির ওপর খনি বিস্ফোরণের মতো ছিল।

স্প্যানিশ তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানায়, রাত ১১টা ১০ মিনিটের মধ্যে উরসা মেজর জাহাজটি সম্পূর্ণ ডুবে গেছে বলে নিশ্চিত করা হয়।

উদ্ধার হওয়া রাশিয়ার ১৪ জন নাবিককে কার্টাগেনা বন্দর নগরীতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে স্পেনের পুলিশ ও তদন্তকারীরা তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে দেওয়া স্পেন সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রুশ ক্যাপ্টেন তাঁর নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে জাহাজের মালামাল সম্পর্কে কথা বলতে বেশ অনিচ্ছুক ছিলেন। জাহাজের নথিতে মালামাল হিসেবে যে ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’র কথা উল্লেখ ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার জন্য তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জাহাজের খোলের ভেতর কনটেইনারগুলো এমনভাবে রাখা হচ্ছে, যাতে নিচে একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। পরে ওই ফাঁকা জায়গার ওপর বসানো হয় বড় ‘ম্যানহোলের ঢাকনা’ দুটি।

অবশেষে রুশ ক্যাপ্টেন স্বীকার করেন যে ওগুলো মূলত সাবমেরিনে ব্যবহৃত চুল্লির মতো দুটি পারমাণবিক চুল্লির যন্ত্রাংশ ছিল। ক্যাপ্টেনের দাবি, চুল্লিগুলোয় কোনো পারমাণবিক জ্বালানি ছিল না। তবে স্পেনের তদন্তকারীরা তাঁর এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি।

তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানিয়েছে, ইগোর আনিসিমভ নামের ওই রুশ ক্যাপ্টেন ধারণা করেছিলেন, পারমাণবিক চুল্লি দুটি পৌঁছে দিতে জাহাজটিকে উত্তর কোরিয়ার রাসোন বন্দরে ঘুরিয়ে নেওয়া হবে। রাশিয়ার বিশাল রেল নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও ২টি ক্রেন, ১০০টি খালি কনটেইনার ও দুটি বড় ম্যানহোলের ঢাকনা বহন করার জন্য কেন এক রুশ বন্দর থেকে অন্য রুশ বন্দরে যাওয়ার মতো দীর্ঘ ও অস্বাভাবিক জলপথ বেছে নেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখছেন স্পেনের তদন্তকারীরা।

তদন্তে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে রাসোন বন্দরে পৌঁছানোর পর ওই সংবেদনশীল মালামাল খালাসের সুবিধার্থেই ক্রেন দুটি জাহাজে তোলা হয়েছিল। ঘটনার কয়েক দিন পর জাহাজের ক্রুদের রাশিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।

সিএনএন ওই রুশ ক্যাপ্টেনের নাম ও চেহারার সঙ্গে মিল থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে তিনি উরসা মেজর জাহাজের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন এবং নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত দাবি করেন।

জাহাজটি ডুবে যাওয়ার চার দিন পর এর মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস একে একটি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তারা জানায়, জাহাজে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটেছিল। জাহাজের খোলে ৫০ সেন্টিমিটার/৫০ সেন্টিমিটার আকারের একটি ছিদ্র পাওয়া গেছে, যার ক্ষতিগ্রস্ত ধাতব অংশটি ভেতরের দিকে দুমড়েমুচড়ে ছিল।

প্রতিষ্ঠানের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাহাজের ডেক বোমার স্প্লিন্টার বা টুকরায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।’

তদন্তের সঙ্গে পরিচিত সূত্রটি জানায়, এর এক সপ্তাহ পর রাশিয়ার সামরিক বাহিনী আবার দুর্ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। ‘ইয়ানতার’ নামের একটি জাহাজ উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষের ওপর টানা পাঁচ দিন অবস্থান করে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার একটি গবেষণা জাহাজ হিসেবে পরিচিত হলেও ন্যাটো জলসীমায় গুপ্তচরবৃত্তি এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে এর বিরুদ্ধে।

সূত্রটি জানায়, ইয়ানতার ওই স্থান ত্যাগ করার আগে সেখানে আরও চারটি বিস্ফোরণ শনাক্ত করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রের তলদেশে থাকা জাহাজের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করতেই এ বিস্ফোরণগুলো ঘটানো হয়েছিল।

বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর সামুদ্রিক যান চলাচল–সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে ‘ইয়ানতার’ জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। জাহাজটি প্রথমে মিসর ও পরে আলজেরিয়ায় নোঙর করে। ১৫ জানুয়ারি উরসা মেজরের ডুবে যাওয়ার স্থান থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) দূরে অবস্থানকালীন একটি সংকেত পাঠায় জাহাজটি।

ভূমধ্যসাগরের তলদেশে প্রধান প্রমাণ

এ ঘটনায় স্পেনের তদন্তের কিছু বিবরণ গত ডিসেম্বরে কার্টাগেনার স্থানীয় সংবাদপত্র লা ভেরদাদে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই স্পেনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। দেশটির সংসদ সদস্য হুয়ান আন্তোনিও রোহাস মানরিকে সিএনএনকে বলেন, ‘কেউ যখন আপনার চাওয়া তথ্য পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে দেয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ হয় যে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।’

সংসদ সদস্যদের কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পেন সরকার জানিয়েছে, উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিটার (৮ হাজার ২০২ ফুট) গভীরে রয়েছে। এত গভীর থেকে জাহাজের তথ্য ধারণকারী ‘ডেটা রেকর্ডার’(ব্ল্যাক বক্স) উদ্ধার করা বড় ধরনের কারিগরি সক্ষমতা ছাড়া অসম্ভব। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও।

তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, মালামালের মধ্যে যদি কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ না-ই থেকে থাকে, তবে সরকার এটিকে কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে? সাবেক মার্চেন্ট মেরিন ক্যাপ্টেন ও বর্তমান সংসদ সদস্য রোহাসও এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘আজকাল যেকোনো দুর্ঘটনায় ব্ল্যাকবক্সগুলো সাধারণত একটি লোকেটর বা অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্রসহ পানির ওপরে ভেসে ওঠে, যেন তা সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। আমার মনে হয়, ব্ল্যাকবক্সটি কারও না কারও হাতে রয়েছে। তবে সেটি স্পেনের কাছে রয়েছে, নাকি রুশরাই উদ্ধার করেছেন, আমরা জানি না।’

উরসা মেজর ডুবে যাওয়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীও এই এলাকার ওপর গভীর নজর রাখছে। উন্মুক্ত ফ্লাইটের তথ্য অনুযায়ী, নেব্রাস্কাভিত্তিক একটি বিরল ও অত্যাধুনিক পরমাণু শনাক্তকারী বিশেষ ‘স্নিফার’ বিমান (মডেল ডব্লিউসি১৩৫-আর) গত এক বছরে দুবার দুর্ঘটনাস্থলের ওপর দিয়ে উড়ে গেছে। এর মধ্যে প্রথমবার গত বছরের ২৮ আগস্ট ও দ্বিতীয়বার চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বিমানটি ওই এলাকায় যায়।

নেব্রাস্কার ওফুট ঘাঁটির ৫৫তম উইংয়ের মুখপাত্র ক্রিস পিয়ার্স ওই বিশেষ বিমানের ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বিমানটি সাধারণত ‘পারমাণবিক উপকরণের ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণের’ কাজে সহায়তা করে। তবে তিনি আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট ফ্লাইটের রুট বা পথ, অভিযানের ফলাফল কিংবা কোনো অংশীদার দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে আমরা বাড়তি কোনো তথ্য দিতে পারছি না।’

উরসা মেজর জাহাজটি ডুবে যাওয়ার ১৩ মাস আগেও আরেকটি ‘ডব্লিউসি১৩৫-আর’ বিমান প্রায় একই পথ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। এতে ইঙ্গিত মেলে, এই এলাকার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ জাহাজটি ডুবে যাওয়ার আগে থেকেই ছিল, অথবা এটি তাদের একটি নিয়মিত অভিযানের অংশ।

রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চল বা ইরানের পারমাণবিক তৎপরতা শনাক্ত করতে সাধারণত অত্যন্ত গোপনে এ বিরল ও ব্যয়বহুল বিমানগুলো ব্যবহার করা হয়। তবে উরসা মেজরের ধ্বংসাবশেষ থেকে তারা কোনো তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

স্পেন সরকারও তাদের দক্ষিণ উপকূলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো আশঙ্কার কথা জানায়নি, যা একটি জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

পারমাণবিক প্রযুক্তি ফাঁসের আশঙ্কা

উরসা মেজর জাহাজে থাকা পারমাণবিক চুল্লি দুটি উত্তর কোরিয়ার কাছে পাঠানো হচ্ছিল বলে যে দাবি উঠেছে, তার পেছনে একটি বড় কারণ রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়ার সরকার তাদের প্রথম পারমাণবিক সাবমেরিনের কিছু ছবি প্রকাশ করে। স্থির ছবিগুলোয় দেশটির শীর্ষ নেতা কিম জং–উনকে হাসিমুখে দেখা গেলেও সেখানে শুধু সাবমেরিনের সিলগালা করা মূল কাঠামোটিই দৃশ্যমান ছিল। এর ভেতরে প্রকৃতই কোনো কার্যকর পারমাণবিক চুল্লি আছে কি না, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ‘জেনস’-এর জ্যেষ্ঠ নৌ প্ল্যাটফর্ম বিশ্লেষক মাইক প্লাঙ্কেট বলেন, (উরসা মেজর জাহাজে থাকা) পারমাণবিক চুল্লিগুলো যদি নতুন হয়ে থাকে, তবে জ্বালানিসহ সেগুলো পাঠানোর সম্ভাবনা কম। তিনি আরও বলেন, ‘যদি এই চুল্লিগুলো বাতিল করা কোনো সাবমেরিন থেকে খোলা হয়ে থাকে, তবে সেগুলো অবশ্যই তেজস্ক্রিয় হবে। তবে পুরোদমে জ্বালানি ভরা চুল্লির মতো অতটা মারাত্মক হবে না।’

প্লাঙ্কেট মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত রাশিয়া সহজে নেয়নি। এটি শুধু অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেই সম্ভব। তাই এটি সত্য হলে তা হবে ‘মস্কোর একটি বড় চাল’। তিনি এ ধরনের যেকোনো তৎপরতাকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য।

স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়াকে রাশিয়ার একটি কৌশলগত মিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, পিয়ংইয়ং কীভাবে মস্কোকে তার পারমাণবিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে যুদ্ধ করার জন্য রাশিয়ার পক্ষে অন্তত ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করার পর পিয়ংইয়ংয়ের এ ধরনের দাবি বা চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

স্পেনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘উরসা মেজর’ জাহাজে করে সম্ভবত ‘ভিএম-৪এসজি’ মডেলের পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ মডেলের চুল্লি সাধারণত রাশিয়ার ‘ডেল্টা ফোর’ শ্রেণির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোয় ব্যবহার করা হয়। তবে এ দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে খুব সীমিত প্রমাণ দেওয়া হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টরের কাছ থেকে সিএনএন কিছু কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবি পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বরের ওই ছবিগুলোয় দেখা যায়, উরসা মেজর জাহাজটি ফিনল্যান্ড উপসাগরের উস্ত-লুগা বন্দরের পূর্ব প্রান্তে নোঙর করে আছে। জাহাজটির মালিকপ্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকসের অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা ভূ-অবস্থান চিহ্নিত ‘টাইম-ল্যাপস’ ভিডিওতেও সেখানে ক্রেন ও কনটেইনার তোলার চিত্র দেখা যায়।

তবে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর রাশিয়ার সংবাদপত্র ‘কোমারসান্ত’একটি ভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা দাবি করে, ভ্লাদিভোস্টকে নির্মাণাধীন একটি নতুন বরফকাটা জাহাজের পারমাণবিক চুল্লি ঢেকে রাখার ঢাকনা ও বন্দরের ক্রেন বহন করছিল উরসা মেজর।

রুশ পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে রহস্যময় সাদা বস্তু দুটির কোনো উল্লেখ ছিল না।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী ৮ হাজার ৭০০ টনের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়ার দাবি অনুযায়ী ৮ হাজার ৭০০ টনের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করেন, ছবি: রয়টার্স

জাহাজের খোলে ছিদ্র হলো কীভাবে

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য জেনেছেন, এমন একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন বলেছে, স্পেনের তদন্তকারীরা প্রথম কোন আঘাতের কারণে জাহাজটি পথ হারিয়েছিল ও কাত হয়ে গিয়েছিল, তা-ও খতিয়ে দেখছেন।

জাহাজের রুশ ক্যাপ্টেন তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, ২২ ডিসেম্বর যখন তাঁর জাহাজের গতি হঠাৎ কমে যায়, তখন তিনি কোনো আঘাত বা বিস্ফোরণের শব্দ শোনেননি। এর ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর ইঞ্জিন রুমের কাছে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ‘সেকেন্ড মেকানিক’ নিকিতিন ও মেকানিক ইয়াকোভলেভ নামের দুজন ক্রু নিহত হন। তাঁদের মরদেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

স্পেনের তদন্তকারীদের ধারণা, উরসা মেজরের খোলে ৫০ সেন্টিমিটার/৫০ সেন্টিমিটার আকারের যে ফুটো হয়েছে, তা মূলত ‘ব্যারাকুডা সুপারক্যাভিটেটিং টর্পেডো’র আঘাতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার পাশাপাশি গুটিকয়েক ন্যাটো মিত্রদেশ ও ইরানের কাছে এ ধরনের অত্যাধুনিক ও উচ্চ গতির টর্পেডো রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পানির ঘর্ষণ বা বাধা কমাতে এ টর্পেডোর সামনের অংশ থেকে বাতাস নির্গত হয়। ফলে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুর মূল কাঠামো ভেদ করতে পারে। এই প্রযুক্তির কিছু মডেলে জাহাজ ধ্বংস করার জন্য কোনো বিস্ফোরক ব্যবহারেরও প্রয়োজন পড়ে না।

তদন্তের সূত্রটি জানায়, এ ধরনের টর্পেডোর আঘাতের সঙ্গে উরসা মেজরের খোলে হওয়া ছিদ্রের আকার মিলে যায়। আর এ কারণেই ২২ ডিসেম্বর কোনো শব্দ ছাড়াই জাহাজটিতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছিল। ফলে সেটির গতি হঠাৎ থমকে যায়।

তবে অন্য বিশেষজ্ঞরা এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। ‘জেনস’-এর বিশ্লেষক মাইক প্লাঙ্কেট মনে করেন, ছিদ্রের আকার ও অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে এটি ‘লিম্পেট মাইন’-এর কাজ। তিনি বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা বস্তু জাহাজের খোলের গায়ে একটি বিশেষ বিস্ফোরক বসিয়ে দিয়েছিল।’

এ ঘটনার বিষয়ে জাহাজের রুশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওবোরোনলজিস্টিকস এবং রাশিয়া, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

সিএনএনের যোগাযোগ করা একাধিক পশ্চিমা নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ঘটনাটিকে ‘রহস্যময়’ বলে বর্ণনা করেছেন। স্পেনের তদন্তের কিছু সিদ্ধান্তকে তাঁদের কাছে ‘অতিরঞ্জিত’ মনে হলেও জাহাজটিতে প্রথম আঘাত বা রাশিয়ার এমন তীব্র প্রতিক্রিয়ার পেছনে অন্য কোনো স্বাভাবিক কারণ তাঁরা দেখাতে পারেননি। এ কারণে উরসা মেজর মালামালের প্রকৃত রহস্য ও এটি ডুবে যাওয়ার কারণ এখনো সমুদ্রের তলদেশেই চাপা পড়ে রয়েছে।

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব