যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই ইরান নিজেদের সামরিক–পারমাণবিক ক্ষেত্র ও স্থাপনা মেরামত এবং নতুন অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। সম্প্রতি কয়েকটি স্যাটেলাইট ইমেজ পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরান তাদের একটি সংবেদনশীল সামরিক ক্ষেত্রে নতুন একটি স্থাপনা তৈরির পর সেটির ওপর কংক্রিটের ঢাল তৈরি করে তা মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে।

স্যাটেলাইট দিয়ে তোলা এসব ছবিতে দেখা যাচ্ছে, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পারমাণবিক স্থাপনার সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢেকে দিয়েছে ইরান। অন্য একটি স্থাপনার কাছে সুড়ঙ্গের প্রবেশদ্বারগুলোকে মজবুত করেছে এবং সংঘর্ষের সময় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো মেরামত করেছে।

গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানে কয়েকটি পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে যেসব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—

পারচিন সামরিক কমপ্লেক্স

রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত পারচিন কমপ্লেক্স ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটির একটি।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, তেহরান দুই দশকের বেশি সময় আগে সেখানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ সম্পর্কিত পরীক্ষা চালিয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার ইরানের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এখানে ওপরে হামলার আগের এবং নিচে হামলার পরের ছবি
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার ইরানের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এখানে ওপরে হামলার আগের এবং নিচে হামলার পরের ছবি, ছবি: রয়টার্স
 

ইরান সব সময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল বারবার পারচিনে হামলা চালায়।

ওই হামলার আগে ও পরে তোলা স্যাটেলাইট ছবি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, হামলায় পারচিনের একটি আয়তাকার ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সেখানে পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

১২ অক্টোবর ২০২৫ এর ছবিতে সেখানে আরও উন্নয়ন কার্যক্রমের তৎপরতা চিত্রে দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি নতুন ভবনের কাঠামো দেখা যাচ্ছে, তার পাশে দুটি ছোট ভবন। ১৪ নভেম্বরের ছবিতে কাজের অগ্রগতি স্পষ্ট। সেদিনের ছবিতে বড় ভবনের ওপর কংক্রিটের ছাদ বসানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তারপর ১৩ ডিসেম্বরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, স্থাপনার কিছু অংশ ঢেকে গেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারির ছবিতে স্থাপনাটি সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কংক্রিটের একটি কাঠামোর আড়ালে সেটিকে লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) ২২ জানুয়ারি তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ওই স্থাপনার নতুন নির্মিত ভবনের চারপাশে কংক্রিটের ঢিবির মতো কাঠামো নির্মাণের কাজ অগ্রসর হচ্ছে। তারা ওই স্থাপনাটিকে তলেঘান–২ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ইস্পাহান পারমাণবিক কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ মাটিতে ঢাকা

ইস্পাহান কমপ্লেক্স হলো ওই তিনটি ইরানি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি, যেখানে গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র বোমা হামলা চালিয়েছিল।

পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের অংশ হিসেবে থাকা স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি ইস্পাহান কমপ্লেক্সে একটি ভূগর্ভস্থ এলাকা রয়েছে। কূটনীতিকদের ধারণা, ইরানের বেশির ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ভূগর্ভস্থ ওই এলাকায় সংরক্ষিত আছে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইস্পাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সে সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢাকা রয়েছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা
স্যাটেলাইটের ছবিতে ইস্পাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সে সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বারগুলো মাটিতে ঢাকা রয়েছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা, ছবি: রয়টার্স
 

আইএসআইএস জানিয়েছে, জানুয়ারির শেষ দিকে তোলা ছবিতে ইস্পাহান কমপ্লেক্সের দুটি সুড়ঙ্গ প্রবেশদ্বার মাটিতে ঢাকার নতুন প্রচেষ্টা দেখা গেছে।

৯ ফেব্রুয়ারি হালনাগাদ তথ্যে আইএসআইএস বলেছে, তৃতীয় প্রবেশদ্বারও মাটিতে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে গেছে। এর অর্থ, এখন সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সটির সব প্রবেশদ্বার ‘সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে’।

নাতাঞ্জের কাছের কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গের মুখগুলো মজবুত করা হয়েছে

আইএসআইএস জানিয়েছে, স্যাটেলাইট ছবিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি পাহাড়ের নিচে থাকা সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের দুটি প্রবেশপথ ‘শক্তিশালী ও প্রতিরক্ষামূলকভাবে মজবুত’ করার কাজ চলছে।

নাতাঞ্জে ইরানের বাকি দুটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র রয়েছে। পাহাড়ের নিচে থাকা এই সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সটি নাতাঞ্জ কমপ্লেক্স থেকে ২ কিলোমিটার দূরে।

স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি স্থাপনার দুইটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথকে শক্তিশালী ও মজবুত করার কাজ চলছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা
স্যাটেলাইটে তোলা ছবিতে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছের একটি স্থাপনার দুইটি সুড়ঙ্গ প্রবেশপথকে শক্তিশালী ও মজবুত করার কাজ চলছে। এই ছবিটি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ তোলা, ছবি: রয়টার্স
 

আইএসআইএস আরও বলেছে, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পুরো কমপ্লেক্সজুড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। ছবিতে সেখানে বহু যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ডাম্প ট্রাক, সিমেন্ট মিক্সার এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতিও রয়েছে।

‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি নিয়ে ইরান কী পরিকল্পনা নিয়েছে, তা স্পষ্ট নয় বলেও জানিয়েছে আইএসআইএস।

দক্ষিণ শিরাজের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি

দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি মাঝারি-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম ইরানের ২৫টি প্রধান ঘাঁটির একটি। ইসরায়েলি সংস্থা আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত বছরের যুদ্ধে এই স্থাপনাটি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির শিকার হয়েছে।

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইরানের শিরাজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। বাম দিকের ছবিতে (৩ জুলাই ২০২৫) পুনর্নির্মাণের আগে এবং ডান দিকের ছবিতে (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজের পর ঘাঁটির অবস্থা দেখা যাচ্ছে

স্যাটেলাইটের ছবিতে ইরানের শিরাজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। বাম দিকের ছবিতে (৩ জুলাই ২০২৫) পুনর্নির্মাণের আগে এবং ডান দিকের ছবিতে (৩০ জানুয়ারি ২০২৬) পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজের পর ঘাঁটির অবস্থা দেখা যাচ্ছে,ছবি: রয়টার্স

৩ জুলাই ২০২৫ এবং ৩০ জানুয়ারি তোলা ছবিগুলোর তুলনা করলে দেখা যায়, ঘাঁটির প্রধান লজিস্টিকস এলাকা এবং সম্ভাব্য কমান্ড কম্পাউন্ডে পুনর্নির্মাণ ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে।

কোম ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি

আলমার মতে, কোম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই ঘাঁটির ভূপৃষ্ঠের ওপরের অংশ মাঝারি মাত্রার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গুডহাইন্ডের মতে, ১৬ জুলাই ২০২৫ এবং ১ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবিগুলোর তুলনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ওপর একটি নতুন ছাদ তৈরি করা হয়েছে। ছাদ মেরামতের কাজ ১৭ নভেম্বর শুরু হয়েছিল এবং সম্ভবত ১০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

রয়টার্স

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব