বিপিএলের সর্বশেষ দ্বাদশ (২০২৫–২৬ মৌসুম) আসরে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধির বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে খেলোয়াড়, দলীয় কর্মকর্তা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মিলিয়ে ৪ জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিসিবি। অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য তাদের ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে বলে আজ বিসিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে জানানো হয়েছে, কথিত বেটিং-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম, দুর্নীতিমূলক যোগাযোগ, কোডের ৪.৩ ধারার অধীনে জারি করা ডিমান্ড নোটিশ মানতে ব্যর্থতা, প্রাসঙ্গিক যোগাযোগ ও তথ্য গোপন বা মুছে ফেলা এবং নির্ধারিত দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা এর তদন্তে অসহযোগিতা।
অভিযুক্তরা হলেন চিটাগং রয়্যালসের লজিস্টিক ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান, নোয়াখালী এক্সপ্রেসের সহ–মালিক মো. তৌহিদুল হক, ক্রিকেটার অমিত মজুমদার ও সিলেট টাইটানসের টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী।
এছাড়া বিসিবি তাদের ‘এক্সক্লুডেড পারসন পলিসি’র আওতায় সামিনুর রহমানকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ বিপিএলে তিনি চট্টগ্রাম রয়্যালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিপিএলের ৯ম, ১০ম ও ১১তম আসরসহ একাধিক আসরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত দুর্নীতিমূলক কার্যক্রমের তদন্তের পর তাঁর ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছেন, দ্বাদশ বিপিএলের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তটি করেছেন বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের প্রধান পরামর্শক অ্যালেক্স মার্শাল। তবে এর আগে একাদশ বিপিএলে ওঠা ফিক্সিংয়ের বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করে গত বছরের অক্টোবরে বিসিবির কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি।
ফারুক আহমেদ সভাপতি থাকার সময় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দারকে প্রধান করে গঠিত সেই তদন্ত কমিটিতে আরও ছিলেন আইনজীবী ড. খালেদ এইচ চৌধুরী ও সাবেক ক্রিকেটার শাকিল কাসেম।
তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সেসব অভিযোগ নিয়েও অধিকতর তদন্ত করছেন অ্যালেক্স মার্শাল। তবে সেই তদন্ত এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। আজ বিপিএল নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিসিবির অন্তবর্তী সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, অভিযুক্ত বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকবে, তবে পরবর্তি নোটিস না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা ক্রিকেটীয় কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন।
বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের বর্তমান প্রধান ফাহিম সিনহাকে সঙ্গে নিয়ে করা আজকের সংবাদ সম্মেলেনে দ্বাদশ আসরের আরও কিছু অনিয়ম তুলে ধরেন তামিম। এসব অনিয়মের কথা এর আগেও বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তবে বিসিবি থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। বিপিএলের দ্বাদশ আসরে বিসিবি সভাপতি ছিলেন আমিনুল ইসলাম, বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলেরও প্রধান ছিলেন তিনি। সদস্য সচিব ছিলেন ইফতেখার রহমান।
দ্বাদশ আসরের অনিয়ম সম্পর্কে তামিম বলেছেন, ‘অ্যালেক্স মার্শাল জানিয়েছেন, ইওআইর আগে দুজন ব্যক্তির ব্যাপারে ইনটিগ্রিটি ইস্যু বলে বলা হয়েছিল তাদেরকে যেন ফ্র্যাঞ্চাইজি না দেওয়া হয়। কিন্তু তখনকার গভর্নিং কাউন্সিলের কয়েকজন নাকি খুব জোর করে একজনকে বাধ্য করেছে তাদেরকে টিম দিতে এবং আরেকজনের ক্ষেত্রে একটু লিনিয়েন্সি শো করে। ওই ব্যক্তি নিজে সামনে না থেকে পেছনে থেকে আরেকজনকে সামনে দিয়ে দিয়েছে।’
সঙ্গে যোগ করেছেন, ‘সবচাইতে বিস্ময়কর জিনিস যেটা দেখলাম, দুইটা দলের সঙ্গে এখন পর্যন্ত চুক্তিই হয়নি, অথচ একটা সংস্করণ খেলে ফেলেছে!’ ফ্র্যাঞ্চাইজি দুটির নামও বলেছেন তামিম—সিলেট টাইটানস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেস।

বিপিএলের সর্বশেষ আসরে বিসিবির ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তামিম। এ ছাড়া ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাই, ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান, খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজির চুক্তি ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম আর সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তামিম। তাঁর মতে এসব সমস্যা দূর না হলে এবং ভালো ফ্র্যাঞ্চাইজি না পেলে বিপিএল না হওয়াই ভালো, তাতে অন্তত দেশের ক্রিকেটের দুর্নাম হবে না। এসব সমস্যার পেছনে ফ্র্যাঞ্চাইজির পাশাপাশি বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দায় দেখেন তিনি।
তামিমের প্রশ্ন, ‘কেন আপনারা এই টিমগুলোকে দিচ্ছেন যাদেরকে নিয়ে অবজেকশন আছে? এটার পেছনে কি কারণ, কারা এটার সাথে জড়িত? এই জিনিসগুলো তুলে ধরার এটাই সময়। যদি (বিপিএল) পরিচ্ছন্ন করতে হয়, উপর থেকে নিচে পর্যন্ত প্রত্যেকটা জায়গায় ধরতে হবে। কারণ বিসিবি সব দিক থেকে এই জায়গাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
এসবে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বা সব ঠিক না হলে বিপিএল আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত অন্তবর্তী বোর্ড নেবে কিনা, এমন এক প্রশ্নে তামিম বলেছেন, ‘একদমই না। আমি এই সিদ্ধান্ত নিব না। যেটা করার সময় আমার হাতে নেই ওরকম কোনো সিদ্ধান্ত আমি নিব না। তবে এই জিনিসগুলো প্রকাশ করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেন বিপিএল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এটা জানার অধিকার সবাই রাখে।’
তামিমের আশা ভবিষ্যতে যারাই বোর্ডে আসবেন, এ বিষয়টা মাথায় রাখবেন।