ফিফা বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে আগামী ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচারস্বত্ব কেনার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়ে গেছে। এ জন্য বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যম ও স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ ও ২০৩৪ বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে বর্তমান স্বত্বধারী ফক্সকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় নেটফ্লিক্স, ডিজনি এবং অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন ইউটিউব। সেটি হলে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচারস্বত্ব টেলিভিশনের বদলে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের হাতে যেতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সম্প্রচারস্বত্বধারী অ্যামাজন এবং বৈশ্বিকভাবে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) স্বত্বধারী অ্যাপলও প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। এতে সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে বড় ধরনের নিলাম বা দরপত্রযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, আগামী তিন মাসের মধ্যে সম্ভাব্য গণমাধ্যম অংশীদারদের সঙ্গে ফিফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের শুরুতে প্রাথমিক আলোচনায় ফিফা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানিয়েছে, ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার সম্প্রচারস্বত্ব আগামী দিনে আলাদাভাবে নয়, একসঙ্গেই বিক্রি করার সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপসহ আগের আসরগুলোতে দুটি ভাষার স্বত্ব আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়েছে।

দ্য অ্যাথলেটিকের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত চলতি বিশ্বকাপের ইংরেজি ভাষার সম্প্রচারস্বত্বের জন্য ফক্স ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার দিয়েছে। অন্যদিকে স্প্যানিশ ভাষার স্বত্ব কিনতে এনবিসিইউনিভার্সালের টেলেমুন্ডো পরিশোধ করেছে ৬০ কোটি ডলার।

আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ২০৩০ ও ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সব ভাষার সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে।

ফিফা সর্বশেষ ২০১১ সালে ফক্স ও টেলেমুন্ডোর সঙ্গে সম্প্রচারস্বত্বের চুক্তি করেছিল। পরে ২০১৫ সালে সেই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বত্বই সবচেয়ে আকর্ষণীয়

বিভিন্ন দেশের সম্প্রচার-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ফিফা বিশ্বকাপের বৈশ্বিক সম্প্রচারস্বত্ব এককভাবে বিক্রি করতে পারে না। বিপুল দর্শক ও বিজ্ঞাপন আয়ের সম্ভাবনার কারণে বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, নেটফ্লিক্স, ডিজনি ও ইউটিউব—তিন প্রতিষ্ঠানই বিশ্বকাপকে নিজেদের স্ট্রিমিং সেবার গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।

ডিজনি চাইলে ইএসপিএন ও এবিসির মাধ্যমেও ম্যাচ সম্প্রচার করতে পারবে। এটি ফিফার কাছেও আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ, চলতি বিশ্বকাপে ফক্সের সম্প্রচারে বিপুলসংখ্যক দর্শক দেখা গেছে। এর আগে ২০২৭ ও ২০৩১ সালের নারী বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব নেটফ্লিক্সকে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে ফিফা।

তবে ফিফা, নেটফ্লিক্স, ইউটিউব ও ডিজনির মুখপাত্ররা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

* ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে জমছে স্ট্রিমিং লড়াই।
* সব ভাষার সম্প্রচারস্বত্ব কিনতে ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে গণমাধ্যমগুলো।
* ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার স্বত্ব একসঙ্গে বিক্রির কথা ভাবছে ফিফা।
* বিশ্বকাপকে স্ট্রিমিং সেবার গ্রাহক বৃদ্ধির বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো।
* সময়ের পার্থক্য একটি চ্যালেঞ্জ হলেও রেকর্ড দর্শকসংখ্যার কারণে সম্প্রচারস্বত্বের দাম বাড়তে পারে।

একসঙ্গে স্বত্ব বিক্রির সুবিধা

ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার সম্প্রচারস্বত্ব একসঙ্গে বিক্রি করলে ফিফা আরও বেশি দাম পেতে পারে। একই সঙ্গে বিপুল দর্শকের আশায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বাড়বে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর সম্মিলিত টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা এনএফএলের প্লে-অফ ম্যাচগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে।

এ ছাড়া একই ম্যাচ সম্প্রচারকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান কিছু বিরোধও কমতে পারে। যদিও টেলেমুন্ডো ২০২৬ সাল পর্যন্ত শুধু স্প্যানিশ ভাষার স্বত্ব কিনেছে। তাদের দাবি, ইংরেজিভাষী কিছু দর্শকও পিকক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ দেখছেন। এতে ফক্সের দর্শকসংখ্যা কিছুটা কমেছে।

পিককের মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি ১০ দশমিক ৯৯ ডলার। অন্যদিকে ফক্সের স্ট্রিমিং সেবা ফক্স ওয়ানের মাসিক খরচ ১৯ দশমিক ৯৯ ডলার।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দুই ভাষার স্বত্ব একসঙ্গে বিক্রি করা হলে এবং দাম ২০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে এনবিসিইউনিভার্সালের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে টেলেমুন্ডো ভবিষ্যতে ফিফার অংশীদার না-ও থাকতে পারে।

গত মাসে কমকাস্ট ঘোষণা দিয়েছে, তারা এনবিসিইউনিভার্সালকে আলাদা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেবে। ফলে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের নজর আরও বাড়বে। এরই মধ্যে এনবিসিইউ প্রতিবছর এনএফএলের সানডে নাইট ফুটবল এবং এনবিএ বাস্কেটবলের সম্প্রচারস্বত্ব বাবদ শতকোটি ডলার ব্যয় করছে।

এনবিসির একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সময়ের পার্থক্য বড় চ্যালেঞ্জ

আগামী ২০৩০ ও ২০৩৪—দুই বিশ্বকাপই এমন দেশে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সময়ের পার্থক্যের কারণে তা যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন দর্শকদের জন্য খুব বেশি সুবিধাজনক হবে না।

২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময়ের তুলনায় এই অঞ্চলের সময়ের পার্থক্য থাকবে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব। তাদের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য আরও বেশি।

তার পরও চলতি বিশ্বকাপে রেকর্ডসংখ্যক দর্শকের কারণে ভবিষ্যৎ সম্প্রচারস্বত্বের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচই নয়, অন্যান্য ম্যাচও উল্লেখযোগ্য দর্শক টেনেছে। ফক্সে সম্প্রচারিত পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচটি ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্র খেলেনি—এমন ম্যাচগুলোর মধ্যে এটিই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দর্শকের দেখা বিশ্বকাপ ম্যাচ।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব