ঢাকার সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জুলাই পদযাত্রার পর সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রাত পৌনে ১০টার দিকে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠ এলাকায় দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের উপস্থিতিতে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। প্রশাসনের সহায়তায় সমাবেশে এই ককটেল হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এনসিপি।

বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিরা হলেন মো. শাহীন খন্দকার (৩০), মো. জসিম (২৬), মো. শাহাদাত হোসেন (৪০) ও ইমরান হোসেন। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় পরে সাভার মডেল থানার সামনে বিক্ষোভ করছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।

এনসিপির নেতা–কর্মীরা জানান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘোষিত কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার ঢাকার সাভারে পদযাত্রা ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। রাত সাড়ে নয়টার দিকে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হন দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। পরে সেখান থেকে তাঁরা পদযাত্রা শুরু করেন। পদযাত্রাটি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তারাপুর ঈদগাহ মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের আহ্বায়ক নাবিলা তাসনিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ ছাড়া আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক জাহিদ আহসান।

এনসিপির নেতা-কর্মীরা জানান, রাত পৌনে ১০টার দিকে নাবিলা তাসনিদের বক্তব্য চলাকালে মঞ্চের সামনের দিকে উপস্থিত লোকজনের মধ্যেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত চারজনকে সমাবেশস্থলের পাশেই বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক হাসান বলেন, ‘আমরা চারজন রোগী পেয়েছি। এর মধ্যে একজনের পায়ের আঘাত কিছুটা গুরুতর ছিল। তিনজনকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে ওটিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে এক্স–রে বা অন্য কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হলে সেখান থেকেই দেওয়া হবে। রোগীরা বোমা বিস্ফোরণের কথা বলেছেন।’

বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়
বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়
 

প্রশাসনের সহায়তায় হামলার অভিযোগ

এ ঘটনার পর ক্ষোভ জানিয়ে বক্তব্য দেন এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রশাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে নাই, প্রশাসনকে এর জবাব দিতে হবে। আপনারা ককটেল ফোটান, গুলি চালান, বোমাবাজি করুন—এনসিপির জুলাই পদযাত্রা চলমান থাকবে। সারা বাংলাদেশের আনাচকানাচে প্রতিটি উপজেলায় আমরা জুলাই পদযাত্রা নিয়ে যাব। স্থানীয় এমপি (সংসদ সদস্য) সে কী করে? সে কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এই এলাকার মানুষের? আজকে আমাদের এখান থেকে অনেক লোক গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা এর বিচার চাই।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই এনসিপির পদযাত্রা চলমান থাকবে। যত ভয়ভীতি, বোমাবাজি, ককটেল—সবকিছু উপেক্ষা করে আমাদের পদযাত্রা চলমান থাকবে এবং এটা স্পষ্ট যে আজকের এই ককটেল বিস্ফোরণ, বোমা বিস্ফোরণ প্রশাসনের সহায়তায় হয়েছে।’

এদিকে সমাবেশের শুরুতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কেন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? স্পষ্ট যে আজকে আমাদেরকে খুন করার পরিকল্পনায় এখানে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। সন্ত্রাসীদের ঠিকানা এই সাভারে হবে না। হবে না যারা এই ককটেল হামলাকারীদের প্রশ্রয় দেবে—তারা সন্ত্রাসী, বোমাবাজ, খুনিদের প্রশ্রয় দেবে। যারা তাদের প্রশ্রয় দেবে, তাদের পরিণতি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতো হবে।’

তাঁর বক্তব্যের পর নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাভার মডেল থানার সামনে অবস্থান নেন। নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন নেতা থানার ভেতরে গিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেন। বাইরে অন্য নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। রাত ১১টার দিকে তাঁরা থানা থেকে বের হয়ে যান।

 বিস্ফোরণের ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম
বিস্ফোরণের ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম
 

পরে সামগ্রিক বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা মানেই পুলিশের ব্যর্থতা আছে এবং আমরা মনে করছি, এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। পুলিশকে যদি দলীয়করণ করা হয়, পুলিশ এ ধরনের ঘটনায় আসলে আমাদেরকে প্রোটেক্ট করতে পারবে না। কারণ, পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশে তখন কাজটা করবে এবং পুলিশ যদি গ্রেপ্তার করতে পারে, তাহলে আমরা বুঝব যে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। পুলিশ বলছে, তাদের ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এখন পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারছে কি না, এটার ওপরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

এ ঘটনার পর ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এনসিপির সমাবেশে বক্তৃতা চলাকালে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা এনসিপি নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। সেখানে কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর পুলিশি নিরাপত্তার মাধ্যমে সাভার থানায় পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা এ ঘটনায় এজাহার দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করতে বলা হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশ সুপার আরও বলেন, মামলা হলে ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো কিছুই তদন্তের বাইরে রাখা হবে না।

এর আগে সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে গাজীপুরে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ এলাকা থেকে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে দুটি নির্বাচন ছিল—গণভোট এবং এমপিকে ভোট দেওয়া হয়েছে। গণভোট ছিল সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন, সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এই বিএনপি সরকার গণভোট এবং জুলাই সনদকে এখন অস্বীকার করছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জাতির সঙ্গে গাদ্দারি এবং বিশ্বাসঘাতকতা করছে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব