ব্যস্ততম বাজার। একটি অটোরিকশায় করে সেই বাজারে আসেন পাঁচ থেকে সাতজন সন্ত্রাসী। এরপর একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি ছোড়েন তাঁরা। মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলি লাগার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই যুবদল নেতা। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ফাঁকা গুলি ছুড়তে থাকেন সন্ত্রাসীরা। এরপর চলে যান অটোরিকশায় করে।
গতকাল শনিবার বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে এভাবেই খুন করা হয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা রাঙ্গুনিয়ার যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫)। বাজারে থাকা ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় হত্যাকাণ্ডের এমন দৃশ্য ধরা পড়েছে।
ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) কার্যালয়ের আধা কিলোমিটারের মধ্যেই। হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের একজনের মুখে ছিল কালো মুখোশ। অন্য ব্যক্তিদের চেহারা স্পষ্ট সিসি ক্যামেরার ফুটেজে। তাঁদের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান দেখা যায়। ফাঁকা গুলি ছোড়ার সময় সন্ত্রাসীদের কয়েকজন চিৎকার করে বলছিলেন—কেউ যাতে কাছে না আসে, দোকান বন্ধ করে চলে যায়।
নিহত মাসুদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন। রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী তাঁর বড় ভাই। পরিবারের সদস্যরা জানান, পরবর্তী নির্বাচনে মাসুদুল ইউপি চেয়ারম্যান পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেলা দেড়টার দিকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে চৌমুহনী বাজারে আসেন মাসুদুল। সন্ত্রাসীদের নিয়ে আরেকটি অটোরিকশা তাঁকে অনুসরণ করেই বাজারে আসে। মাসুদুল অটোরিকশা থেকে নেমে বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ান। এরপর অপর অটোরিকশা থেকে নেমে সন্ত্রাসীরা মাসুদকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে মাসুদের মাথার মগজ বেরিয়ে যায়।
মাসুদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীদের তিনজন পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। আরও দুজনকে শটগান থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে লোকজনকে সরিয়ে দিতে দেখা যায়। গুলি ছুড়তে ছুড়তেই অটোরিকশায় করে চলে যান তাঁরা।
নিহত মাসুদুলের লাশ গতকাল বিকেলে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। আজ রোববার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, রাজনৈতিক বিরোধ অথবা বালু ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে মাসুদুলকে খুন করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলার জন্য নিহত মাসুদুলের পরিবারকে থানায় আসতে বলা হয়েছে।
বাজারে আতঙ্ক
গতকাল শনিবার ঘটনার পরপরই বাজারের অধিকাংশ দোকানি দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান। যেসব দোকান খোলা ছিল তাও সন্ধ্যার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী আবদুল মাবুদ বলেন, ‘দিনদুপুরে এত গোলাগুলি আর আগে দেখিনি। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছেন।’ তিনি বলেন, ‘বাজারে ৩০টির বেশি সিসি ক্যামেরা বসানো আছে। তারপরও সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা করতে দ্বিধা করছেন না।’

রাউজানে অবশ্য এমন ঘটনা হঠাৎ নয়। দেড় মাস আগে একই কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ নাসির নামে এক যুবদলকর্মীকে। ঘটনাস্থলটি চৌমুহনী বাজার থেকে আরও পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে উপজেলার কদলপুরের শমসের পাড়ায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম শনিবার রাতে বলেন, ‘মাসুদ হত্যায় অংশ নেওয়া তিন থেকে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাঁরা সবাই রাউজানের বাসিন্দা। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
অস্ত্রধারীদের কোনো দলীয় পরিচয় পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে ওসি সাইফুল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত খুনিদের দলীয় পরিচয় আমরা নিশ্চিত হইনি। খুনিরা বেতাগীর দিক থেকে এসে রাউজানের কদলপুরের পাহাড়ি পথ দিয়ে পালিয়ে গেছে।’
রাউজান, চট্টগ্রাম