হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত মাসে প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকা দেওয়া হয়েছিল। এক মাস পর দেখা গেছে, এসব উপজেলায় হামের সংক্রমণ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

গতকাল বুধবার বিকেলে ‘হাম-রুবেলা টিকা কার্যক্রম ২০২৬ পর্যালোচনা এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

বৈঠকের উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশজুড়ে চলমান হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইনের সফলতার হার ৯৩ শতাংশ। তবে সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদানে অন্তত ৯৫ শতাংশ কাভারেজ নিশ্চিত করা জরুরি।

ইউনিসেফ ও প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের সংক্রমণের বিপদটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। যারা মাঠে কাজ করেছে তারাই এর ভয়াবহতা টের পেয়েছে।

সময়মতো ভেন্টিলেটর সহযোগিতা দেওয়ায় বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এগুলো না পাওয়া গেলে মৃত্যুহার আরও বেশি হতো। আগামী দুই–এক দিনের মধ্যে আরও ১০টি ভেন্টিলেটর পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তহবিলে দশটা টাকাও রেখে যাননি খরচ করার মতো। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) ১৫ লাখ ডোজ হামের টিকা দেশে এসেছে। ভবিষ্যতে টিকার আর কোনো সংকট তৈরি হবে না। ১০ মের মধ্যে হামসহ ১০ ধরনের ১ কোটি ৮ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসবে।

আক্রান্তদের ৬৫ শতাংশ টিকা পায়নি

আলোচনায় মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ। উপস্থাপনায় বলা হয়, শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়। তিন ধাপে পরিচালিত এই কর্মসূচি প্রথমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পৌরসভা ও উপজেলা, পরে বড় সিটি করপোরেশন এবং শেষে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে ক্যাম্পেইনের সাফল্যের হার ৯৩ শতাংশ, যা ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রথম ধাপে টিকা পাওয়া ৩০ উপজেলায় সংক্রমণ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল হামের সংক্রমণে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। আওতাভুক্ত এলাকাগুলো হলো বরগুনা সদর ও পৌরসভা; পাবনা সদর, পৌরসভা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া; চাঁদপুর সদর, পৌরসভা ও হাইমচর; কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু; গাজীপুর সদর; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও পৌরসভা, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট; নেত্রকোনার আটপাড়া; ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, তারাকান্দা ও শ্রীনগর; রাজশাহীর গোদাগাড়ী; বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ; নওগাঁর পোরশা; যশোর সদর ও পৌরসভা; নাটোর সদর; মুন্সিগঞ্জ সদর ও পৌরসভা, লৌহজং; মাদারীপুর সদর ও পৌরসভা; ঢাকার নবাবগঞ্জ; ঝালকাঠির নলছিটি ও শরীয়তপুরের জাজিরা।

হামের সংক্রমণের বিপদটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। যারা মাঠে কাজ করেছে, তারাই এর ভয়াবহতা টের পেয়েছে।সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী

১২ এপ্রিল ঢাকা মহানগর উত্তর–দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে টিকাদান শুরু হয়। আর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে শুরু হয় হামের টিকাদান কর্মসূচি। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিয়ে চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয় উপস্থাপনায়। সেখানে বলা হয়, সংক্রমণ প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ প্রয়োজন। তবে টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের হার তুলনামূলক কম।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।

অপুষ্টিও কারণ

গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ৯ মাসের কম বয়সী। বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারণ, ছয় মাস বয়সের পর শিশুদের মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি পাওয়ার কথা। শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পেলেও তাতে পর্যাপ্ত ভিটামিন এ বা অন্যান্য অ্যান্টিবডি থাকছে কি না, তা জরুরিভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

জিয়াউদ্দিন হায়দার মনে করেন, দেশে হাম সন্দেহে মৃত্যুর প্রায় শতভাগ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছিল। তাঁর মতে, কেবল টিকাদান কর্মসূচি হাম প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। তাই শিশুদের পুষ্টির বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

নিয়মিত টিকাদানে জোর

বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ভবিষ্যতে কেবল ক্যাম্পেইননির্ভর না হয়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করে পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনাসহ সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো একসঙ্গে নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, স্কুলভিত্তিক টিকাদান ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সময় টিকা কার্ড যাচাই করলে বাদ পড়া শিশুদের সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে টিকার কোনো ঘাটতি না হয়।

দেশে টিকা উৎপাদনের তাগিদ

টিকাদানের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানকারী কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপের চেয়ারপারসন ফিরদৌসী কাদরী বলেন, টিকার জন্য আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে মানসম্মত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগারকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে উন্নীত করার ওপর জোর দেন তিনি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ টিকাদান কর্মসূচির বিবর্তন এবং বর্তমান সক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ইপিআই বর্তমানে ১২টি রোগ মোকাবিলায় টিকা প্রদান করছে। জেলা পর্যায়ে তিন মাসের এবং উপজেলা পর্যায়ে এক মাসের টিকার মজুত রাখার সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত টিকার মজুত কোল্ড চেইন বজায় রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (টিকাদান) চিরঞ্জিত দাস বলেন, মানসম্পন্ন ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে ডব্লিউএইচও। নজরদারি থেকে প্রাপ্ত তথ্য–উপাত্ত নিয়মিত সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়। যাতে বিদ্যমান হামের প্রাদুর্ভাব কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী টিকাদান চললেও কিছু শিশু বাদ পড়ছে, যা বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ টি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, টিকা সংরক্ষণে কোল্ড চেইন ঠিকভাবে বজায় না রাখলে অনেক সময় টিকা অকার্যকর (ইনভ্যালিড ডোজ) হয়ে যায়। এ জন্য ডিজিটাল তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কখন হাসপাতালে যেতে হবে

শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হামে আক্রান্ত সব শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই। তবে শ্বাসকষ্ট, খাবার গ্রহণে অক্ষমতা, অতিরিক্ত বমি বা পানিশূন্যতা, খিঁচুনি কিংবা চোখ-মুখে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। তিনি জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাম ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে সেরে যায়।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) আবু আহম্মাদ আল মামুন,বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল। এতে পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের প্রেস স্পেশালিস্ট রিকি সালমিনা। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব