জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বিএনপি যে জুলাই সনদে সই করেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর এক–এক করে বাস্তবায়ন করবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বগুড়ায় আয়োজিত জনসভায় তিনি আরও বলেন, কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেওয়ার পরও কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে ও সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন করেছিল জানিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘১১টি কমিশনের মধ্যে সংবিধান, বিচার, প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, নারী আছে। আজকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা। যারা এ সংস্কার সংস্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, যারা জুলাই সনদকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তারা কিন্ত নারীর স্বাধীনতা বা নারীর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলে না। চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য যে কমিশন করা হয়েছিল, সেটা নিয়ে তারা কোনো কথা বলে না। কীভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে, সেইটা তারা বলে না। কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে, সেইটা তারা বলে না। তারা শুধু সংবিধান, সংবিধান বিষয়ে কথা বলে।’
আজ সোমবার সন্ধ্যায় বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে এ জনসভার আয়োজন করে বগুড়া জেলা বিএনপি। বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন।
‘সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে’
নির্বাচনের সময় যেসব গুপ্ত বিভ্রান্তকারী জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, সেই বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, গতকাল রোববার ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলায় প্রেমঘটিত একটি ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনা ঘটেছে। একটি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ঘটনাকে কারা রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, জনগণ তা দেখেছে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী জনসভায় বলেন, ‘এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্তের চেষ্টা করেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৯৬ সালেও আমরা দেখেছি, স্বৈরাচারের সঙ্গে গিয়ে দেশের মানুষকে কীভাবে বিভ্রান্ত করেছিল। ২০০৮ সালেও আমরা দেখেছি, ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড করতে চাই। ইমাম–মুয়াজ্জিনের জন্য ভাতা চালু করতে চাই, খাল খনন ও বৃক্ষ রোপণ করতে চাই। বেকার যুবকদের দেশে–বাইরে কর্মসংস্থান করতে চাই। এই সব ব্যাপারে তারা (বিরোধী দল) কোনো কাজ করে না। নির্বাচনের সময় বলেছিল, “রাখ তোর ফ্যামলি কার্ড”, মনে আছে? জনগণের স্বার্থে যে কাজ, তা তারা রেখে দেয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা কীভাবে কুক্ষিগত করতে হবে, সেই কাজের জন্য তারা এখন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’
কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে জনসভায় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আপনাদেরকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, তাদের অতীত ইতিহাস বলে দেয়, দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে তারা কতবার চেষ্টা করেছে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে।’
‘তাদেরকে বিশ্বাস করা যায় না’
১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তারা তো এ দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেনি। এ দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করেনি। যারা দেশের অস্বিত্বকেই বিশ্বাস করে না, তাদেরকে বিশ্বাস করা যায় না।’
সারা দেশে তারা গোলযোগ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে অভিযোগ করে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার যেমন বলেছিল, “এক মিনিটও শান্তিতে থাকতে দিব না,” সেই একই ভূত কিন্ত এদের ওপরই সওয়ার করেছে। দেখেন, কেমন আন্দোলন–আন্দোলন কথা বলে আর ব্যক্তি ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে চায়। ঠিক দিনাজপুরের ইয়াসমিনের ঘটনার মতো। ওই ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি তৈরি করা হয়েছিল। ১৭২ দিনের হরতাল দিয়েছিল।’
‘যা করব, স্বচ্ছভাবে করব’
২০১৬ সালে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ ঘোষণা ও পরবর্তীকালে বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান জনসভায় বলেন, দেশের অন্য কোনো দল সংস্কারের স–শব্দও উচ্চারণ করেনি স্বৈরাচারের ভয়ে। কিন্ত বিএনপি স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল।
গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনে বিএনপি জনগণের পক্ষে মতামত ও প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা সব সময় বলি, যা করব, স্বচ্ছভাবে করব। কোনো লুকোচুরি নেই। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবে। আমরা সেখানে অন্যান্য দলের সঙ্গে কতগুলো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছি, সেটা জনগণের কাছে আমরা পরিষ্কারভাবে তুলেও ধরেছি, কোন কোন বিষয়ে আমরা একমত, কোন কোন বিষয়ে আমরা দ্বিমত পোষণ করি।’
বগুড়ার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণ বগুড়ার মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি। তাঁরা শিগগিরই এ কাজ শুরু করবেন। বগুড়াসহ আশপাশের অঞ্চল কৃষিপ্রধান। তাঁরা চান, কৃষিজাত পণ্য দেশে যেমন থাকবে, তেমন বিদেশেও রপ্তানি হবে। বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান কীভাবে আসতে পারে, সে কাজ তাঁরা শুরু করে দিয়েছেন। বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিগগির শুরু হবে। সেখানে কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসাসহ সব বিষয় থাকবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদের ভাই, আপনাদের সন্তান। যে প্রতিশ্রুতি আমরা নির্বাচনের আগে দিয়েছি, যে পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন শুরু করেছি, তা যদি বগুড়ার সন্তান হিসেবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিশ্চয়ই বগুড়ার প্রত্যেক মানুষের গৌরব বৃদ্ধি পাবে। আমি আপনাদের দোয়া যেমন চাই, সমর্থনও চাই।’
জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যায় বগুড়া প্রেসক্লাবের নবনির্মিত ভবন ও বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের পুনঃসংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন।