সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদান দেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনে। এ অনুদানেই যাত্রা শুরু করেছিল ফাউন্ডেশন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অনুদানের মোট ১১৯ কোটি টাকার মধ্যে ফাউন্ডেশনের হাতে আছে ৪ কোটি ১০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
১০০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার পর ওই দিন রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারকে দেখাশোনার যে দায়িত্ব সরকার নিয়েছে, তা এই ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করবে এই ফাউন্ডেশন। যাত্রা শুরুর পর ফাউন্ডেশনের এ তহবিলে ৫ কোটি টাকা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন নাম প্রকাশ না করা এক নারী। ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে এবং আরও কিছু জায়গা থেকেও অনুদান পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বেতন, ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস ভাড়া, যানবাহন কেনা, ভাড়া করা, মেরামত, জ্বালানি, ভ্রমণ ব্যয়, আসবাবপত্র কেনাসহ আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আবর্তক ব্যয় খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। ফাউন্ডেশন থেকে জানানো আছে, এ খাতে সরকারের বরাদ্দ করা ৩ কোটি টাকার মধ্যে যা অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে চলতি মার্চ মাসে কর্মীদের বেতন-বোনাসসহ অন্যান্য খরচ চালানো যাবে।
ফাউন্ডেশনের নিয়ম অনুযায়ী, অনুদানের টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো খাতে ব্যয় করা যাবে না। অনুদান ও আবর্তক ব্যয় খাত—এই দুই তহবিলেই টাকা না থাকায় ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফাউন্ডেশনের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা।
বারবার হাত পাততে হচ্ছে ফাউন্ডেশনকে
গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবর্তক খাতে অনুদান চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠায় ফাউন্ডেশন। এতে আবর্তক খাতের বেতন-ভাতা ছাড়াও অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের আপত্কালীন এবং জরুরি সহায়তা দিতে ৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি ফাউন্ডেশন।
এর আগে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আট মাসের জন্য (২০২৪ নভেম্বর থেকে ২০২৫ জুন) আবর্তক ব্যয় খাতে মোট ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল ফাউন্ডেশন।
ফাউন্ডেশন পরিচালনা বা চলার মতো টাকা না থাকলেও আবর্তক খাতের ৩ কোটি টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আহতদের অস্ত্রোপচার, যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, শিক্ষাসহায়তা দেওয়া, ওষুধ কেনা, হুইলচেয়ার কেনা, ফিজিওথেরাপি করানো, আন্দোলনে শহীদদের মায়েদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হয় বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ব্যক্তিরা শেষ ভরসা হিসেবে ফাউন্ডেশনে এসে হাজির হন। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালগুলোতে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। অনেকেই তা পাচ্ছেন না।
বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ভুক্তভোগীরা ফাউন্ডেশনে আসেন। ফাউন্ডেশনের চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে দেখেন। তারপর ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবককে দিয়ে ওই ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠানো হয়। নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা করাতে হয়। বাড়ি যাওয়ার জন্য যানবাহন ঠিক করে দিতে হয়। বাড়ি যেতে না পারলে কোথায় রাত কাটাবেন, সে ব্যবস্থাও করতে হয়। এ কাজগুলো ফাউন্ডেশন দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করছে।
২৩৮ কোটি টাকা পাওয়ার আশাও ক্ষীণ
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ৪ মার্চ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনকে আর্থিক অনুদান দেওয়া প্রসঙ্গে একটি চিঠি পাঠায়। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ২৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল।
ফিরতি চিঠিতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসা অনুদান বাবদ অর্থ বিভাগ মন্ত্রণালয়ের চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৫০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। সেই টাকা কোন খাতে কত ব্যয় হয়েছে বা হবে, তা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে আরও ১০০ কোটি টাকা অর্থ প্রয়োজন। এ অবস্থায় ফাউন্ডেশন যে বরাদ্দ চেয়েছে, তা দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ নেই।
এ প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর বলেন, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এনজিওবিষয়ক ব্যুরো এবং একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে জুলাই ফাউন্ডেশনের নিবন্ধন হয়। তাই ফাউন্ডেশন নিবন্ধিত না, তা বলার সুযোগ নেই। আর ফাউন্ডেশন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যে কাজগুলো করার কথা ছিল, সেই কাজগুলোই করছে। সরকার তো লাশ সৎকারের জন্যও টাকা দিচ্ছে, তেমনই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সরকার এ ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব নেবে।
ফাউন্ডেশনের যত উদ্যোগ
ফাউন্ডেশনের আবাসন, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৫ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজে ব্যবসা করতে চান বলে জানিয়েছেন।
ফাউন্ডেশন বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় এ পর্যন্ত শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত ৯৪টি পরিবারকে দোকান করে দেওয়া, খামার করে দেওয়া, অটোরিকশা কিনে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে পুনর্বাসন করেছে। একেকটি পরিবার গড়ে দেড় লাখ টাকা করে পেয়েছে বলে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, বিকেএসপি, এসএমই ফাউন্ডেশন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই, ডেটাবেজ তৈরির কাজটি করছে। অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করতেও সম্পৃক্ত এ ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনে এসে ভুয়া শহীদ এবং আহত হিসেবে চিহ্নিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কাজটিও করছে। ফাউন্ডেশনে আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন আবেদনগুলোকে ডিজিটাল নথিভুক্ত করার কাজ শুরু করেছে।
ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্য বলছে, অনুদানের ১১৯ কোটি টাকা থেকে এ পর্যন্ত গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে ৮২২ জন শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। একেক শহীদ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ৮২২ জনের মধ্যে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত পাঁচ শহীদ পরিবারকে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
গেজেটভুক্ত আহতদের মধ্যে এ ও বি ক্যাটাগরিভুক্ত (অঙ্গহানিসহ গুরুতর আহত) সাড়ে ৬ হাজার জন আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। আহত প্রত্যেক ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা এবং ক্ষতি অনুযায়ী জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল ফাউন্ডেশনের। তবে ৮ হাজার ২০০ জন এখন পর্যন্ত ১ টাকাও আর্থিক সহায়তা পাননি। এর মধ্যে ২ হাজার জন অঙ্গ হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিও রয়েছেন।
ফাউন্ডেশনের সিইও কামাল আকবর বলেন, যাঁরা এখন পর্যন্ত ফাউন্ডেশন থেকে ১ টাকাও আর্থিক সহায়তা পাননি তাঁরা বলতেই পারেন এমন ফাউন্ডেশন থাকার কোনো দরকার নেই। এই মানুষদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে ২৩৮ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
কোনো কোনো আহত ব্যক্তি দ্বিতীয় দফায়ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। যাঁরা কোনো সহায়তা পাননি, তাঁরা এটা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গত বছরের ৮ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের অফিস ভাঙচুর করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের কয়েকজন। গত বছরের ১৩ মে ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের সামনে ফাউন্ডেশনের সিইও এবং কোষাধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।
ফাউন্ডেশনে কর্মরতরা বলছেন, আহতদের ধরন অনুযায়ী কেউ কেউ দ্বিতীয় দফায় সহায়তা পেয়েছেন।
মানসুরা হোসাইন
ঢাকা