ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ (সবুজ সংকেত) রয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপির কাছ থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না।
এবারের নির্বাচনে ভারত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে একধরনের যোগসাজশ হয়েছে বলে মনে করছেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে দলীয় পর্যালোচনা জানাতে এই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল এনসিপি।
বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জবাবদিহি দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অবিলম্বে প্রশাসনিকভাবে সেই কার্যালয় বন্ধ করায় যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধের ডাক দেব। সেটার জন্য এই সরকারকেও আমরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাব ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের দায়ে।’ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে প্রচার করায় কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বেসরকারি এখন টিভির দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো দলীয় গণমাধ্যম চাই না। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে সেই প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। আমরা আশা করব, এই মুহূর্ত থেকে এটা বন্ধ হবে, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে।’
দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, একটি ভুল ব্যাখ্যা ও সংবিধানের দোহাই দেওয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যপদে শপথ না নিয়ে একধরনের প্রতারণা করা হয়েছে, গণভোটের গণরায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। সংসদকে কার্যকর করতে একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হোক। সংস্কার পরিষদ ছাড়া এই জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই।
আইনের শাসন নিশ্চিত করা, পুলিশে দলীয়করণ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, রাস্তাঘাটে চলাফেরায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মব সংস্কৃতি বন্ধ করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মাজার ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার, বিরোধী দলের ওপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় দমন-পীড়ন বন্ধ করা এবং নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাগালে রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতেও নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
‘নতুন মন্ত্রিসভা পুরোনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা’
বিএনপি সরকারের ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় কোনো নতুনত্ব দেখছেন না বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই মন্ত্রিসভা দেখে আমাদের কাছে কোনোভাবে মনে হয়নি, এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এখানে পুরোনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এই মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা হয়নি। মন্ত্রিসভায় নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ যথেষ্ট পরিমাণ হয়নি। সার্বিকভাবে এটা প্রতিনিধিত্বমূলক বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রিসভা হয়নি।’
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের গড় বয়স প্রায় ৬০ বছর বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় কিছু তরুণকে সুযোগ দেওয়া হলেও এতে তারুণ্যের বাংলাদেশের প্রতিফলন হয়নি। সবচেয়ে ‘অ্যালার্মিং’ (উদ্বেগের) বিষয় হলো, এই মন্ত্রিসভায় প্রায় ৬২ শতাংশ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ব্যবসায়ী। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি হচ্ছে ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী হওয়াটা অপরাধ নয়, কিন্তু মন্ত্রিসভায় যে রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকা উচিত, সেটা হয়নি।
বিএনপির মন্ত্রিসভায় ব্যাপক আর্থিক অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও ঋণখেলাপির অভিযোগে অভিযুক্ত, হত্যা মামলার আসামি—এ ধরনের লোককে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, বড় বাজেটের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এমন একজনকে দেওয়া হলো, যিনি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং হত্যা মামলার আসামি।…নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলছেন। কিন্তু তাঁর নিজের মন্ত্রিসভা ও দলীয় সংসদ সদস্যরা ঋণ কবে পরিশোধ করবেন, দেশের মানুষ সেটা জানতে চায়।
কিছু ভালো ও অভিজ্ঞ লোকও নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন উল্লেখ করে সেটিকে সাধুবাদও দেন নাহিদ। তিনি বলেন, তবে সার্বিকভাবে পরিবর্তন বা সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই মন্ত্রিসভা যাচ্ছে না। একদিকে তাঁরা (বিএনপির নেতারা) বলছেন, প্লট নেবেন না, গাড়ি নেবেন না। কিন্তু তাঁরা ঋণখেলাপিদের সংসদে নিয়ে গেলেন, মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন। বৈধ সুবিধাকে অস্বীকার করে জনগণের সামনে সাধু সাজা হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় দেওয়া হলো।
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের স্থান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক।
‘গণভোট বাতিল হলে সরকারেরও বৈধতা থাকবে না’
গণভোটের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যে রিট হয়েছে, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা মনে করি, আদালত গণভোট বা জনগণের পক্ষেই রায়টা দেবেন। কারণ, যদি গণভোট বাতিল হয়ে যায়, তাহলে এই সংসদ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গণভোট বাতিল হলে এই সরকারেরও বৈধতা থাকবে না।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কারও বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি না থাকে, তাহলে সেই সেটআপ পরিবর্তন না করার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো যায়।
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, মাহবুব আলম, যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহউদ্দিন সিফাত, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।