কেবল বই পড়ে শিশু সবকিছু শেখে না বা পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে না। তার ভালো আচরণ, ভদ্রতা, সহানুভূতি ও সামাজিক দক্ষতাই তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। ছোটবেলা থেকেই কিছু মৌলিক সামাজিক নিয়ম শেখানো হলে শিশু আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও বন্ধুত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে। পরিবারই শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। আর মা–বাবাই তার প্রথম শিক্ষক। তাই দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমেই তাকে সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো সবচেয়ে কার্যকর। শিশুকে যেসব সামাজিকতা শেখাতে পারেন, এবার জেনে নেওয়া যাক সেসব বিষয়ে।
১. সালাম বা শুভেচ্ছা জানানো
বড়দের দেখলে সালাম, নমস্কার (যার যার ধর্মীয় রীতি অনুসারে) বা হ্যালো বলা ভদ্রতার পরিচয়। এটা শিশুকে শেখাতে পারেন।
২. ‘ধন্যবাদ’ ও ‘দুঃখিত’ বলা শেখান
ছোট ছোট ধন্যবাদের অনেক ক্ষমতা। কৃতজ্ঞতা ও ভুল স্বীকার করার অভ্যাস শিশুর চরিত্রকে সুন্দর, আকর্ষণীয় করে। শিশু যে মুহূর্তে বুঝতে পারে যে তার ভুল হয়েছে, তখনই সরি বলা শেখান।
৩. বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ, উভয়কে সাহায্য
শিশুদের বয়সে বড়দের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও সম্মান দেখানো শেখান। ছোটদের স্নেহ করা, ভালোবাসা শেখান। বড়-ছোট নির্বিশেষে সবাইকে সাহায্য করা শেখান।
৪. অন্যের কথার মাঝখানে কথা না বলা
অন্য কেউ কথা বলার সময় শিশুকে ধৈর্য ধরে তাকে কথাটা শেষ করতে দেওয়া শেখান। তারপর শিশুকে নিজের কথাটা সুন্দরভাবে বলতে বলুন।
৫. শেয়ার করার অভ্যাস
কথায় বলে, ‘শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং’। খেলনা, খাবার বা জিনিসপত্র বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শেখান।
৬. মানুষকে পোশাক বা পেশা দিয়ে বিচার না করা

মানুষকে কখনোই পোশাক, ধর্ম, জাতি বা অন্য যেকোনো কিছু দিয়ে ‘জাজ’ না করার শিক্ষা দিন। প্রতিটি পেশাজীবী ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে যেন আপনার শিশু সমান চোখে দেখতে পারে, মূল্যায়ন করে শিশুকে সেই শিক্ষা দিন।
৭. মিথ্যা না বলা, প্রতিজ্ঞা রাখা
সত্য কথা বলার গুরুত্ব ছোটবেলা থেকেই বোঝান। শিশুর কাছে কোনো প্রতিজ্ঞা করলেও সেটা রাখতে হবে। একান্তই যদি প্রতিজ্ঞা রাখা সম্ভব না হয়, কেনো হচ্ছে না তা আগেই জানিয়ে দিন।
৮. অনুমতি নেওয়ার অভ্যাস
অন্যের জিনিস ব্যবহার করার আগে অনুমতি চাওয়া শেখান। এমনকি সেটা পরিবারের জন্য কারও হলেও।
৯. অন্যের ঘরে প্রবেশ করার আগে
নিজের বাদে অন্য যেকোনো ঘরে প্রবেশ করার আগে নক করা ও অনুমতি নেওয়া শেখান।
১০. লাইনে দাঁড়ানো
স্কুল, দোকান বা যেকোনো জায়গায় শৃঙ্খলা মেনে চলার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। লাইনে দাঁড় করানো শেখার ছোটবেলা থেকে।
১১. কাউকে মজা করেও ছোট করা নয়
শিশুকে ‘ফান’ করার নামে কাউকে ছোট করে কথা বলা, মারামারি, ঠাট্টা বা অপমানজনক আচরণ থেকে বিরত থাকতে শেখান।
১২.অন্যের কষ্ট বোঝা
অন্যের কষ্ট বুঝতে ও সাহায্য করতে উৎসাহ দিন।
১৩. নিজের কাজ নিজে করা
ব্যাগ গোছানো, খেলনা গোছানো, দিনের ছোট ছোট কাজ—এসব শিশুর ভেতর দায়িত্ববোধ তৈরি করে।
১৪. ডাইনিং ম্যানার
খাবারের সময় শালীনভাবে বসা, পা না নাচানো, অতিরিক্ত কথা না বলা, সুন্দরভাবে খাবার খাওয়া ইত্যাদি শেখান।
১৫. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা
রেগে গিয়ে চিৎকার বা খারাপ আচরণ না করে শান্ত থাকার অনুশীলন করান।
১৬. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
নিজের শরীর, পোশাক ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ছোটবেলা থেকেই ফলের খোসা বা চিপস চকলেটের প্যাকেট নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা শেখান।
১৭. পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা
শিশুকে যখনই সুযোগ হবে, পরিবেশ সচেতন করে তোলার চেষ্টা করবেন। প্লাস্টিকের ঝুঁকি, বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি—এসব সম্পর্কে একটু একটু করে ধারণা দিন। গাছ লাগাতে ও গাছের যত্ন নিতে উৎসাহিত করুন।
১৮. অপচয় না করা
শিশুকে অভাব আর আভিজাত্যের ভারসাম্য রেখে বড় করুন। ছোটবেলা থেকেই তাকে অপচয় না করার শিক্ষা দিন।
১৯. পেছনে কথা না বলার শিক্ষা দিন

শিশুকে কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা বলা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিন। কারও সঙ্গে আপনার শিশুর যদি বোঝাপড়ার সমস্যা হয় তাহলে বিষয়টি তার সঙ্গে সময়, সুযোগ বুঝে সুন্দরভাবে খোলামেলা আলাপের ভেতর দিয়ে সমাধানে পৌঁছাতে অনুপ্রাণিত করুন।
২০. যেটুকু ধার নিয়েছে, তার বেশি ফেরত দেওয়া
দরকারের সময় আপনি যদি পাশের বাসা থেকে ২০টি কাঁচা মরিচ নেন, ফেরত দেওয়ার সময় ৩০টি দিন। শিশুকেও তা সচেতনভাবে শেখান।
২১. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখা
কোনো ব্যক্তি যদি কোনো একটা কথা বলে সেটা গোপন রাখতে বলে, তা যেকোনো মূল্যে গোপন রাখার শিক্ষা দিন শিশুকে। এমনকি কোনোভাবে কারও ব্যক্তিগত কোনো বিষয় জেনে গেলেও তার গোপনীয়তা রক্ষা করা শেখান।
২২. ‘কমপ্লিমেন্ট’ দেওয়া
শিশুকে ছোট ছোট বিষয় খেয়াল করা, কমপ্লিমেন্ট দেওয়া ও ইতিবাচকতার চর্চা করা শেখান।
২৩. চোখে চোখ রেখে কথা বলা
পরিষ্কার আত্মবিশ্বাসী যোগাযোগের জন্য ‘আই কনটাক্ট’ খুবই জরুরি।
২৪. কাউকে কোনো কিছুর জন্য চাপ না দেওয়া
শিশুকে ছোটবেলা থেকেই অন্যের সম্মতি বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য চাপ না দিতে, জোরাজুরি না করতে শেখান।
২৫. ‘না’ বলতে শেখান
শিশুকে সুন্দরভাবে, যোউক্তিকভাবে না বলতে শেখান।
মনে রাখবেন
এসব বিষয় আপনি কখনোই শিশুকে কেবল বলে বা বুঝিয়ে শেখাতে পারবেন না। আপনি নিজে এসবের অনুশীলন করলে শিশুও সেসব ‘কপি’ করবে, আয়ত্ত করবে। তাই অভিভাবক হিসেবে সবার আগে আপনাকে ওপরের বিষয়গুলো চর্চা করতে হবে।
সূত্র: ভেরি ওয়েলমাইন্ড