কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল ১০ মে। তার ৫ দিন আগের কথা। প্রিয়তির ১৯ মাসের ছোট্ট মেয়ে লাভিশার যিনি দেখাশোনা করেন, তিনি এক সপ্তাহের ছুটিতে। সেখান থেকেই ফোনে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠিয়ে জানালেন, যে সময়ে প্রিয়তি কান চলচ্চিত্র উৎসবে থাকবেন, সে সময় লাভিশার দেখাশোনা করতে পারবেন না তিনি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল প্রিয়তির।

[caption id="attachment_273966" align="alignnone" width="783"] কানের লালগালিচায় প্রিয়তি দেখা দেন জেরালডিন ও’মিয়ারার নকশা করা হলুদ পেপলাম গাউনেপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু[/caption]

বলছি মাকসুদা আখতার প্রিয়তির কথা। যিনি একাধারে মিজ আয়ারল্যান্ড খেতাবজয়ী মডেল, পাইলট ও তিন সন্তানের মা। ছোট মেয়ের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মানুষটি ছুটিতে গেছেন। ফলে শেষ মুহূর্তে পোশাকগুলোর ফাইনাল ফিটিং, ট্রায়াল থেকে শুরু করে গয়না, ব্যাগ, জুতা, সানগ্লাস, মেকআপ বা অন্যান্য এক্সেসরিজ, ফটোশুট আর মিটিং—কোনো কিছুর জন্যই আলাদা করে সময় পাচ্ছিলেন না।

প্রিয়তির সন্তানকে দেখাশোনার জন্য আর কেউ ছিল না। টিকিট, হোটেল বুকিং; প্রায় ১০ দিন ফ্রান্সে থাকা, খাওয়া, বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নেওয়া, মিটিং, ডিনার, ফটোশুট—সব প্রি-অ্যারেঞ্জমেন্ট তত দিনে শেষ।

গাউনের নাটকীয় স্লিভের একটি ছোট হাতা। সেটি বাটারফ্লাই মোটিফে তৈরি। অন্যটি পাফড, স্ট্র্যাকচার্ডড ফুল স্লিভ, হাতার শেষ অংশে নজর কাড়ে পালকের নকশা
গাউনের নাটকীয় স্লিভের একটি ছোট হাতা। সেটি বাটারফ্লাই মোটিফে তৈরি। অন্যটি পাফড, স্ট্র্যাকচার্ডড ফুল স্লিভ, হাতার শেষ অংশে নজর কাড়ে পালকের নকশাপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু

মুশকিল আসান

এদিকে প্রিয়তির কানে যাওয়া নিয়েই অনিশ্চয়তা। শেষমেশ বছরখানেক আগে ছোট্ট লাভিশার যিনি দেখাশোনা করতেন, তাঁকে ফোন করলেন প্রিয়তি। তিনি তখন আরেক জায়গায় চাকরি করেন। প্রিয়তির এমন অবস্থা শুনে তিনি সেখান থেকে এক দিনের নোটিশে চাকরি ছেড়ে প্রিয়তির বাসায় এসে হাজির।

আইরিশ জুয়েলারি ও অ্যাকসেসরি ডিজাইনার ফিওনা র‍্যাফটারের তৈরি গয়না ও ব্যাগের সঙ্গে পরিমিত মেকআপ আর আশির দশকের হলিউড গ্ল্যাম থেকে অনুপ্রাণিত সাইড-পার্টেড শর্ট বব হেয়ারস্টাইল নজর কেড়েছে
আইরিশ জুয়েলারি ও অ্যাকসেসরি ডিজাইনার ফিওনা র‍্যাফটারের তৈরি গয়না ও ব্যাগের সঙ্গে পরিমিত মেকআপ আর আশির দশকের হলিউড গ্ল্যাম থেকে অনুপ্রাণিত সাইড-পার্টেড শর্ট বব হেয়ারস্টাইল নজর কেড়েছেপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু
 

কানের লালগালিচায় চতুর্থ লুকে হাজির হওয়ার আগে মেকআপ নিতে নিতে প্রিয়তি বললেন, ‘৮ বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। ১৬ বছর বয়সে মা। আজ যত দূর এসেছি, এই দুজন মানুষের জন্য। দে হ্যাভ মাই ব্যাক। শেষ মুহূর্তে কোন পোশাকের সঙ্গে কী পরব, কীভাবে পরব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার জন্য সেগুলো গুছিয়েছে আইরিশ গয়নার ডিজাইনার ফিওনা র‍্যাফটার। এই মানুষগুলোর জন্যই আমি জীবনে বহুবার পড়তে পড়তেও পড়িনি। যখনই আমি এমন সব পরিস্থিতিতে পড়েছি, কারও না কারও সাহায্যে ঠিকই উতরে গেছি।’

সঙ্গী যখন মাদার্স গিল্ট

লালগালিচায় চতুর্থ লুকের আগে কানের হোটেলরুমে মেকআপ নিতে নিতেই ফোনে চলল প্রথম আলোর সঙ্গে কথোপকথন
লালগালিচায় চতুর্থ লুকের আগে কানের হোটেলরুমে মেকআপ নিতে নিতেই ফোনে চলল প্রথম আলোর সঙ্গে কথোপকথনছবি: প্রিয়তির সৌজন্যে

১৪ মে ছিল প্রিয়তির বড় ছেলের জন্মদিন। ছেলের জন্মদিনে উপস্থিত থাকতে না পারলেও উপহার হিসেবে ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাজ্যে, প্রিয়তির কাজিনের কাছে। বললেন, ‘যত গ্ল্যামারাস আর রাজকীয়ভাবেই লালগালিচায় হাঁটি না কেন, তিন সন্তানের মা হিসেবে সব সময় মাদার্স গিল্ট আমার সঙ্গী।’

২০১৪ সালে মিজ আয়ারল্যান্ডের খেতাব জয় করেন প্রিয়তি। ২০১৫ সাল থেকে ১১ বার অংশ নিলেন কান চলচ্চিত্র উৎসবে। আর কানের লালগালিচায় হাঁটলেন এবার দশম বারের মতো।

কান থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না

সোনালি রঙের একটি স্ট্র্যাপলেস ব্যান্ডেজ ড্রেসেও লালগালিচায় দেখা দেন প্রিয়তি
সোনালি রঙের একটি স্ট্র্যাপলেস ব্যান্ডেজ ড্রেসেও লালগালিচায় দেখা দেন প্রিয়তিপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু

প্রিয়তি বললেন, ‘লালগালিচায় অংশ নেওয়া কান চলচ্চিত্র উৎসবের খুবই ছোট্ট একটা অংশ। এই তো গতকালই ভিন ডিজেল তাঁর “ফার্স্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস” সিনেমার ২৫তম বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সিনেমার বিশেষ প্রিমিয়ারে অংশ নিলেন। (ভিন ডিজেল) বললেন, ৩৫ বছর আগে তিনি যখন প্রথম কানে আসেন, তখন একটা ছোট লন্ড্রি ব্যাগে কিছু কাপড় নিয়ে এসেছিলেন। বললেন, তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা যেখানেই হোক না কেন; তারকা হিসেবে, পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার শুরু এই কান থেকেই। এ কথা বলে তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আসলে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যে কেউ যদি একটু রিসার্চ করেন, আগে থেকে মেইল পাঠিয়ে কিছু মিটিং ফিক্স করে আসেন, তিনি কখনো খালি হাতে ফিরবেন না। কান থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। এখান থেকে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত যেকোনো ধরনের কোলাবরেশন সম্ভব।’

এআই নিয়ে ভাবনা

বডিকন ফিটের মিদি ড্রেসটির হেমলাইন সমৃদ্ধ নিচের অংশটি মারমেইড ভাইভ দেয়। হ্যাট আকৃতির হেডপিসটি প্রিয়তির লুকে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা
বডিকন ফিটের মিদি ড্রেসটির হেমলাইন সমৃদ্ধ নিচের অংশটি মারমেইড ভাইভ দেয়। হ্যাট আকৃতির হেডপিসটি প্রিয়তির লুকে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রাপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু

প্রিয়তি আরও বলেন, ‘গত বছর আমি যখন এখানে আসি, তখন এআই দিয়ে তৈরি সিনেমাকে গ্রহণ করা না–করা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এ বছর সেই আলোচনা আরও ডালপালা মেলছে। কীভাবে, কেন এআই সিনেমা তৈরি হবে, কত শতাংশ তৈরি হবে, তার নীতিমালা নিয়ে যুক্তি-তর্ক, আলাপ চলছে। এখানে আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো বিভিন্ন দেশের, সংস্কৃতির, সৃষ্টিশীল সেরাদের আইডিয়া জানা, তাঁদের সঙ্গে আইডিয়া বিনিময়ের সুযোগ পাওয়া।’

আরও পড়ুন

কানের দ্বিতীয় দিনে আলিয়া ভাটের তিন লুক

লুকটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল তাঁর হাতে ধরা আইভরি লেসের ছাতা বা প্যারাসল। ছাতাটি যোগ করেছে ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড রোমান্স’ বা ‘সফট রয়্যাল’ আবহ। অনেকেই এই লুককে ‘ব্রিজারটন কোর’ বা ‘মহারানি-অ্যাসথেটিক’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশি ডিজাইনারদের পোশাক নয় কেন?

ওয়ান শোল্ডার চকচকে গোলাপি গাউনটিও দারুণ মানিয়েছে প্রিয়তিকে
ওয়ান শোল্ডার চকচকে গোলাপি গাউনটিও দারুণ মানিয়েছে প্রিয়তিকেপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু

এ বছর রিচার্ড হ্যারিস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পক্ষ থেকে ১০ দিনের আমন্ত্রণপত্র পেয়ে কানে গেছেন প্রিয়তি। জানতে চাইলাম, আপনি কেন কেবল আইরিশ ডিজাইনারদেরই প্রমোট করছেন? বাংলাদেশের ডিজাইনারদের একটা পোশাকও কেন স্থান পায়নি আপনার কানের লাগেজে?

কানের রাস্তায় স্কার্ট আর হলুদ হ্যাটে প্রিয়তি। উৎসব শুরুর আগে এভাবেই ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন
কানের রাস্তায় স্কার্ট আর হলুদ হ্যাটে প্রিয়তি। উৎসব শুরুর আগে এভাবেই ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেনপোশাক নকশা: জেরালডিন ও’মিয়ারা (আইরিশ ফ্যাশন ডিজাইনার); গয়না নকশা: ফিওনা র‍্যাফটার; মেকআপ: মারিয়া মুয়া। ছবি: লরাঁ হু

উত্তরে প্রিয়তি বলেন, ‘আমি গত বছর ফেসবুকে লিখেছিলাম, বাংলাদেশি কোনো ফ্যাশন ডিজাইনার যদি আমার কান লুকের জন্য পোশাক দেন, মোস্ট ওয়ালকাম। আমি সম্মানের সঙ্গে সেটি গ্রহণ করব; কিন্তু কেউ সেই ডাকে সাড়া দেননি। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডেই আমার পেশাজীবন। নিরাপত্তা, আশ্রয়, জীবনসঙ্গী, ভালো কাজ, ভালো জীবন—সবকিছুই সেখানে পেয়েছি। সেখানকার ফ্যাশন ডিজাইনারদের ওপর ভর করেই আমি ক্যারিয়ার গড়েছি। আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি কেবল আয়ারল্যান্ডের বড় বড় ডিজাইনারের পোশাকই আনিনি; বরং ছোট ছোট টেকসই ফ্যাশন নিয়ে কাজ করা বুটিক ও কুটিরশিল্পের নানা কিছু সঙ্গে এনেছি। এটা তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার প্রকাশ।’

জিনাত শারমিন

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব