ছয় বছর আগে নিজের বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’–এর চলচ্চিত্র ‘রূপান্তরের খসড়া’ চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন নোবেলজয়ী তুর্কি লেখক ওরহান পামুক। তাঁর ৫০০ পৃষ্ঠার বেশি দীর্ঘ প্রেমকাহিনি—১৯৭০ ও ৮০–এর দশকের ইস্তাম্বুলের পটভূমিতে লেখা ভালোবাসার গল্প—চিত্রনাট্যে এমনভাবে বদলে ফেলা হয়েছিল, যা তাঁর ভাষায় ‘অতিরিক্ত ও অগ্রহণযোগ্য’।

প্রযোজনা সংস্থা মূল কাহিনিতে বড় পরিবর্তন আনে, এমনকি নতুন প্লট টুইস্টও যোগ করে। পামুক মনে করেন, এতে তাঁর গল্পের মর্মই বদলে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি আইনি লড়াইয়ে নামেন, গল্পের স্বত্ব ফিরে পেতে প্রযোজকের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

‘সেই সময় দুঃস্বপ্ন দেখতাম’—নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন ওরহান পামুক। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীকে আমার সামর্থ্যের তুলনায় অনেক টাকা দিতে হয়েছে। ভাবতাম, ওরা যদি ওভাবেই বানিয়ে ফেলে!’

২০২২ সালে তিনি মামলায় জয়ী হন। এরপর নতুন করে উদ্যোগ নেন—এবার শর্ত সাপেক্ষে, যাতে গল্পের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ অটুট থাকে।
অবশেষে চার বছর পর তিনি সন্তুষ্ট। আজ শুক্রবার থেকে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ৯ পর্বের সিরিজ ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’।

‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সাহিত্য থেকে পর্দা: এক দেরিতে পাওয়া সাফল্য
৭৩ বছর বয়সী পামুকের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে এটি একটি নতুন অধ্যায়। দুই দশকের বেশি সময়ে লেখা তাঁর উপন্যাস, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ ও আলোকচিত্রের বই বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০০৬ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

উপন্যাসটি ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। এতে এক মধ্যবিত্ত ব্যাচেলর কামালের আবিষ্ট প্রেমের গল্প বলা হয়েছে তরুণী বিক্রয়কর্মী ফুসুনকে কেন্দ্র করে। ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কামাল নিত্যদিনের জিনিস—লবণদানি, চুলের ক্লিপ, কফির কাপ, এমনকি ৪ হাজার ২১৩টি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে। উপন্যাসের চূড়ান্ত পর্বে সে এসব নিয়ে একটি জাদুঘর তৈরি করে।

সাহিত্যের বাইরে গল্পটির আরেক জীবনও আছে। ২০১২ সালে পামুক ইস্তাম্বুলে বাস্তবেই ‘মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে উপন্যাসের নানা উপকরণ প্রদর্শিত হয়। পরে এ নিয়ে তথ্যচিত্রও নির্মিত হয়েছে।

‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘দ্য মিউজিয়াম অব ইনোসেন্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

‘অতিরিক্ত পরিবর্তন নয়’
২০১৯ সালে একটি হলিউড প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন পামুক; কিন্তু প্রস্তাবিত চিত্রনাট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ছিল; যেমন নায়িকা ফুসুনকে গর্ভবতী দেখানোর মতো সংযোজন।

‘অতিরিক্ত পরিবর্তন। এভাবে বদলালে বইটি আর আমার বই থাকে না’, বলেন পামুক।
প্রায় আড়াই বছরের আইনি লড়াই শেষে তিনি চুক্তি বাতিল করেন। এরপর তুরস্কের প্রযোজনা সংস্থা এ ওয়াই ইয়াপিমের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।

এবার তিনি আগাম অর্থ নেননি এবং চূড়ান্ত চিত্রনাট্য না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিতেও সই করেননি। প্রতিটি পর্বের খসড়া নিজে পড়ে মতামত দিয়েছেন। ৯টি পর্বের প্রতিটি পাতায় প্রযোজক ও লেখক দুজনই সই করেন—চিত্রনাট্য যাতে অপরিবর্তিত থাকে।
প্রযোজনা সংস্থার প্রধান কেরেম চাতাই জানান, চার বছরে সিরিজটি সম্পন্ন হয়েছে—তাঁর ১৯ বছরের ক্যারিয়ারে এত দীর্ঘ সময় আর কোনো সিরিজে লাগেনি।

নারীর দৃষ্টিকোণ ও অভিনয়
উপন্যাস প্রকাশের পর তুরস্কের নারীবাদীরা পামুকের সমালোচনা করেছিলেন—গল্পটি পুরুষ চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে বলে। পামুক বলেন, ‘আমি মধ্যপ্রাচ্যের একজন পুরুষ—সব নারীবাদী সমালোচনা আমি মেনে নিই।’
সিরিজটি পরিচালনা করেছেন নারী নির্মাতা যেনেপ গানি তান, যা নায়িকা ফুসুনের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করেন পামুক।

নায়ক কামালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তুর্কি তারকা সেলাহাতিন পাসালি, আর ফুসুন চরিত্রে তুলনামূলক নতুন মুখ ইয়েল কান্দেমির।

সিরিজটি পামুকের জন্য আরেকটি ‘প্রথম’ এনে দিয়েছে—অভিনয়ে অভিষেক। কয়েকটি দৃশ্যে তিনি নিজেই ‘ওরহান পামুক’ চরিত্রে উপস্থিত, যেখানে কামাল তাঁর গল্প শুনিয়ে যায়।

তবে নিজের অভিনয় নিয়ে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘এটাকে অভিনয় বলা যায় না, কারণ আমি নিজের চরিত্রেই অভিনয় করেছি।’

নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব