FI TV
ব্রেকিং
সারাদেশ

শর্ত পূরণ না করা এজেন্সিও মালয়েশিয়া ‘সিন্ডিকেটে’

Rupam Tanchangya মিনিটের পড়া
শেয়ার:
M

কর্মী পাঠানোর কাজ পাওয়ার যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া যে ১০ শর্ত দিয়েছিল, তার একটি হলো ‘মানব পাচার বা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বা আইনি রেকর্ড থাকা যাবে না।’ কিন্তু দেশটি বাংলাদেশের যে ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছে, তার অন্তত চারটির বিরুদ্ধে ‘বিদেশে নারী পাচারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের’ মামলা রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর তদন্ত করছে। 

দেশে দুই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে, যারা বিদেশে কর্মী পাঠায়। ২০১৬ সালে এর মধ্যে মাত্র ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। ২০২২ সালে কাজ দেয় ২৫টি এজেন্সিকে। যেগুলোর মালিক ছিলেন তৎকালীন এমপি-মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। এসব এজেন্সি ‘সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিতি পায়। সে সময় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। কর্মীপ্রতি ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও গড়ে তা পাঁচ লাখের ওপরে উঠে যায়। 

এবার মালয়েশিয়ার ১০ শর্তের ছয়টি পূরণ করা ৪২৩ এজেন্সির তালিকা দেশটিকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। দুই দেশের স্বাক্ষরিত ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকে পাওয়া একক ক্ষমতায় সেখান থেকে ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে গত ২১ আগস্ট তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়া। পরে ‘সহযোগী এজেন্সি’ হিসেবে আরও ৩১২ প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রকাশ করে পুত্রজায়া। এবারও এদের সিন্ডিকেট বলা হচ্ছে। কর্মীদের নির্ধারিত ব্যয়ের কয়েক গুণ টাকা লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।  

এজেন্সিগুলোকে কোন মানদণ্ডে বাছাই করা হয়েছে, তা জানায়নি মালয়েশিয়া। তবে তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, এমন প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে, যেগুলো কর্মী পাঠানোর সংখ্যা, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য মানদণ্ডে বাদ পড়া এজেন্সির চেয়েও পিছিয়ে। চারটি এজেন্সি এক হাজারের কম কর্মী পাঠিয়েছে নিবন্ধন পাওয়ার পর। লাইসেন্স পাওয়ার পর মোট ৩৬০ জন কর্মী পাঠানো এজেন্সিও রয়েছে তালিকায়। যদিও পাঁচ বছরে অন্তত তিন দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রয়েছে।

সরকারি দপ্তর এবং জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সূত্রগুলো সমকালকে জানিয়েছে, অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া এজেন্সিগুলোর পেছনে রয়েছেন দেশের ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তি। তবে কর্মী নিয়োগের ‘সিন্ডিকেটের’ মূল নিয়ন্ত্রকরা রয়েছেন মালয়েশিয়ায়। বাংলাদেশে থাকা তাদের সহযোগীদের তদবিরে এসব এজেন্সিকে তালিকায় রাখা হয়েছে।

সূত্রমতে, ক্ষমতাধরদের পছন্দের অন্তত ১৪টি এজেন্সি কাজ পেয়েছে। এ ছাড়া সাতটি এজেন্সি ২০২২ সালের ‘সিন্ডিকেটের’ বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রক রুহুল আমিন স্বপনের আশীর্বাদপুষ্ট। আর গতবারের সিন্ডিকেটে ছিল এমন চারটি এজেন্সি ভিন্ন নামে এবারও রয়েছে। 

নিজের শর্ত মানেনি মালয়েশিয়া
শুরুতে মালয়েশিয়ার দেওয়া ১০ শর্তের মধ্যে ছিল লাইসেন্সের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হওয়া এবং আগের পাঁচ বছরে অন্তত তিন দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা। পরে এসব শর্ত শিথিল করা হয়েছিল বাংলাদেশের অনুরোধে। ১০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী অফিস এবং নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকার শর্তও শিথিল করা হয়। তবে মানব পাচারের অভিযোগ না থাকার শর্তটি বহাল রয়েছে। 

এ শর্ত পূরণ না করা চার এজেন্সিকে তালিকায় রেখেছে মালয়েশিয়া। এগুলো হলো রিফা ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ৬৯৩), জেনারেল ট্রেডিং (নিবন্ধন নম্বর ৩২০), গডনেস সার্ভিস লিমিটেড (নিবন্ধন নম্বর ২০৬৮) ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ১২৬৮)। 

নারী কর্মীদের চাকরির নামে বিদেশে পাচারের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে গত বছরের ৩ জুলাই দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয় মামলা করে। এই মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি সংস্থা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এজেন্সিগুলো ভুয়া নথি তৈরি করে কর্মী পাঠায়। এ মামলায় ৫৭ এজেন্সির তথ্য চেয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক এবং তদন্ত কর্মকর্তা গত ২৩ জুলাই চিঠি দেন বিএমইটি মহাপরিচালককে। এ তালিকায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ পাওয়া চার এজেন্সির নাম রয়েছে। 

এই চার এজেন্সির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে সমকাল। তবে কেউ সাড়া দেয়নি। জানতে চাইলে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মানব পাচারের মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বা আইনি রেকর্ড কোনো এজেন্সির থাকা যাবে না। 

কিন্তু তালিকায় এমন এজেন্সি রয়েছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। মালয়েশিয়া এর পরও কীভাবে তাদের কাজ দিয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ। আসলে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের এসব এজেন্সির সক্ষমতা সম্পর্কে জানার কথাও নয়। ঢাকায় যারা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক, তারা যে তালিকা দেন, মালয়েশিয়া তা প্রকাশ করে মাত্র।

এবারও অনভিজ্ঞ এজেন্সি
শেষ তিন বছরে অল্পসংখ্যক কর্মী পাঠানো এজেন্সি কাজ পেয়েছে। মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানোর এজেন্সি বাছাই নিয়ে বিতর্কের পর সরকারি সংস্থা বিএমইটি এজেন্সিগুলোর তথ্য প্রকাশ করছে না। যোগাযোগ করলে সমকালকে জানানো হয়, তথ্য প্রকাশে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

তবে সমকাল অন্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এতে দেখা যায়, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ৯৯৭) শেষ তিন বছরে বিদেশে কর্মী পাঠিয়েছে ১১১ জন। যদিও লাইসেন্স পাওয়ার পর থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত চার হাজার ৫০২ জন কর্মী পাঠিয়েছে। ভালুকা ওভারসিস (নিবন্ধন নম্বর ২০৬৯) তিন বছরে ২৩৫, বাংলাদেশ ওয়ান সার্ভিস (নিবন্ধন নম্বর ১৭৮১) ২৭০, আল-হায়াত ওভারসিজ (নিবন্ধন নম্বর ১১৫৪) ৩০১, অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল (নিবন্ধন নম্বর ১৭৬৫) ৩৬০, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট ওভারসিজ (নিবন্ধন নম্বর ১১৯৭) ৪৬৬, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল (নিবন্ধন নম্বর ১০৮২) ৮০১ জন কর্মী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে অ্যাঙ্কর সাকল্যে ৩৬০ জন কর্মী পাঠিয়েছে লাইসেন্স পাওয়ার পর। 

২০২২ সালেও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনালের মাত্র ৫২ জন এবং ইম্পেরিয়াল রিসোর্সের ৩২৪ জন কর্মী বিদেশে পাঠানোর অভিজ্ঞতা ছিল মালয়েশিয়ার তালিকায় নাম ওঠানোর আগে। ফেনী-২ আসনের তৎকালীন এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রতিষ্ঠান স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের (আরএল-১৫৫১) ছিল মাত্র ৯১ জন কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা। ঢাকা-২০ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি বেনজির আহমদের প্রতিষ্ঠান আহমদ ইন্টারন্যাশনালের (আরএল-১১৪৬) আগের সাত বছরে মাত্র ৩৮৭ জন কর্মী বিদেশ পাঠিয়েছিল। 
এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজার বন্ধ করে মালয়েশিয়া সরকার। এখনও বন্ধ আছে। প্রায় ১৭ হাজার কর্মী সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও সেবার মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রমবাজার খোলার অনুরোধ জানান। দুই মাস দেশটি ২৫টি এজেন্সি বাছাই করে। 
আড়ালে ক্ষমতাধররা

প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গত সপ্তাহে সমকালকে বলেছিলেন, এজেন্সি বাছাইয়ের একক ক্ষমতা মালয়েশিয়ার। অভিজ্ঞ বা অনিভজ্ঞ যারাই কাজ পেয়েছে, তাদের মালয়েশিয়া ঠিক করে দিয়েছে। এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে নতুন চুক্তি করা হবে। সরকারের বিশেষ অনুরোধে আরও ৩১২ এজেন্সিকে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সিন্ডিকেট হবে না। 

মানব পাচারে মামলার তদন্তে থাকা এজেন্সি কীভাবে তালিকায় থাকল এই প্রশ্নে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর সমকালকে বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁর ধারণা নেই। তিনি মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে সমকাল চেষ্টা করেও উপদেষ্টার বক্তব্য জানতে পারেনি। 

সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করায় আবারও সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তালিকায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশ ‘ডামি’। এমপি, নেতারা নিজ নামে কাজ না নিয়ে অনুগতদের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। অতীতে আওয়ামী লীগ এমপি, মন্ত্রী, নেতারা নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেওয়ায় বিতর্ক হয়েছিল।  

যুবদলের সহসভাপতি আতিকুর রহমান বিশ্বাসের মালিকানাধীন এজেন্সি আল-আকাবা তালিকায় না থাকলেও রয়েছে তাঁর স্ত্রী সাবিহা সুলতানার মালিকানাধীন ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার। দুটি প্রতিষ্ঠানেরই ঠিকানা ফকিরাপুলের ইনার সার্কুলার রোডের শতাব্দী সেন্টারে। সাবিহা সুলতানা সমকালকে বলেছেন, তালিকায় থাকা এবং প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তাঁর স্বামী জানেন। 

সরকারি একটি সূত্র সমকালকে বলেছে, এক প্রতিমন্ত্রীর তিনটি এজেন্সি তালিকায় রাখা হয়েছে। তিনটি এজেন্সির আড়ালে রয়েছেন একজন হুইপ। একজন উপদেষ্টার আত্মীয় বেনামে রয়েছেন এবারের সিন্ডিকেটে। খুলনা ও কুমিল্লার একজন করে এমপি রয়েছেন দুটি এজেন্সির পেছনে। গতবার ২৫ এজেন্সির সিন্ডিকেটে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ড। এবার রয়েছে তাঁর স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানুর প্রতিষ্ঠান।  

মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিওসিএমএস গত ২৮ আগস্ট ৩৩৮ বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে, যারা দেশটিতে কর্মী পাঠাতে পারবে। সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পাওয়ায় প্রথম তালিকা থাকা ২৫ এজেন্সির অধীনে ১০টি করে ২৫০ এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ বলা হয়েছে। বাকি ৬২টিকে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেলের সহযোগী বলা হয়েছে। 

অতীতে শুধু বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ এজেন্সি বাছাই হলেও এবার মালয়েশিয়া ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনসহ আট দেশের ক্ষেত্রে এজেন্সি নির্ধারণ করেছে এফডব্লিউসিএমএস। এটি মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম, যা পরিচালনা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বেস্টিনেট নামের প্রতিষ্ঠান। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে ভিসা কেনাবেচা, নিবন্ধনে চাঁদা নেওয়াসহ নানা অভিযোগ ছিল আগের দুবার। হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও পাচারের অভিযোগের পর এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়। তৃতীয়বারের মতো একই পদ্ধতিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। 

শেয়ার: