FI TV
ব্রেকিং
সারাদেশ

বিএনপির সংসদীয় দলের সভা স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এমপিদের

Rupam Tanchangya৬ মিনিটের পড়া
শেয়ার:
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন দলটির সংসদ সদস্যরা (এমপি)। তারা বলেছেন, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তাদেরকে সবসময় সহায়তা করছেন না। এমপিদের নামে যেসব বরাদ্দ আসে, সেসব বিষয়ে অবহিত না করে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেন। কোনো বরাদ্দে তারা তালিকা দিয়ে সুপারিশ করলে সেসবেও ঠিকমতো পাত্তা দেন না বলে অভিযোগ তাদের। 

সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের দিনক্ষণের আগে গতকাল রোববার হঠাৎ করেই জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সভাকক্ষে এ সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ সভা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক সংসদ সদস্য জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার গঠনের পর আট মাসে কী কী কাজ হয়েছে, কোন কাজের অগ্রগতি কতটুকু এবং কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে– এসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে নিজ নিজ এলাকার সমস্যার বিষয়েও সংসদ সদস্যদের কথা শুনেছেন তিনি।

সভায় অনেক এমপি অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসন তাদেরকে ঠিকভাবে সহায়তা না করায় তারা কাজ করতে পারছেন না। এতে জনসম্পৃক্তমূলক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটা পিছিয়ে পড়ছেন। এতে সরকারের অনেক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পর্কে জনগণ ঠিকমতো জানতে পারছে না। 

সংগঠনকে ভুলে যাবেন না
সভায় এমপিদের বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি এমপিদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু দলকে, সংগঠনকে ভুলে যাবেন না। এই সংগঠনের মধ্য দিয়েই আজকে আপনাদের পরিচিতি হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগের বিনিময়েই আপনারা আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। তাই কোনোভাবেই তাদের ভুলবেন না। তাদের পাশে রাখুন, সংগঠনকে শক্তিশালী করুন। 

এমপি-মন্ত্রীকে এলাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিজ এলাকায় যান। জনগণের সঙ্গে মিশুন। তাদের সুখ-দুঃখ সম্পর্কে জানুন। তাদের কষ্ট শুনুন। সর্বোচ্চটুকু দিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করুন। জনগণ থেকে দূরে সরে এলে নিজেদেরই ক্ষতি। আপনাদের রাজনীতি থাকবে না। 

এমপিসহ দলের নেতাকর্মীদের সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দেন তিনি। কয়েকজন এমপি তাদের বক্তব্যে সামাজিক মাধ্যমে বটবাহিনীর অপপ্রচার নিয়ে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যদি নিজেরা সামাজিক মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় থাকেন, সেখানে তো অন্যরা জায়গা করে নিবেই। অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নিজেদের সরব থাকতে হবে। সত্যটা তুলে ধরতে হবে। 

সার কেলেঙ্কারি নিয়ে অভিযোগ অনেকের
সম্প্রতি সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনেক এমপি অভিযোগ তুলে বলেন, সারাদেশে সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনেক অভিযোগ উঠেছে। অনেক এলাকায় টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগ, জামায়াতের নেতাকর্মীকে এ ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঝিনাইদহে সারের ডিলার নিয়োগে নজিরবিহীন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন একজন এমপি। তিনি বলেন, গুদাম নেই, আর্থিক সংগতি নেই– এমনকি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র, শিক্ষক ও নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও দেওয়া হয়েছে সার ডিলারের লাইসেন্স। অথচ ১৭ বছর ধরে ঘরবাড়িছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। শুধু ঝিনাইদহ নয়, আরও অনেক জেলায় এ রকম ঘটনা ঘটেছে। এসবের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত বলেও কেউ কেউ জানিয়েছেন। 

ঘরে ঘরে মাদক; কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে
বৈঠকে কয়েকজন এমপি মাদকের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কঠোর বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই মাদককে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এই মাদক শুধু যুবসমাজ নয়, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করছে। মাদককে শুধু নিষিদ্ধ করে আইন নয়, এটা বন্ধ করতে সর্বোচ্চ কঠোরতা পালন করা দরকার। যুবসমাজকে রক্ষা করতে, দেশকে রক্ষা করতে মাদকের ছোবল থেকে মুক্ত করতে হবে। 

দলের কেউ অপকর্মে জড়াবেন না
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি এখন সরকারে। তাই অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে। দলের নেতাকর্মীরা যদি অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সরকারের বদনাম আরও বেশি হয়। বিরোধীরা আরও বেশি তৎপরতার সুযোগ পায়। তাই দলের কেউ যাতে চাঁদাবাজি, দখলবাজির মতো অপকর্মে না জড়ায়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

শিক্ষা খাতকে নিয়মের মধ্যে আনার তাগিদ
সভায় বেশির ভাগ এমপি শিক্ষা খাত নিয়ে নিজেদের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট দেখা গেছে। শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা বেশি অনেক স্কুলে। ব্যাঙের ছাতার মতো কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা তৈরি হওয়ায় এ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা যত্রতত্র মাদ্রাসা, কোচিং ব্যবসা খুলে তাদের নেতাকর্মীদের যেমন কর্মসংস্থান করছেন, তেমনি তাদের দলীয় কার্যক্রমও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালনা করছেন। সুশিক্ষার জন্য এবং শিক্ষার মানদণ্ড আরও বাড়ানোর জন্য সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে নজর বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন এমপিরা। 

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গণহারে জামিন পাচ্ছেন
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খুব দ্রুত জামিনে মুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন অনেক এমপি। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি নেতাকর্মীদের জামিন খুব কঠিন ছিল। সেখানে এখন নিষিদ্ধ ঘোষিত দলটির নেতাকর্মীরা অনায়াসে জামিনে বেরিয়ে আসতে পারছেন। এসব জামিন প্রক্রিয়ায় বিএনপির আইনজীবীরা যুক্ত আছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখার জন্যও দাবি জানিয়েছেন তারা। 

অপকর্মে জড়ালে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই
সভা শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের জানান, দলের নেতাকর্মী ও সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাদের সতর্ক করে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো নেতাকর্মী, এমপি-মন্ত্রী কেউ কোনো অপকর্মে জড়ালে তাঁকে বা তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। 

সভাকে ‘বিশেষ সংসদীয় দলের সভা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা প্রয়োজন অনুযায়ী বক্তব্য রেখেছেন। সরকারকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ছিল এই সভার লক্ষ্য। জনগণের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে তুলে আনার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই বিষয়েই দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা কেউ শৃঙ্খলার বাইরে নই। আমরা সবাই যাতে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে বৈঠকে কোনো সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হয়নি। তবে নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয় এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না ঘটে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি ও অন্যান্য কার্যক্রমের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সাধারণত স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা উচিত।

পূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে নির্দেশনা
আসন্ন দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন কোথাও সমস্যার মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছেন। পূজার আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে সংসদ সদস্যদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতে বলা হয়েছে। 

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মী এবং সংসদ সদস্যরাও পূজার সময় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। 
হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। 

কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। 

এমপিদের মাতব্বরি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ 
নিজের সংসদীয় এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে যাতে কোনো এমপি মাতব্বরি না করেন, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিএনপির সাংসদ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

শেয়ার: