FI TV
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

‘এআইয়ের কারণে আমরা সবাই মারা যেতে পারি’

Rupam Tanchangya মিনিটের পড়া
শেয়ার:
AS
a

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতিতে প্রযুক্তি খাতে কর্মরত অনেকেই ‘সত্যিই ভীত’ বলে জানিয়েছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সাবেক এক গবেষক। তার আশঙ্কা, এআইয়ের বর্তমান অগ্রগতির গতি কমানো না গেলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতি বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে। এমনকি তার ভাষায়, ‘এআইয়ের কারণে আমরা সবাই মারা যেতে পারি।’

অ্যানথ্রপিকে কাজ করার পর পদত্যাগ করা ২৭ বছর বয়সী জ্যাকব কক্সন বিবিসির লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তার পদত্যাগের ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি নিয়ন্ত্রণহীন এআই উন্নয়নের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

কক্সন বলেন, ‘বর্তমান অগ্রগতির গতি যদি আমরা কমাতে না পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সবাই মারা যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।’

এর আগে তিনি ওপেনএআইয়ে কাজ করেছেন। পরে অ্যানথ্রপিকে যোগ দেন। তার সাবেক প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দারিও আমোদেইও সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তিটির উন্নয়ন বন্ধ করার প্রশ্ন নেই; তবে এর ঝুঁকি গুরুতর এবং তা মোকাবিলায় কোম্পানি ও সরকারগুলোর সময় প্রয়োজন।

ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্কও এআই খাতে গতি কমানো, নিয়ন্ত্রণ এবং এআই মডেল তৈরির ওপর স্বাধীন নজরদারির বিষয়ে আমোদেইয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়েছেন।

কক্সন বলেন, এআই উন্নয়নের গতি কমানোর উদ্যোগ শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। চীনের সঙ্গেও সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে এআই নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করেন, তারা নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানাচ্ছেন পুরোপুরি গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ তারা নিজেদের এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন, যার পরিণতি নিয়ে তারা ভীত।’

এআইয়ের কারণে সম্ভাব্য বিপর্যয় কেমন হতে পারে-এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন বলেও মন্তব্য করেন কক্সন। অ্যানথ্রপিকের প্রধান আমোদেই যেসব ঝুঁকির কথা বলেছেন, তার মধ্যে একটি হলো-এআই বটের একটি বিশাল বাহিনী সুপারকম্পিউটারের মতো কাজ করে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।

কক্সনের মতে, এমন পরিস্থিতি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই বাস্তব হতে পারে।

তবে কক্সনের পদত্যাগ ও বক্তব্যের বিষয়ে অ্যানথ্রপিক বলেছে, এআই বিপুল সুফলের পাশাপাশি নজিরবিহীন ঝুঁকিও তৈরি করবে-এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি সব সময়ই স্বচ্ছ ছিল। ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা শিল্প খাতের সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোর কিছু ব্যবহার করে মডেল তৈরি করছে।

প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, এআই মডেল কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে তারা পথিকৃৎ। এআই উন্নয়নের ঝুঁকি কমাতে প্রথম দিকেই তারা একটি কাঠামো প্রকাশ করে। পাশাপাশি মডেলগুলোকে কঠোরভাবে পরীক্ষা করে এবং ফলাফল প্রকাশ করে, যাতে গবেষক ও অন্যরা সেগুলো যাচাই করতে পারেন এবং এআইয়ের ‘মিসঅ্যালাইনমেন্ট’ বা মানুষের উদ্দেশ্যের সঙ্গে এআইয়ের লক্ষ্যবিচ্যুতি ঠেকানো যায়।

তবে এআই নিয়ে এমন সতর্কবার্তাকে ঘিরে সিলিকন ভ্যালিতে সমালোচনাও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মন্তব্য এআই নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ও প্রচার তৈরির কৌশল হতে পারে। আবার সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রপিক প্রতিযোগিতা ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের জন্য চাপ তৈরি করতে চাইছে, যাতে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের আধিপত্য আরও শক্ত হয়।

অ্যানথ্রপিক বর্তমানে সম্ভাব্য রেকর্ড গড়া প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে খবর রয়েছে। অন্যদিকে ওপেনএআইও আইপিওর প্রস্তুতি নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে শুক্রবার ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যাম অল্টম্যান বলেন, এআই নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন আইপিও করা ‘বুদ্ধিমানের কাজ হবে না’।

কক্সনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমাঁ দেলাংগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, এআই নিয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকি সম্পর্কে কক্সনের মতামত নেওয়া অনেকটা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এসি মেরামতকারীর মতামত নেওয়ার মতো। তবে অ্যানথ্রপিকের প্রধানের প্রস্তাব প্রকাশের পর সম্ভাব্য সমাধানে সহযোগিতার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও কক্সনের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের দাবি, হুয়াং কক্সনের বক্তব্যকে সত্য নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এর আগে তিনি এআই মানবজাতির অবসান ঘটাবে-এমন ধারণাকে ‘পুরোপুরি অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

তবে কক্সন বলেন, তার সহকর্মীদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিপদটি আগামী দুই বছরের মধ্যেই আসতে পারে। তার ভাষ্য, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা নিজেদের জীবন নিয়েও পরিকল্পনা করছেন এবং তাঁদের কাজের প্রভাব নিয়ে ভাবছেন। কেউ কেউ দ্রুত এআই উন্নয়নের কারণে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা থেকে বাঁচতে কোথাও জমি কেনার কথাও ভাবছেন।

তবে এআই নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন কক্সন। তিনি বলেন, প্রযুক্তিটির গবেষকেরা এআইয়ের ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখতে চান। রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিতে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

কক্সনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অ্যানথ্রপিকের বিজ্ঞানী ইভান হুবিঙ্গারও তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এআই সব মানুষকে হত্যা করতে পারে-এমন আশঙ্কা তারা সত্যিই গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্বাস করেন। আগামী এক দশকের মধ্যে এমন ঘটনার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি বলেও ব্যক্তিগত মত দেন তিনি।

এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সাল থেকেই ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও অ্যানথ্রপিকের প্রধানরা প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন এআই মডেলগুলো আরও শক্তিশালী সক্ষমতা দেখানোর পর এসব সতর্কবার্তা আরও জোরালো হয়েছে।

গত এপ্রিলে অ্যানথ্রপিক তাদের ‘মাইথস’ মডেল সাধারণের জন্য উন্মুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, মডেলটি পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত স্যান্ডবক্স পরিবেশ থেকে নিজে নিজে বেরিয়ে যেতে সক্ষম ছিল। এ ছাড়া ওপেনএআইও তাদের সাম্প্রতিক ‘অ্যাস্ট্রা’ মডেলের উন্নয়নের কিছু অংশ স্থগিত করার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এর পেছনে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল।

শেয়ার: