ঈদ উদ্‌যাপনে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল শনিবার। তবে এখনো মূল চাপ বাকি আছে। রেল ও পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘরমুখী মানুষের মূল ভিড় হবে

আগামী সোম থেকে বুধবার—এই তিন দিন। একদিকে ঢাকা থেকে মানুষ ছুটবে বাড়ির পথে আর ঢাকার পথে আসতে থাকবে কোরবানির পশু।

এবার দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর অবস্থা মোটামুটি ভালো বলা যায়। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-উত্তরবঙ্গের পথে জটের আশঙ্কা আছে। ইতিমধ্যে হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কের ৯৪টি স্থান চিহ্নিত করেছে, যেসব স্থানে যানজট হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে বড় সেতুর বেশ কিছু টোল প্লাজা, মোড় এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাজার এলাকা রয়েছে। ফলে শেষ তিন দিনের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি হবে কি না, তা ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আগামী সোম থেকে বুধবার—এই তিন দিন। একদিকে ঢাকা থেকে মানুষ ছুটবে বাড়ির পথে আর ঢাকার পথে আসতে থাকবে কোরবানির পশু।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে ঈদের আগের তিন-চার দিনে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। বিশেষ করে ঈদুল আজহায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ঢাকা ছাড়েন, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বেন। কিন্তু বাস, ট্রেন, লঞ্চ, মোটরসাইকেলসহ সব মিলিয়ে ২২ লাখ মানুষের যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে। অন্যদের চাহিদা মেটাতে চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন নেমে যায়।

এবার পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি সাত দিন। ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ছুটি থাকবে। গত কয়েকটি ঈদে লম্বা ছুটি দেওয়া হয়েছিল। এতে কিছুটা সফলতাও পাওয়া গেছে। তবে শেষ দু-তিন দিনের চাপ রয়েই গেছে।

হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কের ৯৪টি স্থান চিহ্নিত করেছে, যেসব স্থানে যানজট হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিন মহাসড়ক নিয়ে উদ্বেগ বেশি

প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে হাইওয়ে পুলিশ। হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গাজীপুর অঞ্চলের পক্ষ থেকে এবার যানজটপ্রবণ হিসেবে ৯৪টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থান দেশের মূল সাতটি মহাসড়কের ওপর পড়েছে। এই সাত মহাসড়ক দেশের প্রায় সব বিভাগ ও জেলাকে সংযুক্ত করেছে।

৫ মে সচিবালয়ে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে ঈদ প্রস্তুতিমূলক সভা হয়। সেখানে ৯৪টি যানজটপ্রবণ স্থানের বিস্তারিত তুলে ধরে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়। পাশাপাশি সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

হাইওয়ে পুলিশের তালিকায় সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এই তিন মহাসড়কের মধ্যে উত্তরের পথে ২৫টি, চট্টগ্রামের পথে ২৫টি ও সিলেটের পথে ২১টি যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল হয়ে উত্তরের পথে যাতায়াতের মহাসড়কে গাজীপুরের চন্দ্রা উড়ালসড়কের পশ্চিম প্রান্ত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই পথে চার লেনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু কিছু পাতাল ও উড়ালসড়কের কাজ এখনো কিছুটা বাকি আছে। এসব স্থানে যানজটের আশঙ্কা করছে হাইওয়ে পুলিশ।

এ ছাড়া ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের মধ্যে প্রচুর পোশাক কারখানা রয়েছে। অনেক কারখানার পাশে মহাসড়কের বিভাজক কেটে পারাপারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেগুলোতেও যানজটের শঙ্কা করা হচ্ছে। মহাসড়কের পাশের বাসস্ট্যান্ড এবং বাজারগুলোকেও নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের তালিকায় সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এই তিন মহাসড়কের মধ্যে উত্তরের পথে ২৫টি, চট্টগ্রামের পথে ২৫টি ও সিলেটের পথে ২১টি যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড় গত দুই ঈদে যাত্রীদের ভুগিয়েছে। এবারও এই দুটি স্থানে খানাখন্দ রয়েছে। আছে অব্যবস্থাপনাও। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্প এলাকার অনেক স্থানে যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজায় প্রায়ই যানজট হয়। এবার ঈদেও সেতুর টোল প্লাজা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লার মাধাইয়া, চান্দিনা ও নিমসার বাজারগুলো মহাসড়কের পাশেই। এই এলাকাতেও যানজট হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ঢাকা-বরিশাল পথে মহাসড়কের অবস্থা ভালোই। তবে মাদারীপুরের মোস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ডে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা থেকে বের হওয়া নিয়ে ভয়

ঢাকা থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে বড় তিনটি পথ হলো গাবতলী-সাভার, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর ও মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক। ঈদুল আজহায় এই তিন পথেই কোনো না কোনো বাধা রয়েছে। মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের টোল প্লাজা হয়ে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-মাওয়া—এই তিন পথের যানবাহন চলাচল করে। গত কয়েকটি ঈদে এ উড়ালসড়কের টোল পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ জট হয়েছে। এবারও সেই শঙ্কা কাজ করছে।

উত্তরা হয়ে ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের পথে যান চলাচল করে। বিমানবন্দর-গাজীপুরের মধ্যে বিআরটি প্রকল্পের কারণে এই পথে দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। এ ছাড়া ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়ক নির্মাণকাজের জন্যও ভোগান্তি হচ্ছে এখনই। তুলনামূলকভাবে গাবতলী হয়ে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াতের পথ অনেকটাই মসৃণ। কিন্তু গাবতলী পশুর হাট, সাভারের হেমায়েতপুরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার কারণে জট বাড়তে পারে।

হাইওয়ে পুলিশের তালিকায় সবচেয়ে বেশি যানজটপ্রবণ মহাসড়ক হচ্ছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এই তিন মহাসড়কের মধ্যে উত্তরের পথে ২৫টি, চট্টগ্রামের পথে ২৫টি ও সিলেটের পথে ২১টি যানজটপ্রবণ স্থান রয়েছে।

গত শুক্রবার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর থেকে চন্দ্রা মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, সাভারের পাকিজা পয়েন্ট, থানা স্ট্যান্ড, সাভার বাজার, নবীনগর এবং নবীনগর থেকে চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল, পল্লী বিদ্যুৎ ও বলিভদ্র এলাকায় বেপরোয়াভাবে মহাসড়কে নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। সাভার, নবীনগর, রেডিও কলোনি ও বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীপরিবহন বাসগুলোকে মহাসড়কের নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচলের লেনে আড়াআড়ি করে পেছনের বাসকে আটকে দিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাতে দেখা যায়। বাসস্ট্যান্ডের নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও এলোমেলোভাবে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাতে দেখা যায়।

রংপুর থেকে ঢাকাগামী আসাদ পরিবহনের চালক শামীম বলেন, এখন সড়কে সমস্যা তেমন নেই। ঈদের আগে সমস্যা হবে। সড়কে পুলিশ ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করলে সমস্যা কম হবে বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা জেলা (উত্তর) ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) রুহুল আমিন সোহেল বলেন, মহাসড়কে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আগামীকাল (রোববার) সকাল আটটা থেকে নিয়মিত ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত আরও ৬৫০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বিশ্বরোড মোড় গোল চত্বরকেন্দ্রিক যানজট নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান উন্নয়নকাজের জন্য গোলচত্বর এলাকা একদিকে সংকীর্ণ আর মহাসড়কের সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড, অন্যদিকে খানাখন্দের কারণে এ অবস্থা চলছে। মহাসড়কের ৩৪ কিলোমিটার অংশে ঈদ উপলক্ষে যানবাহনের চাপ বেড়ে যানজট হচ্ছে।

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হাইওয়ে পুলিশের সিলেট অঞ্চলের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রেজাউল করীমকে বিশ্ব রোড মোড় গোলচত্বরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তিনি মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছেন। তবে মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য অবৈধ যানবাহনকে অনিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখা গেছে।

উদ্যোগ আছে, এরপরও শঙ্কা

অবশ্য সরকার ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও জনসাধারণের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিজিবি বলেছে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদের সাত দিন আগে থেকে শুরু করে ঈদ–পরবর্তী তিন দিন পর্যন্ত বিজিবির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা, মহাসড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে তাঁরা সহায়তা করবেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। এ ছাড়া রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে তাঁদের তদারকি দল কাজ করছে।

চার লেনের চওড়া সড়ক হয়েছে। তবে সক্ষমতা বাড়েনি। আছে অব্যবস্থাপনাও। ঈদে সরকারের সংস্থাগুলো গায়ে-গতরে খেটে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তবে কোনো দুর্ঘটনা, বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো সমস্যা হলে সেই চেষ্টা কাজে দেয় না। ফলে ভোগান্তি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামান

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং সেতু বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ১২টি সেতুতে ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মাধ্যমে টোল আদায় ব্যবস্থা চালু করেছে। টোল প্লাজায় যন্ত্র থাকবে, সেখানে কার্ড স্পর্শ করে দ্রুত পারাপার হওয়া যাবে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, ঈদের আগে বৃষ্টি হলে জট বেড়ে যেতে পারে। কারণ, অনেক মহাসড়কে উন্নয়নকাজ শেষ হয়নি। আর বৃষ্টিতে যানবাহনের গতি কমে যায়। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, ঈদে চলাচলের অনুপযোগী বাস নামে। ঈদুল আজহায় এর সঙ্গে চলাচল অনুপযোগী ট্রাকও নামে। এসব ট্রাক ফিরতি পথে আবার যাত্রী নিয়ে যায়। এসব বিষয়ে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি হলে যানজটের ঝুঁকি বাড়বে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ মো. হাদীউজ্জামান বলেন, চার লেনের চওড়া সড়ক হয়েছে। তবে সক্ষমতা বাড়েনি। আছে অব্যবস্থাপনাও। ঈদে সরকারের সংস্থাগুলো গায়ে-গতরে খেটে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। তবে কোনো দুর্ঘটনা, বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো সমস্যা হলে সেই চেষ্টা কাজে দেয় না। ফলে ভোগান্তি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।

আমাদের অনুসরণ করুন

 

সর্বাধিক পড়ুন

  • সপ্তাহ

  • মাস

  • সব