বলিউডের খুব কম তারকাই আছেন, যাঁরা ক্যারিয়ারের শিখরে অবস্থান করেই স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়েছেন। সেই বিরল তালিকার অন্যতম নাম আসিন থোট্টুমকাল। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সুপারস্টার থেকে বলিউডের প্রথম ১০০ কোটির সিনেমার নায়িকা—সব অর্জন যখন তাঁর হাতের মুঠোয়, তখনই মাত্র ৩০ বছর বয়সে অভিনয়কে বিদায় জানান তিনি।
আজও অনেকের মনে প্রশ্ন—কোথায় আছেন আসিন? কেন তিনি হঠাৎ করে অভিনয় ছেড়ে দিলেন?
দক্ষিণ ভারত থেকে তারকাখ্যাতির শুরু
১৯৮৫ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতের কেরলমের কোচিতে জন্মগ্রহণ করেন আসিন। পুরো নাম আসিন থোট্টুমকাল। বাবা জোসেফ থোট্টুমকাল ব্যবসায়ী এবং মা সেলিন চিকিৎসক ছিলেন।
শৈশব থেকেই মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিনয়ে আসার আগে মডেলিং করতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মালয়ালাম চলচ্চিত্র ‘নারেন্দ্রন মাকান জয়কান্থন ভাকা’ দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করেন।
খুব দ্রুতই তিনি তামিল ও তেলেগু সিনেমার প্রযোজকদের নজরে আসেন। দক্ষিণ ভারতের বড় বড় তারকার বিপরীতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
দক্ষিণের সুপারস্টারদের প্রিয় নায়িকা
বলিউডে আসার অনেক আগেই দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে আসিন ছিলেন প্রতিষ্ঠিত নাম। তিনি অভিনয় করেছেন—সুরিয়ার সঙ্গে ‘গজনি’, বিজয়ের সঙ্গে ‘পোক্কিরি’ ও ‘সিভাকাসি’, মহেশ বাবুর সঙ্গে ‘ওক্কাডু’, অজিত কুমারের সঙ্গে ‘ভারালারু’, পবন কল্যাণের সঙ্গে ‘আন্নাভারাম’ ছবিতে।
বিশেষ করে ২০০৫ সালের তামিল ছবি ‘গজনি’ তাঁকে দক্ষিণ ভারতে সুপারস্টার বানিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে এই ছবিই তাঁর বলিউড–যাত্রার দরজা খুলে দেয়।

বলিউডে আগমন, ইতিহাস গড়া সাফল্য
২০০৮ সালে মুক্তি পায় আমির খান অভিনীত ‘গজনি’। ছবিটি ছিল তামিল গজনির হিন্দি রিমেক। সেখানে আসিন অভিনয় করেন প্রাণবন্ত তরুণী কল্পনা চরিত্রে। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
‘গজনি’ শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই পায়নি, ইতিহাসও সৃষ্টি করে। এটি ছিল বলিউডের প্রথম ১০০ কোটি রুপি আয় করা চলচ্চিত্র। এক রাতের মধ্যেই আসিন সারা ভারতের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
একের পর এক সুপারহিট
‘গজনি’র সাফল্যের পর বলিউডে আসিনের চাহিদা বেড়ে যায়। তিনি অভিনয় করেন—সালমান খানের সঙ্গে ‘রেডি’, অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘হাউসফুল ২’ ও ‘খিলাড়ি ৭৮৬’, অজয় দেবগনের সঙ্গে ‘বোল বচ্চন’, অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে ‘অল ইজ ওয়েল’। এই ছবিগুলোর বেশির ভাগই বক্স অফিসে সফল হয়।
বিশেষ করে ‘রেডি’, ‘বোল বচ্চন’ ও ‘হাউসফুল ২’ তাঁকে বলিউডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক নায়িকাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিলেন কেন?
আসিনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বহুভাষিক দক্ষতা। তিনি মালয়ালাম, তামিল, তেলেগু ও হিন্দি—চারটি বড় চলচ্চিত্রশিল্পেই সফল ছিলেন। আরও একটি বিষয় তাঁকে আলাদা করেছিল—তিনি কখনো বিতর্ককে নিজের প্রচারের হাতিয়ার বানাননি। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব কমই কথা বলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিলেন সংযত।
বলিউডে যখন সম্পর্ক, বিচ্ছেদ ও বিতর্কের খবর দিয়ে অনেকেই আলোচনায় থাকতেন, তখন আসিন নিজের কাজ দিয়েই পরিচিতি গড়েছিলেন।
ক্যারিয়ারের শিখরে বিদায়
সাধারণত তারকারা জনপ্রিয়তা হারানোর পর অভিনয় ছাড়েন। কিন্তু আসিন ঠিক উল্টোটা করেছেন। ২০১৫ সালে ‘অল ইজ ওয়েল’ মুক্তির পর তিনি আর কোনো ছবিতে অভিনয় করেননি। অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো সাময়িক বিরতি নিচ্ছেন। কিন্তু পরে জানা যায়, তিনি অভিনয়জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ সিদ্ধান্ত অনেককে অবাক করেছিল। কারণ, তখনো তাঁর বয়স মাত্র ৩০ বছর এবং তিনি বলিউডের অন্যতম সফল অভিনেত্রী।
প্রেম, বিয়ে ও নতুন জীবন
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আসিন বিয়ে করেন রাহুল শর্মাকে, যিনি ভারতীয় মোবাইল কোম্পানি মাইক্রোম্যাক্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা। মজার বিষয় হলো, এই সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন অক্ষয় কুমার। অক্ষয়ই রাহুলের সঙ্গে আসিনের পরিচয় করিয়ে দেন। হিন্দু ও খ্রিষ্টান—দুই ধর্মীয় রীতিতেই তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর আসিন পুরোপুরি অভিনয়জগৎ থেকে সরে দাঁড়ান।
মাতৃত্ব ও পরিবারের প্রতি মনোযোগ
২০১৭ সালে জন্ম নেয় তাঁদের কন্যা আরিন রায়ন শর্মা। এর পর থেকে পরিবারই হয়ে ওঠে আসিনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। খুব কমই জনসমক্ষে দেখা যায় তাঁকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত নন। মাঝেমধ্যে মেয়ের জন্মদিন বা বিশেষ পারিবারিক মুহূর্তের ছবি প্রকাশ করেন। অনেক ভক্ত তাঁর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকলেও এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো ইঙ্গিত দেননি।
রাহুল শর্মা একসময় ভারতের মোবাইল বাজারে আলোড়ন তোলা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোম্যাক্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। চীনা ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রাসনে কোম্পানির বাজার কমে গেলেও রাহুল এখনো ভারতের প্রযুক্তি খাতের পরিচিত উদ্যোক্তা। ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে পরিবার নিয়ে বিলাসবহুল কিন্তু তুলনামূলক ব্যক্তিগত জীবন যাপন করছেন আসিন।
হিন্দুস্থান টাইমস অবলম্বনে