FI TV
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

ইউরোপ কেন বিস্তৃত সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

Rupam Tanchangya মিনিটের পড়া
শেয়ার:
বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে রাশিয়ার সেনারা

ইউরোপে আতঙ্ক বাড়ছে। সম্প্রতি বেলারুশ বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। দেশটি রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। মহড়াটি হয়েছে সুয়ালকি গ্যাপের কাছে। এটি বাল্টিক দেশগুলোকে ন্যাটোর বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা একটি সরু করিডর। দীর্ঘদিন ধরে করিডরটি ন্যাটোর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ রাজনৈতিক নেতাদের ডেকে গোপন গোয়েন্দা ব্রিফিং সংক্রান্ত বৈঠক করেছেন। এরপর তিনি রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হাইব্রিড হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়া ন্যাটোর দেশগুলোতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। পরে সেগুলোকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানো হবে।

যুক্তরাজ্য নাগরিকদেরকে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। কৌটাজাত খাবার ও পানি মজুত করতে বলা হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান বলেছেন, কয়েক দশকের মধ্যে ব্রিটেন সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক’ সময়ের মুখোমুখি হয়েছে। জার্মানি সম্ভাব্য রুশ হামলার জন্য হাসপাতালগুলো প্রস্তুত করছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস এক সতর্কবার্তায় ‘মহাদেশের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষা’ এবং ‘নির্ণায়ক মুহূর্ত’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন।

এমনকি দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডও নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে। এতে আরও বেশি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা এবং সশস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের রক্ষায় সক্ষমতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

দুই সপ্তাহ আগে ন্যাটোভুক্ত এলাকাগুলোতে হামলা না করার সতর্কবার্তা দিতে মস্কোয় গিয়েছিলেন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ। এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা দেন, পোল্যান্ডে তাদের একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনে অগ্রগতি হয়েছে।

এসব কর্মকাণ্ড আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলছে। তাদের আশঙ্কা, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শিগগিরই ইউক্রেনের বাইরে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে পারেন।

রাশিয়ার বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র হামলার বিস্তার নিয়ে একটি আভাস পেয়েছে। ফেডারেল প্রসিকিউটররা পাঁচজনের বিরুদ্ধে রুশ গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছেন। বলা হচ্ছে, এসব ব্যক্তিরা বিশ্বজুড়ে হামলা পরিকল্পনার একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। প্রসিকিউটররা আরও অভিযোগ করেছেন, এই নেটওয়ার্ক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোরও নির্দেশ দিয়েছিল।

ইউরোপ বছরের পর বছর যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, এই অভিযোগ সেগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। এর মধ্যে আছে, সাইবার হামলা, কোনো ব্যবস্থার ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করার মতো অবকাঠামোর ওপর হামলা। গত মাসে জার্মানি এমন একটি অভিযোগ তোলে। তারা লিপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে।

ন্যাটোর জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ‘গ্রে জোন’ অভিযান। যেমন- জোটের আকাশসীমায় ড্রোন ওড়ানো, বিমানবন্দর অচল করে দেওয়া, অবকাঠামোর ক্ষতিসাধান কিংবা অপরাধীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটানো। এসব ঘটনার একাধিক অর্থ দাঁড় করিয়ে চাইলেই দায় অস্বীকার করা যায়। একইসঙ্গে এগুলো প্রচলিত উপায়ে যুদ্ধ বাঁধানোর কোনো সীমা অতিক্রম হিসেবেও গণ্য হয় না।

ভ্লাদিমির পুতিন বর্তমানে কোনো ঘটনার একাধিক অর্থ দাঁড় করানো ও অস্বীকারের সুযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর লক্ষ্য ন্যাটোর ঐক্য ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। কারণ তিনি জানেন, হামলার জবাব দেওয়া উচিত নাকি অনুচিত তা নিয়ে ন্যাটোর মধ্যে বিভাজন আছে।

এখন প্রশ্ন হলো, পুতিন যদি এক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে কী হবে?

‘দ্য গ্যাপ’
পুতিন আরও এগিয়ে গেলে কী হবে তার একটি উত্তর পাওয়া যায় সুয়ালকি গ্যাপে। এটি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যকার প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত। যা বাল্টিক দেশ লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে ন্যাটোভুক্ত বাকি অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

বেলারুশের সঙ্গে মিলে রাশিয়া যদি এই করিডরের একাংশে সেনা পাঠায় তা ন্যাটোভুক্ত কোনো রাষ্ট্রে সরাসরি অভিযান হিসেবে গণ্য হবে না। পুতিনও হয়তো এটিকে সীমিত অনুপ্রবেশ হিসেবে দাবি করবেন, অথবা খুব একটা পাত্তা দেবেন না। মস্কোও অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে বোঝাতে পারে যে, ন্যাটো এই পদক্ষেপের জবাব দিলে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে।

সম্ভাব্য এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য শুধু সুয়ালকি গ্যাপ দখল বা ন্যাটো থেকে বাল্টিক দেশগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা নয়। বরং এর মাধ্যমে পুরো ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি দুর্বল করে দেওয়ার লক্ষ্যও থাকতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, মাত্র ৬৫ মাইল দীর্ঘ এই ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ন্যাটোর ৩২ দেশ মিলে কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সম্মত হবে? একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি লিথুয়ানিয়ার মতো দেশের জন্য পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের ঝুঁকি নেবেন? জার্মানি ও ফ্রান্সও কি তা করবে? এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই, আর এটিই পুতিনের কৌশলের পক্ষে কাজ করছে।

সুয়ালকি করিডরে রাশিয়ার সম্ভাব্য যুদ্ধ কৌশল নিয়ে ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাটো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে। যেকোনো পদক্ষেপের জবাব হবে ভয়াবহ।

পুতিন কি মার্ক রুটের এমন হুঁশিয়ারিকে পাত্তা দেন? যুক্তরাষ্ট্র যখন কানাডাসহ ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে মতবিরোধে আটকে আছে, তখন এমন হুঁশিয়ারিতে পুতিনের শঙ্কিত হওয়ার সম্ভাবনা কমই বলা চলে।

ইউক্রেন থেকে শিক্ষা
আধুনিক যুদ্ধে কী প্রয়োজন? এ নিয়ে ইউরোপীয়রা সম্ভবত ইউক্রেনের কাছে থেকে ভালো শিক্ষা পেয়েছে। যুদ্ধের জন্য শুধু সামরিক সরঞ্জাম থাকলেই চলে না। হামলা সহ্য করার মতো বিদ্যুৎ গ্রিড, ব্যাপক হতাহত সামাল দেওয়ার মতো হাসপাতাল, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং চাপের মধ্যেও কাজ চালানোর সক্ষমতা সম্পন্ন সরকার দরকার হয়। একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যারা যুদ্ধের খরচ বহন করতে পারে এবং অল্পতেই বিভক্ত হয়ে যায় না।

চলতি সপ্তাহে ন্যাটো জাতীয় পুনরুদ্ধার সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে বার্তা দিয়েছে। জোটের কর্মকর্তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইউক্রেন কীভাবে জরুরি পরিষেবা সচল রেখেছে তা পর্যালোচনা করছেন। যা বোঝায়, বর্তমানে ইউক্রেনই শুধু ন্যাটোর কাছে থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না, বরং ন্যাটোও কিয়েভের কাছে থেকে শিখছে। 

ওয়াশিংটনকে নিয়ে প্রশ্ন
ইউরোপের তৎপরতার পেছনে ‘আমেরিকান ফ্যাক্টরও’ আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সেনা মোতায়েন রাখলেও তারা বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব দমিয়ে রাখতেও ওয়াশিংটন ব্যস্ত। তাদের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবরও সামনে আসছে।

ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা শর্ত বাস্তবায়নে ডোনাল্ড ট্রাম্প কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তা নিয়েও সংশয় আছে। বিষয়টি মস্কো বেশ ভালো করেই জানে। তাই ন্যাটোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পুতিনকে ইউক্রেনের মতো অভিযান চালাতে হবে না। তিনি ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারেন। যা শুরু হতে পারে অবকাঠামোর ক্ষতি, সাইবার হামলা, হত্যার ষড়যন্ত্র, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দিয়ে। এসব বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পর ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করতে সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযানও চালানো হতে পারে।

সম্ভাব্য এই পরিস্থিতিতে সুয়ালকি গ্যাপ নিয়ে তোলা প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। ছোট এই ভূখণ্ডের জন্য ট্রাম্প কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবেন? মার্কিন নাগরিকরাও কি তা মেনে নেবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে সেটি রাশিয়াকে দমিয়ে রাখার কৌশলকে দুর্বল করে দেবে।

ইউরোপে ভ্রান্ত ধারণার অবসান
স্নায়ু যুদ্ধের পর তিন দশক ধরে ইউরোপের জাতীয় প্রস্তুতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে গেছে। তারা নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিল না। ফলে সামরিক বাহিনীতে ব্যয় ও নিয়োগ কমে যায়। তারা ধরেই নিয়েছিল, জরুরি পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে। কিন্তু সেই যুগ শেষ।

ইউরোপ এখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশগুলোর নেতারা ক্রমেই একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা বুঝতে পারছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ বিস্তৃত হলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে, সেটিও অনিশ্চিত। এমন সময় সুয়ালকি গ্যাপের কাছে বেলারুশের সামরিক মহড়া উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

যুদ্ধের বিস্তৃতি ঠেকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো পুতিনের বিশ্বাস বদলে দেওয়া। তাঁর সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো যে ব্যর্থ হতে পারে- তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু ইউরোপের রাজধানীগুলোতে যে জরুরি প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে, তাতে পুতিন হয়তো উল্টোটাই বুঝবেন। অর্থাৎ, সফল হওয়ার আশাই বেশি করবেন।

(প্রতিবেদনটি লিখেছেন সিএনএনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ব্রেট ম্যাকগার্ক। তিনি জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন।)

শেয়ার: